পর্যালোচনা

জলবায়ুজনিত দুর্যোগ বনাম বৃক্ষরোপণ

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

দিনাজপুরের বিরল, বোচাগঞ্জ ও কাহারোল উপজেলায় দেখেছি, সেখানকার পলিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে বটগাছের সঙ্গে পাকুড়গাছের বিয়ে দেন। হিন্দু রীতিতে অনুষ্ঠিত সেই বিয়েতে ব্রাহ্মণ মন্ত্রও পড়েন। খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থাও থাকে। গাছকে শাড়ি ও ধুতি পরানো হয়। কিন্তু নিজ সন্তান ভেবে মানুষ যে গাছের চারা রোপণ করেন এবং পরম স্নেহে সেগুলোকে লালন-পালন করে বড় করে তুলেন, সেটা জানা ছিল না। বিষয়টি জানা গেল কর্ণাটক রাজ্যের এক পরিবেশবাদী সমাজকর্মী সালুমারদা থিমাক্কার মুখ থেকে নিঃসৃত আবেগাল্পুত কথার মাধ্যমে।

কিছুদিন আগে কর্ণাটক সরকারের মুখ্যমন্ত্রী এইচ ডি কুমার স্বামী একটি রাস্তা চওড়া করার প্রকল্প হাতে নেন। কিন্তু সেই প্রকল্পে বাধা হয়ে দাঁড়ান ১০৭ বছর বয়সি পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত সমাজকর্মী সালুমারদা থিমাক্কা। যার ফলে তিন শতাধিক গাছের জীবন রক্ষা পায়। গাছ কাটার মতো একটি অবিবেচক সিদ্ধান্ত পাল্টাতে হয় কর্ণাটক রাজ্য সরকারকে। বিষয়টি নিয়ে শতায়ু সমাজকর্মী দেখা করেন কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী এইচ ডি কুমার স্বামী এবং উপ-মুখ্যমন্ত্রী জি পরমেশ্বরের সঙ্গে। তিনি তাদের বোঝাতে সক্ষম হন তার নিখাদ ভালোবাসা ও আবেগের কথা। থিমাক্কার কথাÑ বাগেপল্লী- হালাগুরুর রাস্তা সম্প্রসারণ প্রকল্প থামিয়ে দিতে হবে। কারণ, সেখানে বেঙ্গালুরুর হাইওয়ে সংলগ্ন রামানগর জেলার অন্তর্গত কুদুর থেকে হুদিকাল পর্যন্ত চার কিলোমিটার রাস্তাজুড়ে ১৯৬০ সাল থেকে তিনি ৩৮৫টি অশত্থগাছ রোপণ করেন। রাস্তা সম্প্রসারণ করতে গেলে সেগুলো কাটতে হবে, যা তিনি চান না। কে চায় নিজ চোখে দেখতে তার সন্তানের নৃশংস হত্যাকান্ড? এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি কখনো এটা মেনে নেব না; যে গাছগুলো লাগিয়েছি তা কেটে ফেলা হোক। সরকারকে এ প্রকল্প করতে অনুমতি দেব না।’ প্রবীণ এই পরিবেশবিদ তথা সমাজকর্মীর সঙ্গে বৈঠক করার পর নিজেদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী। তার ভাষ্য, এই গাছগুলো একজন মহীয়সী নারী নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন করেছেন। বড় করে তুলেছেন অকৃত্রিম ভালোবাসা দিয়ে। এবার এটা আমাদের দায়িত্ব এই গাছগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ করা। তাই কর্ণাটক সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে গাছগুলোর ক্ষতি না করে অন্যভাবে রাস্তা সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়নের। কিন্তু কেন গাছগুলোর প্রতি এত দরদ শতায়ু সমাজকর্মীর? সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওই পবিবেশপ্রেমিক মহিলা বলেন, ‘বিয়ের বেশ কয়েক বছর পরও আমাদের কোনো সন্তান হয়নি। তখন আমি এবং আমার স্বামী ঠিক করি ও গাছ লাগিয়ে সেগুলোকে সন্তান স্নেহে বড় করলে কেমন হয়! তারপর থেকেই আমরা এ কাজ করে আসছি। তাতে পরিবেশেরও ভালো হয়। আবার নিজেদের সন্তানের আবেগকেও ধরে রাখা যায়।’ তার সেই আবেগ ও অকৃত্রিম ভালোবাসাকে সম্মান জানানোর মাধ্যমে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে কর্ণাটকের রাজ্য সরকার। বিষয়টি সারা পৃথিবীর পরিবেশবাদী ও বৃক্ষপ্রেমিকদের মধ্যে বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিবিসির এক সাক্ষাৎকার থেকে আরো জানা যায়, সালুমারদা থিমাক্কা জীবনের ৮০ বছরে ৮০ হাজার গাছ রোপণ করেন এবং রোপিত বৃক্ষগুলোকে তিনি নিজ সন্তানের মতো ভালোবাসেন।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে শেরপুর জেলা প্রশাসন এক লাখ গাছ রোপণের এক সময়োপযোগী কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। এ ঘোষণাকে আমরা অভিনন্দন জানাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করে বলতে চাই, শুধু গাছ লাগালেই চলবে না, সেগুলোকে পরিচর্যা করতে হবে। সন্তানের মতো লালন-পালন করে বড় করে তুলতে হবে। দেখা গেছে, দেশে প্রতি বছর ১০ থেকে ১২ কোটি গাছ রোপণ করা হয়। কিন্তু উপযুক্ত পরিচর্যার অভাবে সেই রোপণকৃত গাছের শতকরা ৪০ ভাগই নষ্ট হয়ে যায়। যখন দেখিÑ কষ্ট করে রোপণ করা গাছগুলো গরু-ছাগলে খেয়ে নষ্ট করছে। ঝড়-বাতাসে উপড়ে পড়ছে। পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণে বিনষ্ট হচ্ছে। সেচ ও সারের অভাবে অপুষ্টিতে ভুগে মারা যাচ্ছে, তখন বলতে ইচ্ছা হয়Ñ এভাবে চারা রোপণ ও শিশু গাছ হত্যার কোনো মানে হয় না। আমাদের কথাÑ যে কটি গাছকে পরিচর্যা করে বড় করে তোলা সম্ভব, সে কটি গাছই রোপণ করা উচিত। পরিচর্যার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা ছাড়া গাছ রোপণ করা আর না রোপণ করা একই কথা। গাছ রোপণ করতে হবে সঠিক নিয়মে। উঁচু, উর্বর, বেলে দোআঁশ, দোআঁশ, বর্ষায় বৃষ্টির পানি জমে নাÑ এ ধরনের জমিতে। গাছের চারা রোপণের জন্য নির্দিষ্ট মাপের গর্ত করতে হবে। তাতে জৈব ও রাসায়নিক সার মেশাতে হবে। রোপিত গাছকে গরু-ছাগলের উপদ্রব থেকে রক্ষা করার জন্য গাছের চারদিকে বেড়া দিতে হবে। ঝড়-বাতাস থেকে রক্ষার জন্য রোপিত গাছকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দিতে হবে। পানির অভাবে সেচ দিতে হবে। সময়মতো গাছের গোড়ার মাটি আলগা ও আগাছা পরিষ্কারের ব্যবস্থা করতে হবে। পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ দেখা দিলে, সঙ্গে সঙ্গে তা দমনের ব্যবস্থা নিতে হবে। তার পরও যদি কোনো গাছ মারা যায়, সেই মরা গাছের শূন্য স্থান পূরণ করতে হবে একই জাতের গাছের চারা দিয়ে। বছরে দুবার; বর্ষার আগে ও বর্ষার পরে গাছে সার প্রয়োগ করতে হবে। গাছের সুন্দর কাঠামো গঠনের জন্য নিয়মিত অঙ্গজ ছাঁটাইয়ের ব্যবস্থাও করতে হবে।

ঢাকা শহরের অনেক সড়ক দ্বীপে, অফিস-আদালতের সামনে দেখেছি, সেখানে এমন সব গাছ লাগানো হয়েছে, যা অত্যন্ত বেমানান এবং অবকাঠামোর জন্য ক্ষতিকর। দুই রাস্তার মাঝখানের সামান্য সড়কদ্বীপের কোথাও লাগানো হয়েছে বট, পাকুড়ের মতো বিশাল বিশাল বৃক্ষ। যার শিকড়ের চাপে সড়কের ক্ষতি হওয়াটাই স্বাভাবিক। সেখানে আরো ছোট প্রজাতির কম ঝোপালো গাছ লাগানো উচিত ছিল।

বৃক্ষসচেতন মানুষের মতে, বাংলাদেশে বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যার বিষয়ে একটি নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। কোন জায়গায়, কোন গাছ লাগাতে হবেÑ এ বিষয়ে দেশের বিশিষ্ট বৃক্ষ পালনবিদ, বোটানিস্ট, হর্টিকালচারিস্ট, নগর পরিকল্পনাবিদ, বন ও কৃষি বিভাগের প্রতিনিধি এবং পরিবেশবাদীদের সমন্বয়ে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা উচিত। কারণ অপরিকল্পিতভাবে যেনতেনভাবে বৃক্ষরোপণের ফলে কাক্সিক্ষত সফলতা অর্জিত হচ্ছে না। অপচয় হচ্ছে অর্থ। শ্রম ও সময়ের। দেখা যায়, সারা দেশে আকাশমনি ও ইউক্যালিপটাসের মতো পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর অনেক গাছ লাগানো হচ্ছে। এসব গাছে পাখিও বসে না। ইউক্যিালিপটাস গাছ মাটি থেকে প্রচুর পরিমাণে পানি শোষণ করে বায়ুমন্ডলে ছেড়ে দেয়। ফলে যেসব এলাকায় এই বিদেশি আগ্রাসী গাছ রোপণ করা হচ্ছে; সেখানকার পানির স্তর নিচে চলে যাচ্ছে। ফসলের ফলন হ্রাস পাচ্ছে। এ কারণে পাকিস্তান ও আফ্রিকার অনেক দেশে ইউইক্যালিসপটাস গাছ রোপণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষার স্বার্থে আমাদের দেশেও ইউক্যালপিটাস, আকাশমনিসহ সব বিদেশি আগ্রাসী গাছ রোপণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। এসব বিদেশি গাছের পরিবর্তে আমাদের মাটি, আবহাওয়া ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে খাপখাওয়ানো দেশীয় প্রজাতির বনজ, ফলদ ও ভেষজগাছ রোপণ করতে হবে।

বৃক্ষ নিধন, বনভূমি উজাড়, প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট, জীবাশ্ম জ্বালানির অতিব্যবহার, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, নগরায়ণ এবং মানুষের কান্ডজ্ঞানহীন অপরিণামদর্শী কর্মকান্ডের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত জলবায়ু পরিবর্তন ত্বরান্বিত হচ্ছে। বাড়ছে ঝড়-বৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, খরা, লবণাক্ততা, সুপেয়পানির সংকট, শস্যহানি, নদীভাঙন, বাস্তুচ্যুতির মতো ঘটনা। ত্বরান্বিত হচ্ছে পৃথিবী ধ্বংসের আশঙ্কা। মেরু অঞ্চলের বিপন্ন পরিস্থিতি, জাতিসংঘের আন্তঃরাষ্ট্রীয় জলবায়ু প্যানেলের ধারাবাহিক সতর্কতা, বিজ্ঞানীদের হুমকি কোনো কিছুই থামাতে পারছে না শিল্পোন্নত বিশ্বকে। প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশের বিপন্নতার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্যারিসে কপ-২১ নামের একটি সম্মেলনে প্রথমবারের মতো একটি জলবায়ু চুক্তির ব্যাপারে সম্মত হন বিশ্ব নেতারা। ২০১৬ সালের এপ্রিলে ১৭৫টি দেশ ওই সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। চুক্তির আওতায় বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির হার ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখতে এবং ক্রমান্বয়ে তা দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনতে বিশ্বজুড়ে কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। চুক্তির লক্ষ্যমাত্রায় আরো রয়েছেÑ গাছ, মাটি ও সমুদ্র প্রাকৃতিকভাবে যতটা শোষণ করতে পারে, ২০৫০ সাল থেকে ২১০০ সালের মধ্যে কৃত্রিমভাবে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ সেই পর্যায়ে নামিয়ে আনা। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী কিছুই করছে না পরিবেশদূষণের জন্য দায়ী উন্নত বিশ্বের দেশগুলো। তাই বিকল্পের সন্ধান খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে হলে বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই। বিষয়টি আবার প্রমাণিত হয়েছে জুরিখ বিশ্ববদ্যিালয়ের এক অধ্যাপকের সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে। জলবায়ু সংকট ও উষ্ণায়ন মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে তিন লাখ কোটি গাছ রোপণের পরামর্শ দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। জলবায়ু পরিবর্তন রুখতে গাছ লাগানোর কর্মসূচি সবচেয়ে ভালো ও কম ব্যয়বহুল উপায় বলে তারা মনে করেন। গাছ লাগানোর মধ্য দিয়ে কার্বন নিঃসরণ দুইÑতৃতীয়াংশ কমানো সম্ভব। গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিশ্বজুড়ে ১৭০ কোটি হেক্টর জমি বৃক্ষহীন অবস্থায় রয়েছে। এর পরিমাণ বিশ্বের মোট ভূমির ১১ শতাংশ। এসব জমিতে স্থানীয়ভাবে গাছ লাগানো হলে তা প্রাকৃতিকভাইে বেড়ে উঠবে। সাম্প্রতিক এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন সুইস ইটিএইচ জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টম ক্রাউজার। তিনি বলেন, ‘নতুন এই সংখ্যাগত মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে দেখা গেছে, এটি শুধু জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট সমাধানে একটি উপায়ই নয়, বরং এটি সর্বোৎকৃষ্ট পথ।’

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)

নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লিমিটেড, নাটোর

[email protected]

 

"