স্মরণ

ভাষা আন্দোলন ও ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

ইসমাইল মাহমুদ

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন উপমহাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ, ভাষাবিজ্ঞানী, গবেষক ও শিক্ষাবিদ। ভাষা ও ভাষাতত্ত্বে ছিল তার অগাধ পান্ডিত্য। স্কুলজীবনেই তিনি আরবি, ফার্সি, উর্দু, হিন্দি ও ওড়িশা ভাষা পড়তে শিখেছিলেন। তিনি মোট ২১টি ভাষা জানতেন। তার মধ্যে রয়েছে ইংরেজি, ফার্সি, সংস্কৃত, জার্মান, আরবি, উর্দু, হিব্রু, গ্রিক, ল্যাটিন, পাঞ্জাবি, গুজরাটি, মারাঠি, তামিল ও সিংহলি। বাংলা ছাড়াও তিনি ইংরেজি, ফার্সি ও উর্দু ভাষায় অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন।

১৮৮৫ সালের ১০ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বশিরহাট মহকুমার পেয়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণকারী বাংলা ভাষা আন্দোলনে অসামান্য অবদান রাখেন। মহান ভাষা আন্দোলনে তার অবদান অবিস্মরণীয়। ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ডক্টর জিয়াউদ্দিন আহমদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ করেন। এর প্রতিবাদে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সর্বপ্রথম তার লেখনীর মাধ্যমে এ প্রস্তাবের প্রতিবাদ করেন। আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান ডোমিনিয়নের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসীদের মাতৃভাষা বিভিন্ন, যেমন পশতু, বেলুচি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি এবং বাংলা; কিন্তু উর্দু পাকিস্তানের কোনো অঞ্চলেই মাতৃভাষা রূপে চালু নয়। যদি বিদেশি ভাষা বলিয়া ইংরেজি ভাষা পরিত্যক্ত হয়, তবে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা রূপে গ্রহণ না করার পক্ষে কোনো যুক্তি নেই। যদি বাংলা ভাষার অতিরিক্ত কোনো দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা গ্রহণ করিতে হয়, তবে উর্দু ভাষার দাবি বিবেচনা করা কর্তব্য। বাংলাদেশের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দু বা হিন্দি ভাষা গ্রহণ করা হলে, ইহা রাজনৈতিক পরাধীনতারই নামান্তর হবে। ডক্টর জিয়াউদ্দিন আহমদ পাকিস্তানের প্রদেশসমূহের বিদ্যালয়ে শিক্ষার বাহনরূপে প্রাদেশিক ভাষার পরিবর্তে উর্দু ভাষার স্বপক্ষে যে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন আমি একজন শিক্ষাবিদ রূপে উহার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’

এ লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ প্রতিবাদ শুরু করে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে শুরু হয়েছিল রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতির অভিভাষণে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোনো আদর্শের কথা নয়; এটি একটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ রেখে দিয়েছেন যে, মালল-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি দাড়িতে ঢাকবার কোনো জো-টি নেই।’

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের ছাত্রদের আহ্বানে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতার সঙ্গে উপস্থিত থেকে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করেছেন তিনি। সে আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পুলিশ প্রথমে টিয়ার গ্যাস ছুড়ে। এতে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আহত হন। ভাষা আন্দোলনের মনস্তাত্ত্বিক পর্যায়ে তিনি কলম সৈনিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ‘দি উইকলি’, ‘কমরেড’, ‘দৈনিক আজাদ’ প্রভৃতি পত্রিকায় রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার পক্ষে লেখালেখির মাধ্যমে যুক্তিনিষ্ঠ সংগ্রাম চালিয়ে যান। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রথম ব্যক্তি যিনি প্রাদেশিক রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি প্রথম উচ্চারণ করেন। এ কারণে তিনিই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পথিকৃৎÑ এ কথা বললে ভুল হবে না। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরের পূর্বে লেখনী ও মৌখিক বিতর্ক ছাড়া বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে সাংগঠনিক কোনো উদ্যোগ গৃহীত হয়নি। ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর বিকাল ৪টায় তৎকালীন সরকারি ইন্টারমিডিয়েট কলেজের (বর্তমান ঢাকা কলেজ) ছাত্রাবাস ‘নূপুর ভিলা’য় অনুষ্ঠিত ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও উর্দু’ শীর্ষক সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। এ সময়ে তিনি বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বাংলা ভাষার পক্ষে যুক্তিগ্রাহ্য বক্তব্য উপস্থাপন করতে থাকেন।

বাংলা হরফকে আরবি বা উর্দুর ন্যায় রোমান হরফে লেখার ষড়যন্ত্র সুদীর্ঘকালের। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অত্যন্ত সচেতনভাবে এ উদ্যোগকে প্রতিহত করার কাজ করেন। এ উদ্যোগকে তিনি একটি সর্বনাশা উদ্যোগ উল্লেখ করে বলেন, ‘এতে পূর্ব পাকিস্তানের জ্ঞানের স্রোতরুদ্ধ করে দেবে এবং হয়তো এতে পাকিস্তানের ভিত্তিমূল ধ্বংস হয়ে পড়বে।’ গণতন্ত্রের শর্ত মোতাবেক তার মতে, বাংলাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়ার দাবি রাখে। তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে বিদ্রোহের ঘোষণা দিয়েছিলেন। বাংলা ভাষাকে বহুগুণী ও জ্ঞানী ব্যক্তি ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বিভিন্নভাবে সেবা করে গেছেন। তার মাঝে কোনো ধরনের রাজনৈতিক অভিলাষ ছিল না। কখনোই প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে জড়িতও ছিলেন না। তথাপিও বাঙালি জাতির সেবায় তিনি নিরলসভাবে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন; যা সমাজের জন্য একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। বগুড়ায় ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ রাষ্ট্রভাষার দাবিতে অনুষ্ঠিত ছাত্র-জনতার বিশাল সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন। তিনি সভাপতির ভাষণে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির পক্ষে যুক্তি ও তথ্যনির্ভর বক্তব্য দেন। যা উপস্থিত ছাত্র-জনতা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনে প্রেরণা জোগায়।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতার সেøাগানে সেøাগানে মুখরিত মিছিল যখন চলছিল; তখন পুলিশ বেপরোয়া লাঠিচার্জ ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ার শেল নিক্ষেপে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় ছাত্র-জনতা। মিছিলে অংশ নিতে আসা ছোট ছোট শিশু-কিশোররা হয়ে পড়েন অবরুদ্ধ। এ অবস্থায় প্রায় ৬৭ বছর বয়সি ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নির্দেশ দিলেন মেডিকেল কলেজের পার্শ্ববর্তী দেয়াল ভেঙে তাদের যেন নিরাপদে নিয়ে যাওয়া হয়। বেলা ৩টার দিকে মিছিলে পুলিশের গুলিতে শহীদদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে ওঠে ঢাকার রাজপথ। পুলিশের টিয়ার শেল নিক্ষেপে আহত হন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহও। এ অবস্থায়ও তিনি প্রফেসর আয়ারসহ হাসপাতালে হতাহতদের দেখতে যান। এ নৃশংসতার প্রতিবাদ হিসেবে এবং ভাষা আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে তিনি তার গায়ের কালো আচকান কেটে প্রথম কালোব্যাজ ধারণ করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা জেলা শিক্ষক সম্মেলনে বায়ান্নর একুশের হত্যাযজ্ঞ ও হতাহতের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘ছাত্ররা এসব ব্যাপারে জড়িত, আমরা সে স¤পর্কে নীরব থাকতে পারি না। আমরা আশা করি, একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির দ্বারা এ ঘটনা স¤পর্কে তদন্তের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে বাংলা ভাষার উন্নয়নের বিষয়টি সম্পৃক্ত ছিল। বাংলা ভাষার উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি ‘বাংলা একাডেমি’ প্রতিষ্ঠার প্রথম স্বপ্ন পুরুষ ছিলেন। তিনি সর্বজনীন শিক্ষার প্রসারে মাতৃভাষা বাংলাকে উপযুক্ত বাহন মনে করতেন। তার ভাবনায় ছিল বিদেশি ভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা সৃষ্টি ছাড়া প্রথা। তাই বাংলা কলেজ প্রতিষ্ঠায় তার উদ্যোগ ছিল প্রশংসনীয়। তার ভাবনায় ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ বাংলা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বতন্ত্র বাংলা বিভাগ তারই হাতে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বাংলা বানানের জটিলতা ও অনিয়ম নিরসনে তার সুচিন্তিত মতামতটিও ছিল যুক্তিযুক্ত। তিনি বাংলা সন-তারিখের অস্থিরতা ও পরিবর্তনমান চরিত্রের জন্য সংশোধন ও যুগোপযোগী করার সুপারিশও করেন। ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমি কর্তৃক গঠিত বাংলা পঞ্জিকার তারিখ বিন্যাস কমিটির তিনি সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ইমেরিটাস প্রফেসরের পদ লাভ করেন।

বাংলা ভাষার নানাদিক থেকে সেবার দৃষ্টান্ত তার ক্ষেত্রে বিরল। বাংলা ভাষার জন্য ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর অবদান তাকে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে এক মহৎ চরিত্র দান করেছে। তার সত্য কথনের সাহস পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চক্ষুকে রক্তপিপাসু করেছে। Pundit zour are a traitor বলেও অশীতিপর বৃদ্ধ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে থামাতে পারেনি পাক সরকার। তিনি পাহাড়ের মতো মনোবল নিয়ে মাথা উঁচু করে বুদ্ধিজীবী-কবি-সাহিত্যিদ ও সংগ্রামী ভাষাসৈনিক-যোদ্ধাদের পথিকৃৎ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই ৮৪ বছর বয়সে সংগ্রামী ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

 

 

"