মুক্তমত

জলাবদ্ধতা নিরসন হোক

প্রকাশ | ১১ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

সাধন সরকার

বর্ষা মৌসুম পুরোদমে শুরু হয়ে গেছে। রাজধানীতে বর্ষা মানেই যেন ফের জলাবদ্ধতায় ডুবে যাওয়া! এ যেন এক অমোঘ নিয়তি! জলাবদ্ধতা ঢাকা শহরের অনেক সমস্যাগুলোর একটি। প্রতিবার বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতায় নাকাল হতে হয় রাজধানীবাসীকে। সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ থেকে প্রতিবার বর্ষা মৌসুমে আশ^াস দেওয়া হয় যে, জলাবদ্ধতা পরের বছর থেকে আর থাকবে না। কিন্তু ঠিক পরের বছর আবার জলাবদ্ধতায় পড়তে হয় নগরবাসীকে। প্রায় দুই কোটি নগরবাসী কখনো জলাবদ্ধতায় নাকাল হতে চায় না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এবারও বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মিলবে না! নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে নগর কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতিওবা কতটুকু? একসময় এ ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতা হতো না। বৃষ্টির পানি বিভিন্ন খাল-নালা দিয়ে আশপাশের নদীতে চলে যেত। ৫০টিরও বেশি খাল বৃষ্টির পানি ধরে রাখত। কিন্তু খাল-নালাগুলো দখল-ভরাট হয়ে পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে গেছে। যেকোনো শহরের মোট ভূমির কমপক্ষে ১২ ভাগ জলাধার থাকা দরকার। কিন্তু ঢাকায় আছে মাত্র ২ ভাগ। ফলে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জায়গা নেই। আবার শহরের ৮০-৯০ ভাগ জায়গা কংক্রিটে ঢাকা। এতে মাটির নিচে পানি যেতে পারে না। ঢাকার নি¤œাঞ্চল ভরাট হয়ে যাওয়ায় এ সমস্যা আরো প্রকট হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রাকৃতিক জলাধার ও নিম্নাঞ্চলগুলো ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই। চারপাশে নদীর শাখা-প্রশাখার সমন্বয় আর মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া অসংখ্য খাল-নালার এক দুর্লভ শহর ঢাকা। ঢাকা শহরটা মূলত দক্ষিণ থেকে উত্তরে সম্প্রসারিত হয়েছে। আর পূর্ব-পশ্চিমে জলাশয়ের সংখ্যা বেশি। প্রাকৃতিক জলাধার ও পরিবেশবান্ধব এমন শহর পৃথিবীতে বিরল। কিন্তু ঢাকা শহরের এ অনন্য বৈশিষ্ট্যকে ধরে রাখা যায়নি। তবে কার্যকর উদ্যোগ আর যথাযথ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে ঢাকা শহর পৃথিবীর অন্যতম সৌন্দর্যমন্ডিত শহর হতে পারত।

এ দেশে ভরা বর্ষা মৌসুম সাধারণত জুন থেকে আগস্ট মাস অর্থাৎ পুরো তিন মাস (যদি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রকৃতির স্বাভাবিক আচরণ এখন ওলট-পালট হয়ে গেছে)। এ সময় (বর্ষা মৌসুমে) জলাবদ্ধতার ভোগান্তিসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজের ঝামেলায় নগরবাসীকে বেগ পেতে হয়। এ ঢাকা শহরে একসময় পুকুর, ঝিল-বিল, খাল-নালা, লেকের সঙ্গে আশপাশের নদীর সংযোগ ছিল। ময়লা-আবর্জনা আর দখলের কারণে অধিকাংশ প্রাকৃতিক এখন জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে। আশপাশের নদীর সঙ্গে সংযোগ কাটা পড়েছে। ড্রেনেজ লাইনে বর্জ্য পড়ে নালা ভরাট হয়ে গেছে। আশপাশের নদ-নদীগুলোও দিন দিন ভরাট হয়ে যাচ্ছে! অথচ বৃষ্টির পানি সরাতে শহরের খাল-জলাশয়ের সঙ্গে আশপাশে নদ-নদীর সংযোগ থাকা সবচেয়ে বেশি জরুরি।

আবার নগরে পর্যাপ্ত বৃষ্টিও দরকার আছে! কেননা বৃষ্টি হলে শহরের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার হয়ে যায়। দূষণে কালো হয়ে যাওয়া আশপাশের নদ-নদীগুলো প্রাণ ফিরে পায়। এ শহর নিয়ে সরকারসহ নগর কর্তৃপক্ষের চিন্তার শেষ নেই। শহরের উন্নয়ন ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়তে ৭টি মন্ত্রণালয় ও ৫৪টি সেবা সংস্থা কাজ করলেও নগরবাসীর সমস্যা দিন দিন যেন বেড়েই চলেছে! এত এত সংস্থা ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা ও অন্যান্য সমস্যা নিয়ে ভাবলেও সমস্যা কেন কমছে না? তার অন্যতম কারণ ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতাসহ অন্যান্য উন্নয়নকাজে দেশি-বিদেশি সংস্থা ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়হীনতা। জলাবদ্ধতা নিরসনে মূল তিনটি সংস্থা হলো ঢাকা ওয়াসা, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। এসব কর্তৃপক্ষ ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা খরচ করলেও তার সুফল নগরবাসী পাচ্ছে না! মাঝেমধ্যে খাল-নালা খনন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলেও বছর না ঘুরতেই আবার যা তাই! মানে ফের জলাবদ্ধতায় পড়তে হয় নগরবাসীকে। শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া অধিকাংশ খাল-নালা-পুকুরগুলো, ময়লা-আবর্জনায় অনেক আগেই ভরাট আর দখল হয়ে এখন বিলীন হওয়ার পথে! মাত্র ২৪টি খাল কোনো রকমে টিকে রয়েছে। যথাযথ উদ্যোগ ও পরিকল্পনার ছোঁয়া থাকলে ঢাকার খালগুলো হতে পারত সৌন্দর্য ও বিনোদনের এক একটি প্রাণকেন্দ্র। ঢাকা শহরের এই খাল-নালাগুলো উদ্ধার করে পরিষ্কার- পরিচ্ছন্ন রাখা গেলে মশার যন্ত্রণা থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পেত নগরবাসী।

ঢাকা বিশে^র অন্যতম মেগাসিটি ও রাজধানী শহর। বিশে^র অন্যান্য কোনো মেগাসিটিতে প্রতি বছর এমন জলাবদ্ধতা হয় কি না, জানা নেই! চারদিকে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। তা হলে উন্নয়নের ছোঁয়ায় কেন জলাবদ্ধতা দূর করা যাচ্ছে না? অনেক সময় দেখা যায়, শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে যেসব প্রকল্প নেওয়া হয়, তা সঠিক সময়ে শেষ করা হয় না, বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। আবার বর্ষা মৌসুমে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করা হয়। ফলে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হতে হয় নগরবাসীকে। ঢাকা শহরের খাল, বিল, ঝিল, ডোবা, নালাগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। ঢাকা শহর ও এর আশপাশ থেকে জলাভূমিগুলো দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। কমে যাচ্ছে জলাভূমির আয়তন। ফলে প্রায় সময় হালকা ও মাঝারি মাত্রার বৃষ্টিপাত হলে ঢাকাবাসীকে জলাবদ্ধতায় নাকাল হতে হচ্ছে। জলাবদ্ধতার জন্য পলিথিন-প্লাস্টিকও কম দায়ী নয়। শহরের নালা ও ড্রেনগুলো প্লাস্টিক-পলিথিনমুক্ত রাখতে হবে। সঠিক সময়ে প্রকল্প শেষ করার পাশাপাশি প্লাস্টিক-পলিথিনের বর্জ্য পরিষ্কার করতে পারলে জলাবদ্ধতা নিরসনে কিছুটা হলে কাজ দেবে। এ ছাড়া বিভিন্ন সংস্থা ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় আর আন্তরিকতা থাকলে ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা দূর করা সময়ের ব্যাপার মাত্র! প্রতিবার বর্ষা মৌসুম আসে আর নগর কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে। বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না! এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দায়ী করে দায় এড়াতে চাই! জলাবদ্ধতার আর্থিক ক্ষতিও ব্যাপক, যা বলে শেষ করা যাবে না। বিপুল অর্থ ব্যয় করে ঢাকার কিছু এলাকায় খালের ওপরে বক্স কালভার্ট তৈরি করা হয়েছিল। এগুলোও এখন ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে। তবে আশার কথা, এখন ঢাকা শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন হচ্ছে, নগরবাসীও সচেতন হচ্ছে। মোটকথা হলো, ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে আশপাশের নদ-নদীসহ প্রাকৃতিক জলাধারগুলো স্থায়ীভাবে ফিরিয়ে এনে নাব্য সংকট দূর করতে হবে। খাল ও সব ধরনের প্রাকৃতিক জলাধার রক্ষণাবেক্ষণে উদ্যোগী হতে হবে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। বিভিন্ন সংস্থা ও কর্তৃপক্ষের কাজের সমন্বয় ও আন্তরিকতা বাড়াতে হবে।

লেখক : পরিবেশকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"