প্রত্যাশা

ফিরিয়ে দিন নদীমার্তৃক বাংলাদেশ

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীকে চিনি সেতাবগঞ্জ সুগার মিলে চাকরির সুবাধে। সেখানে আমি আট বছর কর্মরত ছিলাম। খালিদ মাহমুদকে বোচাগঞ্জ-বিরলের মানুষ খুব ভালোবাসেন তার সততা, নিষ্ঠা, জনগণপ্রীতি, বিনয়ী ব্যবহার এবং নির্লোভ স্বভাবের জন্য। তিনি যা বলেন, তা ভেবেচিন্তেই বলেন। কথা ও কাজের সঙ্গে এই রাজনীতিবিদের রয়েছে অপূর্ব মিল। সেই নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ যখন বলেন, ‘নদীগুলো দখল করা হয়েছেÑ বিষয়টি আমি মানতে নারাজ। আমি বলব, এর আগে রাষ্ট্র এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ’৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যার পর শুধু নদী দখলই নয়, আমাদের নদীমার্তৃক বাংলাদেশের পরিচয় বদলে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। সেসময় থেকে রাষ্ট্র কোনো ভূমিকা নেয়নি বলেই নদীগুলো দখল হয়ে গেছে।’ আমারও মনে হয় তাই। নদীর সঙ্গে বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য ও শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির রয়েছে এক নিবিড় সম্পর্ক। নাড়ির বন্ধন। ‘আমার তোমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা যমুনা’ বাঙালির স্বাধীনতা ও জাতীয়তাবাদের সেøাগান।’ ‘ধীরে বহে মেঘনা, স্বাধীনতাযুদ্ধের নানা ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত একটি বিখ্যাত সিনেমার নাম। তাই নদী ধ্বংস মানে বাঙালি জাতিকে ধ্বংস করা। বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং শিল্প-সংস্কৃতিকে বিনষ্ট করা। বাঙালির শ্বাশত সংগ্রাম ও স্বাধীনতাযুদ্ধের অমর ইতিহাস মানুষের মন থেকে মুছে ফেলার ঘৃণ্য প্রচেষ্টারই নামান্তর।

আগামী ১০ বছরের মধ্যে বুড়িগঙ্গাসহ দেশের সব নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে। মানুষের ব্যবহার উপযোগী করা হবে, জীবিকার জন্য ব্যবহার করা হবেÑ এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে চায় বর্তমান সরকার। এ ক্ষেত্রে কেউ হস্তক্ষেপ করলে তার পরিণাম হবে ভয়াবহ। নদী রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নদী রক্ষায় শুধু ঢাকার মানুষ নয়, সারা দেশের মানুষকে সহযোগিতা করতে হবে। সাহসী মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। নৌপবিহন প্রতিমন্ত্রীর এসব কথার সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে প্রখ্যাত লেখক, কলামিস্ট ও নদীপ্রেমিক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, সরকারের ছত্রছায়ায় নদীর পাড় দখল হয়েছে। এখন সরকার নদী রক্ষায় যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, আশা করা যায় তা বাস্তবায়িত হবে। যুগে যুগে যারা ক্ষমতায় থেকেছে, তারাই নদী দখল ও নদীদূষণ করে নদীমার্তৃক বাংলাদেশের বারোটা বাজিয়েছে। ক্ষমতা ছাড়া প্রকাশ্যে কেউ নদী দখলের মতো রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করতে পারে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো বলেই ফেলেছেন, টেমস নদী দেখার জন্য এখন আর কাউকে লন্ডন যেতে হবে না, বুড়িগঙ্গায় গেলেই সেই সৌন্দর্য উপভোগ করা যাবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা সত্য হোক। তার বাসনা পূর্ণ হোক। বুড়িগঙ্গা ফিরে পাক তার হারানো যৌবন। স্বচ্ছ পানির ঢেউয়ে, অগণিত লঞ্চ, স্টিমারের ভেপুর শব্দ ও মানুষের কলকোলাহলে আবার জেগে উঠুক ঢাকার চার পাশের নদী। নদী হোক স্বচ্ছ জলের আধার। নদী হোক মৎস্য, শামুক, ঝিনুক ও শুশুকসহ অন্যান্য জলজপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল। বুড়িগঙ্গাসহ দেশের সব নদী দখলমুক্ত করে বাংলাদেশের নদীমার্তৃক রূপ তুলে ধরা হবে। নদীতীরবর্তী যেসব এলাকা দখলমুক্ত হয়েছে, সেগুলো আবার কেউ দখলের চেষ্টা কবরে বলে মনে হয় না। আর কেউ যদি অবৈধ দখলের চিন্তা করেন, তবে ভুল করবেন। কারণ আগের সরকার আর বর্তমানের সরকার এক নয়। আমরা যা বলি তা-ই করি। রাজধানীর কামরাঙ্গীচরের খোলামোড়া ঘাটে নদীর সীমানা পিলার, ওয়াকওয়ে ও নদীতীর রক্ষার দ্বিতীয় প্রকল্পের নির্মাণকাজের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। ওই অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, নৌপরিবহন সচিব মো. আব্দুস সামাদ, বিশিষ্ট কলামিস্ট ও পরিবেশবিদ সৈয়দ আবুল মকসুদ, বিআইডব্লিউটির চেয়ারম্যান কমোডর এম মাহবুব উল ইসলাম এবং প্রকল্প পরিচালক নুরুল আলম প্রমুখ। অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হুশিয়ারি উচ্চারণ করে আরো বলেন, রাজধানীর চারপাশে থাকা নদীর তীরগুলো দখলমুক্ত করতে সরকার কাজ করছে। এরপরও কেউ যদি পুনরায় নদী দখলের চেষ্টা করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নদীতীর দখলমুক্ত করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে। একে একে সব নদী দখলমুক্ত করা হবে। প্রধানমন্ত্রী বুড়িগঙ্গাকে পুরোনো রূপে ফিরিয়ে আনার নির্দেশনা দিয়েছেন। তার সেই নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে। ঢাকার চারপাশে সার্কুলার নৌপথ চালু করে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন সহজতর করা হবে। বুড়িগঙ্গাকে হাতিরঝিলের ন্যায় নয়নাভিরাম করা হবে। বছরখানেকের মধ্যে এ দৃশ্য দেখা যাবে বলে আশা করেন তিনি। বুড়িগঙ্গা হবে আনন্দ ও বিনোদনের কেন্দ্র।

বিআইডব্লিউটির সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় বুড়িগঙ্গা তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদের তীরভূমিতে সীমানা পিলার স্থাপন, ওয়াকওয়ে এবং কি ওয়ালসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। নদীর তীরভূমিতে ৫২ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ, পাইলের ওপর ১২ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে, ১০ হাজার ৮২০টি সীমানা পিলার স্থাপন, তিনটি ইকোপার্ক নির্মাণ, দুটি পর্যটনবান্ধব দৃষ্টিনন্দন পার্ক, ১৯টি আরসিসি জেটি, ১০০টি আরসিসি সিঁড়ি, ৪০ কিলোমিটার নদীর তীর রক্ষাসহ আনুষঙ্গিক সুবিধাদি নির্মাণ করা হবে। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৪৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। ২০১৮ সালের জুলাই হতে ২০২২ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। নদীর তীরভূমির অবৈধ দখল রোধ, দখলমুক্ত অংশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি, পরিবেশগত উন্নয়ন, হাঁটার রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।

সম্প্রতি নদী রক্ষায় হাইকোর্টের ঐতিহাসিক পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয় রক্ষার আইনগত অভিভাবক হবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়ের সুরক্ষা, সংরক্ষণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, শ্রীবৃদ্ধিসহ সব দায়িত্ব স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে নদী রক্ষা কমিশন যাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তা নিশ্চিত করতে রায়ে সরকারকে চার দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয় দখলকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে এর কঠিন সাজা ও জরিমানা নির্ধারণ করতে হবে। এসব বিষয় যুক্ত করে ২০১৩ সালের নদী রক্ষা কমিশন আইন সংশোধন করে ছয় মাসের মধ্যে তা হলফনামা আকারে আদালতে দাখিল করতে হবে। নদ-নদীর পাশে প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের অনাপত্তিপত্র নিতে হবে। বিষয়টি সরকারের সব বিভাগকে চিঠি দিয়ে জানাতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আদালত বলছেন, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দেশের সব নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়ের অবস্থান চিহ্নিত ও নির্ণয় করে একটি ডিজিটাল ডেটাবেইজ তৈরি করতে হবে। সেই ডেটাবেইজ দেশের সব ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা, জেলা ও বিভাগে নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। নদী ও জলাশয়ের দখল বন্ধ করতে কিছু প্রতিরোধমূলক নির্দেশনাও দিয়েছেন আদালত। এসব নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে প্রতিটি জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদকে নিজের এলাকার নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়ের অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করে তাদের নামের তালিকা জনসম্মুখে ও পত্রিকায় প্রকাশ করতে হবে। নদী বা জলাশয় দখলকারী বা অবৈধ স্থাপনা নির্মাণকারীরা ব্যাংকঋণ পাওয়ার অযোগ্য বিবেচিত হবেন। ঋণ আবেদনকারীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার ব্যবস্থা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। যেকোনো নির্বাচনে প্রার্থীর বিরুদ্ধে নদী দখলের অভিযোগ থাকলে তাকে নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতি দুই মাসে কমপক্ষে ১ ঘণ্টা নদী রক্ষা, সুরক্ষা, দূষণ প্রতিরোধ, নদ-নদী প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে সচেতনতামূলক পাঠদানের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবে। দেশের সব শিল্প-কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীর অংশগ্রহণে প্রতি দুই মাস এক দিন ১ ঘণ্টা সচেতনতামূলক সভা বা বৈঠক করতে হবে। শিল্প মন্ত্রণালয় এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবে। প্রতিটি ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা, জেলা ও বিভাগে তিন মাসে একবার নদী বিষয়ে দিনব্যাপী সভা-সমাবেশ, সেমিনার করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবে।

আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস হাইকোর্টের এই ঐতিহাসিক রায় বর্তমান সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বাস্তবায়নের মাধ্যমেই বাংলাদেশের মৃতপ্রায় নদ-নদীগুলোর সুরক্ষা, দখল ও দূষণমুক্ত করা সম্ভব। সম্ভব নদীমার্র্তৃক বাংলাদেশের প্রকৃত রূপ ফিরিয়ে আনা। তার পরও বলব, শুধু হাইকোর্ট ও সরকার নয়, দল-মত নির্বিশেষে দেশের সব মানুষকে নদী রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে এটিকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে এবং এই আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে হবে সারা দেশের গ্রামগঞ্জ, শহর-নগর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সেই সঙ্গে নদীর প্রতি মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সুগভীর মমত্ববোধকেও জাগ্রত করতে হবে।

লেখক : কৃষিবিদ ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"