মুক্তমত

মনুষ্যত্বের অবক্ষয়ে বাংলাদেশ

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

শফিকুল ইসলাম খোকন

যদি প্রশ্ন করি, ‘সামিয়া আফরিন সায়মা’ আপনার সম্পর্কে কী হতে পারে? তাকে আপনি কীভাবে দেখবেন? যাদের মনুষ্যত্ব রয়েছে, যাদের মানসিকতার বিকৃতি হয়নি, তারা অবশ্যই উত্তর দেবেন সায়মা আমাদের বোন, আমাদের মেয়ে। তার মতো বোন বা মেয়ে প্রত্যেকের ঘরে রয়েছে। মানুষ রূপি নরপশুর দ্বারা সায়মার মতো বোন-মেয়েরা ধর্ষিত হয়, ধর্ষণের পর হত্যাও হয়। এটি সমাজের দায়, রাষ্ট্রের দায়, এটি আমাদের মানুষিকতার দায়, মনুষ্যত্বের দায়। তিন দিন আগেও ৭ বছরের শিশু সায়মাকে ঘিরে দিন কাটত বাবা-মায়ের। সারাক্ষণ হাসি-খেলায় মাতিয়ে রাখত পুরো পরিবারকে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আদরের সন্তান সায়মার পোশাক, বই ও ছবি এখন বাবা-মা আর আত্মীয়স্বজনদের কাছে শুধুই স্মৃতি। পৃথিবীর নৃশংসতম প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সায়মা হত্যার পর কাঁদতে কাঁদতে ধর্ষকের ফাঁসি চাইলেন সায়মার বাবা।

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে স্কুলের পর এবার ফতুল্লায় মাদরাসাছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে প্রতিষ্ঠান প্রধানকে আটক করা হয়েছে। এরপর ঢাকা ওয়ারীতে ৭ বছরের সায়মাকে ধর্ষণের পর হত্যা। পরপর তিনটি ঘটনায় যা প্রকাশ পেয়েছে, তা রীতিমতো বীভৎস। অপরাধমূলক কর্মকান্ড এবং প্রবণতা থেমে নেই। গণমাধ্যমের দিকে চোখ বুলালে অনিয়ম-অপরাধ এবং নেতিবাচক কর্মকান্ডে ঢাকা পড়ে ভালো দিকগুলো। আর অপরাধীদেরও আইনের আওতায় গুরুতর শাস্তির তেমন নজির নেই। ফলে অপরাধীরা কোনো রকমে শাস্তি পেলেও অধরা থেকে যায় তার পেছনের লোকজন। সময়ের আলোচিত ঘটনা বরগুনার রিফাত হত্যার দুই সপ্তাহ হতে চলেছে। এরই মধ্যে মূল হোতা নয়ন বন্ড নিহত এবং জড়িত সন্দেহে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। অথচ তাদের নেপথ্যে যারা আছে তারা অধরা থেকে যাচ্ছে। স্বীকারোক্তি নিয়ে তাদের কেন গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ রকম ঘটনা অহরহ ঘটে চলছে। সায়মার মতো অনেক শিশু প্রতিনিয়ত ঘটছে ধর্ষণ হত্যা। যে দেশে নিজের সন্তানকে হত্যা করে মা, ৫ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করে যে দেশের মানুষ, সেই সমাজ কীভাবে ভালো সমাজ বলে দাবি করতে পারে?

গেল দুই সপ্তাহে দেশজুড়ে কমপক্ষে ১৫টি যৌন অপরাধ ঘটেছে, যার বেশির ভাগের শিকার শিশুরা। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, রাজধানীর ওয়ারীতে বাড়ির ভবনেই শিশু সামিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যা, নারায়ণগঞ্জে স্কুলে ২০ ছাত্রী ও পরে মাদরাসায় ১২ ছাত্রীকে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির দায়ে দুই শিক্ষক গ্রেফতার। বরগুনায় আরেক মাদরাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুই শিশুকে বলাৎকারের অভিযোগ। একের পর এক যৌন সহিংসতার ঘটনায় প্রশ্ন ওঠে বাড়ি কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গ-িতেও কেন নিরাপদ নয় শিশু। ছুটির দিন পরিবারের সঙ্গেই সময় কাটান আব্দুস সালাম। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখেন। দুপুরে জুমার নামাজ শেষে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়াও করেন। মাগরিবের নামাজ শেষে সবার জন্য আনেন সন্ধ্যার নাশতা। কিন্তু ঘটনার দিন সন্ধ্যায় সবার জন্য নাশতা নিয়ে এসে জানতে পারেন আদরের ছোট্ট সায়মাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রথমে স্বাভাবিক ভেবেই নাশতার প্যাকেট হাতে মেয়েকে খুঁজতে যান। আধা ঘণ্টা ধরে খোঁজার পর ক্লান্ত হয়ে পড়েন বাবা আব্দুস সালাম। তবু থেমে থাকেননি। আশপাশে খুঁজতে খুঁজতে ভবনের ৯ম তলায় গিয়ে দেখেন রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে ছোট্ট সায়মার নিথর দেহ। ততক্ষণে সব আশা শেষ। খবর পেয়ে পুলিশ আসে, সিআইডির ফরেনসিক টিম আলামত সংগ্রহ করে, ঘটনা তদন্তে ডিবি টিম পরিদর্শনে আসে। কিন্তু বাকরুদ্ধ হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন আব্দুস সালাম। নাশতার প্যাকেটটি তখনও ছিল তার হাতে।

চলতি বছরে ৬ মাসে সারা দেশে শিশু ধর্ষণের চিত্র ভয়াবহ। চলতি বছরে প্রথম চার মাসে (২৯ এপ্রিল পর্যন্ত) ২৯০টি শিশু ধর্ষিত হয়েছে। জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে যথাক্রমে ৫২, ৬০, ৫২টি করে মোট ১৬৪টি শিশু ধর্ষিত হয়েছে। আর শুধু এপ্রিল মাসেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১১৫টি শিশু। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ৭০টির বেশি শিশু ধর্ষিত হয়েছে, যা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী গত ৪ মাসে সর্বনিম্ন আড়াই বছর বয়সের শিশুও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন বলছে, ২০১৮ সালে শিশুদের নিয়ে ১,০৩৭টি ইতিবাচক সংবাদের বিপরীতে নেতিবাচক সংবাদ ছিল ২,৯৭৩টি। ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার ৩৫৬ শিশু। গত বছর সারা দেশে ধর্ষণসহ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৪৩৩ শিশু। এর মধ্যে শুধু ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৩৫৬ জন, যার মধ্যে ধর্ষণজনিত নির্যাতনে মারা গেছে ২২ শিশু। আর যৌন নির্যাতন, হত্যা ও শারীরিক নির্যাতনের ফলে নিহত হয়েছে ২৪৯ শিশু। গত বছর সবচেয়ে বেশিসংখ্যক ৪১৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায়, আহত হয়েছে ১৩৩ জন। এ ছাড়া ধর্ষণ, হত্যা, অপহরণচেষ্টা ও নির্যাতনের ফলে আক্রান্ত হয়েছে ১০০৬ শিশু। যৌন নির্যাতনের ফলে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে ৫৩ জনের ওপর। প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, নেতিবাচক ঘটনায় গত বছর মোট ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৮১১ জন। এর মধ্যে শুধু শিক্ষকদের দ্বারা ১২৯ জন শিশু নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছে। শিক্ষকদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৭ জন শিশু, শারীরিকভাবে নির্যাতিত শিশুর সংখ্যা ৭০ জন, যৌন হয়রানির শিকার ৩৩ জন, ধর্ষণচেষ্টা করা হয়েছে সাতজনের ওপর। এ ছাড়া ২০১৮ সালে ২২৭ শিশুকে হত্যা করা হয় এবং হত্যাচেষ্টায় আহত হয় ৪৯ জন। ২০১৭ সালে যার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৯৬ ও ২৮ জন। সে হিসাবে ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে শিশু হত্যার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে ১৮ শতাংশ। ২০১৭ সালের চেয়ে ২০১৮ সালে ধর্ষণচেষ্টার হার বেড়েছে ১৫ শতাংশ।

এত ঘটনা, ঘটনা নিয়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। কিন্তু বিচার নিয়ে তেমন কোনো চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হতে দেখা যায়নি। দেশের ইতিহাসে হয়তো সিলেটে ১৩ বছরের সামিউল আলম রাজনকে পিটিয়ে হত্যার জন্য চারজনের মৃত্যুদন্ড আর খুলনায় মলদ্বার দিয়ে হাওয়া ঢুকিয়ে ১৩ বছরের রাকিব হাওলাদারকে হত্যার দায়ে দুজনকে ফাঁসির দন্ড দেওয়া হয়েছে। জুলাই এবং আগস্টে পরপর এই দুটি শিশু হত্যা নিয়ে জনমনে ব্যাপক উদ্বেগ এবং ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। এই দুটি মামলার বিচারের জন্য আদালতের সময় লেগেছে মাত্র তিন-চার মাস, যথাক্রমে ১৯ ও ১১ র্কাযদিবস।

সায়মার মতো শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা আমাদের আবারও উদ্বিগ্ন করেছে। সঙ্গে সঙ্গে স্বস্তিও পেয়েছি। কারণ ঘটনার পরপরই মূল ঘাতক হারুনকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আমরা আশাবাদী, সায়মার হত্যাকারী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ফাঁসির রায়সহ তা কার্যকর হবে। শিশু ধর্ষণের ঘটনা ক্রমেই বৃদ্ধির কারণ মূলত অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া, দুর্বল চার্জশিট, শিশুর পক্ষে সাক্ষী-সাবুদ না পাওয়া, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপে দরিদ্র অভিভাবকের আসামির সঙ্গে আপস করতে বাধ্য হওয়া এবং সর্বোপরি সামাজিক মূল্যবোধের ব্যাপক অবক্ষয়। এসব প্রতিহত করতে আরো দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ ও দফতরগুলোকে সোচ্চার হতে হবে। শিশু যৌন নির্যাতন বন্ধে দ্রুত বিচারের আওতায় শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো নিতে হবে। প্রচলিত আইন সংশোধন করে শিশু ধর্ষণকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড দিয়ে সেই সঙ্গে রায় দ্রুতগতিতে কার্যকর করতে হবে। প্রয়োজনে আইনের সংশোধন করতে হবে। বিষয়টি এখন আর কোনোভাবেই উপেক্ষা করার পর্যায়ে নেই। শিশু ধর্ষণের অপরাধ জামিন অযোগ্য করা খুবই জরুরি।

আইন হচ্ছে ভালো মানুষের কল্যাণের জন্য আর অপরাধীদের শাস্তির জন্য। সেই আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায় মূল অপরাধীরা। আর ব্যক্তি থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে এ রকমের সমাজের অপরাধগুলো ধরিয়ে দেওয়া। এখনই এ বিষয়ে ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ মানুষের আস্থা হারিয়ে যাবে, ভরসার জায়গাটুকুও শেষ হয়ে যাবে। আইন দিয়েই সব কিছু হয় না। একটি ঘটনা ঘটনার পরই অনেক সময় আইনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তার আগে আমাদের মানসিকতা, মনুষ্যত্বের পরিবর্তন করতে হবে। না হলে ধর্ষণ ও হত্যার মতো সামাজিক অপরাধ ঘটতেই থাকবে। অবক্ষয়ে ডুবে যাবে গোটা সমাজ, দেশ, জাতি ও রাষ্ট্র।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"