পর্যবেক্ষণ

নিত্যদিনের দুঃসংবাদ

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

এহসান বিন মুজাহির

সড়ক-মহাসড়কে মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা বেড়েই চলছে। প্রতিদিন সড়ক কেড়ে নিচ্ছে মানুষের প্রাণ। কেউবা বরণ করছেন আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব। প্রতিদিন যে হারে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণ যাচ্ছে, তাতে প্রশ্ন উঠে স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি কোথায়? কখনো বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, মুখোমুখি সংঘর্ষ, পথচারীকে সজোরে ধাক্কা, বাস ছিঁটকে পড়েছে হয়তো গভীর খাদে। এভাবে অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। প্রতিদিন গণমাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনার বীভৎস ছবি, স্বজন হারানো মানুষের আহাজারি প্রতিটি বিবেকবান মানুষকে শোকে কাতর করে ফেলেছে! গত শনিবার ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিকাল পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ৫ জন। ৬ জুলাই (শনিবার) সকাল ৮টায় সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলায় ট্রাকের পেছনে ট্রাকের ধক্কায় নিহত হয়েছেন দুজন। সাতক্ষীরায় ট্রাকচাপায় এক কলেজ প্রভাষক নিহত হয়েছেন। পটুয়াখালীতে ট্রাক উল্টে খাদে পড়ে একজন নিহত হয়েছেন। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী মোড়ে বাসের ধাক্কায় এক ট্রাফিক পুলিশ নিহত হয়েছেন। গত ছয় মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৩২৯ জন নিহত হয়েছেন। জানুয়ারিতে ৫৩ নারী ও ৭১ শিশুসহ ৪১১ জনের প্রাণহানি, ফেব্রুয়ারিতে ৪১৫ জন। নিহতের তালিকায় ৫৮ নারী ও ৬২ শিশু রয়েছে। মার্চে ৪৬ নারী ও ৮২ শিশুসহ ৩৮৬ জন নিহত, এপ্রিলে ৩৪০ জন নিহত। নিহতদের মধ্যে ৩৮ নারী ও ৫৩ শিশু রয়েছে। মে মাসে ৪৭ নারী ও ৪৪ শিশুসহ ৩৩৮ জন নিহত হয়েছে। জুনে দুর্ঘটনার সংখ্যা ৩৬৭। এতে ৪৩৯ জন নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৪৯ নারী ও ৬৯ শিশু রয়েছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জাতীয় মহাসড়ক, আন্তঃজেলা সড়ক ও আঞ্চলিক সড়কসহ সারা দেশে এসব প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটে। শিপিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন রিপোর্টার্স ফোরামের (এসসিআরএফ) জরিপ ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এই পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনা যেন এ দেশের নিত্যদিনের দুঃসংবাদ। একটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারের সারা জীবনের শুধু কান্না নয়, কোনো কোনো সময় সারা জীবনের জন্য ওই পরিবারের ওপর চেপে বসে পাহাড়সম কষ্টের পাথর। পরিবারে একমাত্র উপার্জনশীল ব্যক্তিটি যখন দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যান, তখন ওই পরিবারটির বেঁচে থাকাই কষ্টকর হয়ে পড়ে। তাদের সব আশা-স্বপ্ন ও সুন্দর ভবিষ্যৎ হয়ে পড়ে অনিশ্চিত। নিহত পরিবারে চলছে কান্না আর কান্না! কেউ জানেন না এ কান্নার আর কষ্টের শেষ কোথায়। এভাবে প্রতি বছর হাজার হাজার পরিবারে ভবিষ্যৎ হয়ে পড়ছে অনিশ্চিত। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিনই কাঁদতে হচ্ছে কাউকে না কাউকে। যাত্রাপথে প্রায় সবাইকে তাড়িয়ে বেড়ায় এই দুঃসহ স্মৃতি। সড়ক দুর্ঘটনার মৃত্যুর মিছিল যেন থামার নয়! দিন যতই যাচ্ছে, ততই উদ্বেগ ও যাতনা বাড়ছে তো বাড়ছেই। সড়ক দুর্ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হিসেবে দাঁড়িয়েছে। প্রায় দিনই প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়। এভাবে প্রিয়জন হারানো আর্তনাদ আর কান্নায় বাতাস ভারী হচ্ছে প্রতিদিন। রাষ্ট্রে প্রচুর ক্ষতি হচ্ছে। সড়কে মৃত্যুর সারি দীর্ঘ হচ্ছে। মৃত্যু মানুষের স্বাভাবিক নিয়তি। কিন্তু সে মৃত্যু যখন হয় সড়ক দুর্ঘটনায়, তখন কষ্টের শেষ থাকে না। কোনো দুর্ঘটনার ফলে নিমিষেই ঝরে যাচ্ছে একেকটি প্রাণ, যা বেদনাদায়ক এবং একই সঙ্গে উদ্বেগেরও। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণকারী এই মানুষগুলো কারো না কারো স্বজন। অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবরটি আপনজনের কাছে কতই না বেদনার! স্বজন হারানোর বেদনা শুধু স্বজনরাই অনুভব করছেন বারবার। সড়ক দুর্ঘটনায় শুধু যে মানুষের জীবনই ঘাতক বাস, ট্রাক কেড়ে নেয়, তা কিন্তু নয়। দুর্ঘটনায় পরিবারের ওপর নেমে আসে চরম দুর্ভোগ। এমন পরিবার আছে শুধু উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি মারা যাওয়ার ফলে পরিবার-পরিজন, সন্তান নিয়ে চরম অর্থনৈতিক অশ্চিয়তার মধ্যে পড়ে। দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে বেঁচে থাকলেও সারা জীবন পঙ্গুত্ব বহন করতে হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গত বছরের তথ্যমতে, প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ২১ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। বর্তমানে এ সংখ্যা আরো বেশি। দুর্ঘটনার মৃত্যুর ৩২ শতাংশই নিরীহ পথচারী। অথচ পার্শ^বর্তী দেশ ভারতে পথচারীর মৃত্যুহার ৯ শতাংশ এবং ভুটানে মাত্র ৩ শতাংশ। সড়ক দুর্ঘটনায় যাত্রীর মৃত্যুহার ৪১ শতাংশ এবং চালকের মৃত্যুহার ২৭ শতাংশ। উন্নত দেশের তুলনায় অনুন্নত দেশে এ হার প্রায় দ্বিগুণ। বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ৯০ শতাংশই অনুন্নত দেশে। সড়ক দুর্ঘটনায় যারা নিহত হয় তাদের ৬৫ শতাংশই পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তারা পেশাগত কারণে তথা উপার্জনের জন্য রাস্তায় বের হয়। ফলে তাদের মৃত্যুতে সম্পূর্ণ পরিবারটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় বার্ষিক জিডিপির ১ দশমিক ৬ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৭০ শতাংশ সড়ক ব্যবহার করে মাত্র ৫ শতাংশ লোকের ব্যক্তিগত গাড়ি। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গত সাত মাসে ১৪৭৩ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়। তাছাড়া বিগত পাঁচ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৬০৭ জনের অকালমৃত্যু হয়েছে। ২০১২ সালে ২০০৯ জন, ২০১৩ সালে ১৫৪৬ জন, ২০১৪ সালে ২১৩৫ জন, ২০১৫ সালে ২৫৮০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়। ২০১৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনা আগের তুলনায় অনেক গুণ বেড়েছে। চলতি বছরে (২০১৯) গত ছয় মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৩২৯ নিহত হয়েছে। দেশের সড়কগুলো মৃত্যুফাঁদ। এ ফাঁদে পড়ে প্রতিদিনই মৃত্যুবরণ করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী, আলেম, কৃষক, শ্রমজীবী, শিক্ষাবিদ, জ্ঞানী-গুণী বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও। মহাসড়কে লাশের মিছিল থামছেই না। সড়ক দুর্ঘটনারোধে নেই কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ। প্রতি বছরই ঈদের আগে ও পরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় শত শত মানুষকে প্রাণ দিতে হচ্ছে। সড়কে লাশের মিছিল দীর্ঘ হলেও এ নিয়ে যেন কোনো দায়বদ্ধতা নেই সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট মহলের!

সড়ক দুর্ঘটনগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বেশ কিছু কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। অন্যতম কয়েকটি কারণ হচ্ছে পথচারী ও চালকদের অসচেতনতা, অদক্ষতা, লাইসেন্সবিহীন এবং প্রশিক্ষণবিহীন অদক্ষ চালক, চালকদের প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, চালক, কন্ডাক্টর বা হেলপারের কাছে দৈনিক ভিত্তিতে গাড়ি ভাড়া দেওয়া, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক নিয়োগ, সড়কে চলাচলে পথচারীদের অসতর্কতা, বিধি লঙ্ঘন করে ওভারলোডিং ও ওভারটেকিং, দীর্ঘক্ষণ বিরামহীনভাবে গাড়ি চালানো, ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চলাচল বন্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব, জনবহুল এলাকাসহ দূরপাল্লার সড়কে ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে অনুসরণ না করা, সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেলসহ তিন চাকার যানবাহন চলাচল বৃদ্ধি এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি ইঞ্জিনচালিত ক্ষুদ্রযানে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন, সড়কের এবং ফুটপাতের ওপর অবৈধ হাটবাজার ও স্থাপনা, অসহিষ্ণু-রেষারেষি ও ভাঙা রাস্তা, সিগন্যাল বাতি না থাকা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামানো, অদক্ষ-লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভারের গাড়ি চালানো, সোজা রাস্তা ও ডিভাইডার না থাকা, সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক সচেতনতার অভাব, প্রয়োজনীয় সংখ্যক ট্রাফিক পুলিশের অভাব ও ট্রাফিক নিয়ম ভঙ্গ করা, অতিরিক্ত মালামাল ও যাত্রী বোঝা, ড্রাইভিং পেশার উৎকর্ষহীনতা, অপরাধীদের কঠোর শাস্তি না হওয়া, গাড়ি মালিকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের জরিমানা অনাদায় এবং কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের অভাবে সড়কে লাশের মিছিল বাড়ছে।

কাজেই সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আইনে যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টন্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা, গাড়িচালকদের বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো বন্ধ করা, রাস্তা থেকে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন অপসারণ করা, চালকদের সুনির্দিষ্ট পরীক্ষার মাধ্যমে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া, জনগণকে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতন করা, সাবধানে গাড়ি চালানোর জন্য চালকগণকে উদ্বুদ্ধ করা, অনির্ধারিত স্থানে গাড়ি পার্কিং বন্ধ করা এবং লাইসেন্স প্রদানের আগে চালকের দক্ষতা ও যোগ্যতা যাচাই করা, জাল লাইসেন্স বন্ধ করে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যুরোধে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

[email protected]

 

"