মুক্তমত

বৃক্ষরোপণ হোক সামাজিক

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

সাধন সরকার

এ ধরণিতে নিঃস্বার্থ, প্রকৃত ও উপকারী বন্ধু হলো বৃক্ষ। বৃক্ষের ছায়াতলেই গড়ে উঠেছিল মানবসভ্যতা। তাই বৃক্ষ ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। এক কথায় বৃক্ষ মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে জড়িত। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব রোধ ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষাসহ নৈসর্গিক শোভাবর্ধনে বৃক্ষের গুরুত্ব অপরিসীম। পরিবেশের দূষণরোধ ও বৈশি^ক উষ্ণতা কমাতে গাছ সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে। শুধু জাতীয় বৃক্ষ রোপণ অভিযান বা বৃক্ষমেলার সময় নয়, নিজ নিজ উদ্যোগে প্রত্যেক সচেতন মানুষকে সময়-সুযোগ বুঝে বৃক্ষ রোপণে এগিয়ে আসতে হবে।

জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাবে চিরচেনা গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত ঋতুর বিশৃঙ্খল আচরণ প্রকৃতিকে এলোমেলো করে দিচ্ছে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে ভালো উপায় হচ্ছে বেশি বেশি করে গাছ লাগানো। বাংলাদেশের মোট আয়তনের ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু প্রয়োজনীয় বনভূমি বাংলাদেশে নেই! জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বন বিষয়ক এক প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশের মোট ভূখন্ডের প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ বনভূমি রয়েছে। যদিও সরকারি হিসাবে বনভূমির পরিমাণ প্রায় ১৭ শতাংশ বলা হয়ে থাকে! বিভিন্ন জরিপে দেশে প্রাকৃতিক বনভূমির পরিমাণ কমে যাওয়ার খবর পাওয়া গেলেও বনের বাইরে অর্থাৎ সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। মানুষের সচেতনতা, কমিউনিটি উদ্যোগ এবং সরকারের সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির কারণে লোকালয়ে গাছের সংখ্যা বাড়ছে।

প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি ‘বিশ^ পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা এবং জাতীয় বৃক্ষ রোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা ২০১৯’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে নতুন প্রকল্প গ্রহণকালে প্রাকৃতিক জলাধার সৃষ্টি ও তা সংরক্ষণ এবং অধিক হারে বৃক্ষ রোপণের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি দেশের নাগরিকদের প্রত্যেককে কর্মস্থলে-বাসস্থানে বনজ, ফলদ ও ভেষজ গাছ লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন। বৃক্ষমেলা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আঙিনা, ছাদ, সড়কসহ অফিস-আদালতের যেখানে পরিত্যক্ত জায়গা আছে, সেখানেই গাছ লাগাতে বলেছেন। ঢাকাসহ অন্যান্য বিভাগীয় শহর এলাকায় অনেকের ইচ্ছা থাকলেও জায়গার অভাবে গাছ লাগাতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে ‘ছাদবাগান’ কর্মসূচির মাধ্যমে গাছ লাগানো যেতে পারে। বৃক্ষ মানুষকে মহৎ করে তোলে, শুদ্ধতা অর্জনের জন্যও বৃক্ষমুখী হওয়ার বিকল্প নেই! দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শিশু-কিশোরদের যদি বৃক্ষপ্রেমী হিসেবে গড়ে তোলা যায়; তা হলে সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন দেশ ভরে উঠবে সবুজে সবুজে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বৃক্ষ রোপণের প্রতি উৎসাহিত করতে হবে।

বৃক্ষ রোপণে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বেশি উদ্যোগী হতে হবে। কারো মুখাপেক্ষী না হয়ে সবুজ বাংলাদেশ গড়তে নিজেদেরই উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও বৃক্ষ রোপণের বিকল্প নেই। গাছ লাগানোর এখনই (জুলাই-আগস্ট) উপযুক্ত সময়। দেশের ছোট-বড় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, রেললাইন ও সড়কের পাশে, সরকারি-বেসরকারি অফিস, রাস্তার দুই পাশে, পতিত ও খাসজমিতে, উপকূলীয় এলাকায়, গৃহস্থালির আঙিনায় ও বাড়ির ছাদসহ অন্যান্য জায়গায় ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগানোর ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। দরকার শুধু চেষ্টা ও রক্ষণাবেক্ষণের যথাযথ উদ্যোগ। প্রাকৃতিক বন বৃদ্ধি, সংরক্ষণ এবং টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি সামাজিক ও গৃহস্থালি বনায়নের প্রতি আরো জোর দিতে পারলে বনভূমির পরিমাণ ২৫ শতাংশে আনা অসম্ভব নয়।

লেখক : কলামিস্ট ও পরিবেশকর্মী

 

"