প্রত্যাশা

মানবিক বোধের চর্চাই জরুরি

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

আবু জাফর সিদ্দিকী

প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ধর্ষণ হচ্ছে। শিশু, বালিকা, যুবতী, স্কুল-কলেজের ছাত্রী, শিক্ষিকা, গৃহবধূ, প্রতিবন্ধী, গার্মেন্ট কর্মী, ডাক্তার, চার সন্তানের জননী, এমনকি বৃদ্ধাও বাদ যাচ্ছে না ধর্ষিতার তালিকা থেকে। কিন্তু এটা কাম্য নয়। শিক্ষকের লালসার শিকার হচ্ছে ছাত্রীরা, গৃহবধূও ধর্ষিতা হচ্ছে প্রতিবেশী যুবকদের দ্বারা। সৎ মেয়ে বাবার দ্বারা এমনকি শ্বশুরের ধর্ষণের শিকার হতে হচ্ছে পুত্রবধূকেও।

গত পাঁচ বছরে ‘ধর্ষণের’ শিকার হয়েছে ২৩২২ শিশু। শিশুদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ২০১৮ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত অর্থাৎ গত পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৩২২ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে আরো ৬৩৯ শিশু। অন্যদিকে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ গত চার বছরে সারা দেশে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৩১ শিশুকে। এ ছাড়া ধর্ষণের পর অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে ১৯ শিশু। আর ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ গত তিন বছরে সারা দেশে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২৩১ শিশু। একই সঙ্গে এই তিন বছরে সারা দেশে ১১২ জন প্রতিবন্ধী শিশুও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। বিএসএএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে সারা দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৯৯ শিশু। আর ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে ২১ শিশু। কিন্তু পরের বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে এসে শিশু নির্যাতনের সংখ্যা আরো বেড়ে যায়। ২০১৫ সালে সারা দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫২১ শিশু। আর ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিল ১৪৩ শিশু। এ ছাড়া ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৩০ শিশুকে এবং ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা করে চার শিশু।

ওই সংস্থার ২০১৬ সালের পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ওই বছরে সারা দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৪৬ শিশু। আর ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিল ১৩৪ শিশু। এ ছাড়াও ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ২১ শিশুকে এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করে দুই শিশু। ২০১৬ সালের এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৬৮ শিশু ওই বছর সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। এ ছাড়া সে বছর ৪২ প্রতিবন্ধী শিশুও ধর্ষণের শিকার হয়। বিএসএএফের ২০১৭ সালের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৭ সালে সারা দেশে ধর্ষণের শিকার হয় ৫৯৩ জন শিশু। আর ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিল ১৬২ জন শিশু। এ ছাড়াও ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয় ২২ শিশুকে এবং ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা করে ৭ শিশু। ২০১৭ সালের এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৭০ জন শিশু ওই বছর সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর ২০১৭ সালে সারা দেশে ৪৪ জন প্রতিবন্ধী শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া সংস্থাটির সর্বশেষ পরিসখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫৬৩ শিশু। আর ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয় ১৭৯ শিশু। এ ছাড়া ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৫৮ শিশুকে এবং ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা করে ৬ শিশু। এই ১১ মাসে ৯৩ শিশু সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়। এ ছাড়া এ সময়ের মধ্যে ২৬ জন প্রতিবন্ধী শিশুও ধর্ষণের শিকার হয়। চলতি বছরের প্রথম ১০০ দিনেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৩৯৬ নারী ও শিশু। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনে নজিরবিহীন রেকর্ড হতে চলেছে দেশে। হঠাৎ যেন মানুষের পাশবিক প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। একের পর এক ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও কোনোভাবেই যেন এর লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। বিকৃত রুচির একশ্রেণির মানুষের বিকৃতি থেকে রেহাই পাচ্ছে না কোমলমতি শিশুরাও। ঘরে-বাইরে সর্বত্রই নারী ও শিশুর জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে। বিরূপ প্রভাব পড়ছে সামাজিক জীবনে। চলতি বছরের গত সাড়ে তিন মাসে ৩৯৬ জন নারী-শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

এ ছাড়া বিভিন্নভাবে হত্যা করা হয়েছে ৬৯ শিশুকে। এর মধ্যে মামলা হয়েছে ৩২টির। ধর্মীয় নীতিনৈতিকতা এবং সামাজিক মূল্যবোধের অভাবে খুন, ধর্ষণসহ নানা ধরনের সামাজিক অপরাধপ্রবণতা বেড়েই চলেছে। এমন দেশ তো আমরা চাইনি, আমরা চেয়েছিলাম মানবিক মূল্যবোধে বেড়ে ওঠা একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশ। যে দেশে কেবল উন্নত বোধেরই চর্চা হবে। আর সে কারণেই আমরা চাই ধর্ষণের বিরুদ্ধে কঠিন থেকে কঠিনতম আইনের প্রয়োগ এবং ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। পাশাপাশি জাতির চরিত্র গঠনে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"