আন্তর্জাতিক

কোরীয় উপদ্বীপের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

হাসান জাবির

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর সময়ে কোরীয় উপদ্বীপের বহুমাত্রিক সংকটই হচ্ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং উত্তপ্ত ইস্যু। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সে সময় পরাশক্তিগুলোর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্তায় বিভক্ত হয় সংযুক্ত কোরিয়া। এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ প্রান্তে মিত্রশক্তির গুরুত্বপূর্ণ পক্ষগুলোর মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে এই উপদ্বীপে। তৎকালীন পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র সুদূরপ্রসারী লক্ষ অর্জনে আন্তকোরিয়া বিরোধকে উসকে দিয়েছিল। ফলে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় রণাঙ্গনে বৃদ্ধি পেয়েছিল যুদ্ধের ভয়াবহতা। যদিও ১৯৪১ সালে রাজকীয় জাপান নৌবাহিনীর পার্লহার্বার মার্কিন ঘাঁটিসংশ্লিষ্ট নৌবহর আক্রমণ ও ধ্বংসের ঘটনায় আগেই পাল্টে গিয়েছিল সমীকরণ। নিজ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত অবিভক্ত কোরিয়ায় নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করতেই জাপান পার্লহার্বারকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। জাপানি আক্রমণের ভয়াবহতায় সংক্ষুব্ধ যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশোধ নিতেই ১৯৪৫ সালে জাপানে পরমাণু আক্রমণ করে। এর ফলে আঞ্চলিক পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে। একই সঙ্গে বহুপক্ষীয় সামরিক উত্তাপের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে কোরীয় উপদ্বীপ। অন্যদিকে জাপানে মার্কিন পরমাণু আক্রমণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে নিজ ভূখন্ডসংলগ্ন এলাকায় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের একচেটিয়া সামরিক আধিপত্য খর্ব হয়। এ সুযোগে তখন থেকেই কোরিয় উপদ্বীপের রাজনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়ার গুরুতপূর্ণ অংশ হয় যুক্তরাষ্ট্র। পরে আটত্রিশ ডিগ্রি অক্ষরেখার উত্তর ও দক্ষিণ অংশ নিয়ে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে দুই কোরিয়া। অন্যদিকে ১৯৫০-৫৩ সাল পর্যন্ত বহুপক্ষীয় কোরীয় যুদ্ধ স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি ছাড়াই পরিসমাপ্ত হয়। এতদসত্ত্বেও আন্তকোরিয়ার রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক বিরোধিতা অব্যাহত থাকে। এদিকে কোরীয় উপদ্বীপের পরমাণু সংকটের সূত্রপাত হয় ১৯৫৮ সালে। এ সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নিরাপত্তাবলয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার দক্ষিণ কোরিয়ায় পরমাণু অস্ত্র মোতায়েন করে বলে ধারণা করা হয়, যা নিজের নিরাপত্তা সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করে উত্তর কোরিয়া। এর প্রতিক্রিয়ায় উত্তর কোরিয়া পরমাণু অস্ত্র উৎপাদন আগ্রহ আঞ্চলিক পরমাণু সংকট বিস্তৃত হয়। এতদউদ্দেশ্যে দেশটির পরমাণু প্রকল্পের কার্যক্রম ঘিরে আন্তর্জাতিক উৎকণ্ঠা প্রশমনে অগ্রাধিকার পায় নিরস্ত্রীকরণ। এই গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডার অন্যতম দুই পক্ষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়া। অন্যদিকে দীর্ঘ বৈরিতা ভুলে দুই দেশের শীর্ষনেতারা কয়েকবার দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বসেন। সর্বশেষ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট দক্ষিণ কোরিয়া সফরের সময় অতি আকস্মিকভাবে উত্তর কোরিয়ার ভূমিতে পা রাখেন। ইতিহাসের এই বিরল ঘটনা কোনো আমেরিকান প্রেসিডেন্টের প্রথম উত্তর কোরিয়া সফর হিসেবে অনেকটাই অবাক হন বিশ্ববাসী। এই প্রতীকী সফরের বাস্তবিক ফলাফল কম হলেও এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনেক বেশি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কোরীয় উপদ্বীপের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ প্রসঙ্গ নতুন করে আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছেন।

আমরা যদি লক্ষ করি তাহলে দেখব, ১৯৫৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে শুরু হয় চার ধাপে বিভক্ত উত্তর কোরিয়ার পরমাণু প্রকল্প। প্রথম ধাপে ১৯৬০-৮০ পর্যন্ত দেশটি অস্ত্র উৎপাদনবিষয়ক জ্ঞান অর্জন এবং প্রাথমিক অবকাঠামো নির্মাণ করে। ২য় ধাপে ১৯৮০-১৯৯৪ পর্যন্ত ব্যাপকভিত্তিক গবেষণায় ও প্লটোনিয়াম উৎপাদন শুরু করে দেশটি। ৩য় ধাপে ১৯৯৪-২০০২ পর্যন্ত দেশটি অস্ত্র উৎপাদনের লক্ষ্যে উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধায়ন শুরু করে। ওই সময় দেশটি পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি এনপিটি থেকে সরে আসে। এ ঘটনা দেশটির পরমাণু অস্ত্র উৎপাদন-সংক্রান্ত চূড়ান্ত সাফল্যের ইঙ্গিত মেলে। ফলে পিয়ংইয়ংকে অস্ত্র পরীক্ষা থেকে বিরত রাখার মার্কিন উদ্যোগে দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত হয় ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি। চূড়ান্ত ধাপে ২০০২ সালের পর থেকে পিয়ংইয়ং এ-সংক্রান্ত সব ধরনের আইনি সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করতে থাকে। এ পর্যায়ে উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা নিবৃত করতে ছয় জাতি আলোচনাও ব্যর্থ হয়। এর মধ্য দিয়ে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষার আশঙ্কায় উৎকণ্ঠায় থাকে বিশ্ব। এই প্রেক্ষাপটেই ২০০৬ সালে উত্তর কোরিয়া বিশ্বের অষ্টম দেশ হিসেবে ভূগর্ভে সফল পরমাণু পরীক্ষা সম্পন্ন করে। উত্তর কোরিয়ার এই সাফল্যের মধ্য দিয়ে কোরীয় উপদ্বীপের পরমাণু সংকট ঘনীভূত হয়। আমরা জানি, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে আলাদা দুটি নিরাপত্তা চুক্তি আছে আমেরিকার। মূলত নিজ ক্ষমতাবলয়ের ওই দুই অংশীদারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই মার্কিন সেনাদের প্রধান কাজ। কিন্তু গত দশকের শেষ দিকে এসে পাল্টে যায় এই সমীকরণ। এ সময় পিয়ংইয়ং নিজের আক্রমণ সক্ষমতায় যোগ করে আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র। অর্থাৎ দেশটির নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র তাইপেডংয়ের বিভিন্ন সিরিজ অপ্রচলিত যুদ্ধাস্ত্র বহন করে মার্কিন ভূখ-ে আঘাত হানার উপযোগী হয়। উত্তরের এই সক্ষমতা মার্কিন প্রতিরক্ষা কৌশলের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দেয়। যে কারণে উপদ্বীপের নিরস্ত্রীকরণ প্রসঙ্গে নিজের পূর্বতন নীতি শিথিল

করে ওয়াশিংটন। এই ধারবাহিকতায় ট্রাম্প-উন আলোচনার পথ সুগম করে। ফলে দুই দেশের মধ্যকার কয়েক বছরের তীব্র উত্তেজনা, বাকযুদ্ধের অবসান হয়। অবশ্য এই প্রেক্ষাপটে সৃষ্টির আগে গত বছর থেকে আন্তকোরিয়া সম্পর্কের শীতলতা কমে আসে।

বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে যেকোনো দেশের পক্ষে সামগ্রিক নিরস্ত্রীকরণে রাজি হওয়া খুবই কঠিন সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ার মতো একটি রাষ্ট্র খুব সহজেই দীর্ঘ প্রচেষ্টায় অর্জিত অস্ত্রগুলো পরিত্যাগ করবে এমনটি ভাবা খুব বোকামিই হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভিন্ন মানদ-ে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণকে প্রায় অসম্ভব হিসেবেই বিবেচনা করে। যে কারণে পারস্পরিক সৌহার্দ সম্প্রীতি সৃষ্টির মাধ্যমে যুদ্ধের ঝুঁকি হ্রাস করে অস্ত্র প্রতিযোগিতার অবসান হতে পারে প্রাথমিক অগ্রগতি। কোরীয় উপদ্বীপের বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি খুবই জরুরি। ধারণা করা হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতনভাবেই আন্তকোরিয়া সম্পর্কে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ভূমিকা রাখতে পেরেছে। এই প্রাথমিক অগ্রগতির ভিত্তিতে সম্ভাব্য বৃহৎ ঝুঁকি

এড়ানোর ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এ ক্ষেত্রে গত এক বছরের মধ্যে উত্তর কোরিয়ার নেতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছাড়াও নিজের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র চীন ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন। ট্রাম্পের সফরের মাত্র দুই সপ্তাহ আগেই উত্তর কোরিয়ায় সফরে গিয়েছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট। সেই সফরে কোরীয় নিরস্ত্রীকরণের ব্যাপারে উত্তর কোরিয়ার প্রতিশ্রুতির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন তিনি।

আধুনিক যুদ্ধ ও প্রযুক্তি বিদ্যায় চারটি বড় উদ্ভাবনের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ‘পরমাণু সক্ষমতা’। যেকোনো দেশের জন্য এ ধরনের অর্জন অনন্য মর্যাদা এনে দেয়। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সম্ভাব্য সব লড়াইয়ে পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে এগিয়ে থাকে। উত্তর কোরিয়া এর ব্যতিক্রম নয়। তাই দীর্ঘ মার্কিন রোষানলের শিকার উত্তর কোরিয়ার পাঁচ দশকের প্রচেষ্টায় এই অর্জন সহসা নিরস্ত্রীকরণের ক্ষেত্রে সর্বাত্মক বাধা। সংগত কারণেই দু-একটি উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। এ জন্য দরকার আঞ্চলিক অস্থিরতা কমিয়ে পারস্পরিক আস্থা অর্জন। একই সঙ্গে সব পক্ষের নিরাপত্তাভীতি দূর করে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা। যে কারণে মার্কিন নিরস্ত্রীকরণ উদ্যোগের সাফল্য পেতে ওয়াশিংটনের মনোভাবের ইতিবাচক পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি ছিল। এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পের এই প্রতীকী সফর নিঃসন্দেহে বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তার করবে। যদিও গত এক বছরের মধ্যে আমেরিকা নিরস্ত্রীকরণ-সংক্রান্ত দুটি বড় চুক্তি রাশিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত আইএনএফ ও ফাইভ প্লাসের সঙ্গে ইরানের ‘পরমাণু চুক্তি’ থেকে একতরফাভাবে সরে এসেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আমেরিকার ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী যে অনাস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করে খোলা মনে বর্তমান স্থিতাবস্থাকে ধরে রাখা তাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। তাই ট্রাম্পের এই প্রতীকী সফরের মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা শক্তিশালী করার ইঙ্গিত হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। যে ঘটনা উত্তেজনা হ্রাসের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এমন বাস্তবতা সচল থাকলে কোরীয় উপদ্বীপের পরমাণু উত্তেজনাও কমে আসবে বলেই ধরে নেওয়া যায়।

লেখক : বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা

"