মতামত

স্বপ্নের পক্ষে নায়কের সপক্ষে

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

ফরিদ আহমদ দুলাল

স্বপ্ন ছাড়া পৃথিবীতে মহৎ কিছু সৃষ্টি হয়নি। নায়ক ছাড়া স্বপ্নের বিস্তার হয়নি : আমি তাই স্বপ্নের পক্ষে, নায়কের সপক্ষে। বিখ্যাত ব্রিটিশ কবি আলেক্সজান্ডার পোপের (২১ মে ১৬৮৮-৩০ মে ১৭৪৪) একটা কবিতার কথা মনে পড়ছে। কবিতাটির নাম ‘Happy the man’। কবিতাটি আপনার পড়া থাকতেই পারে, তবু ছোট করে বলি, কবিতাটিতে কবি বলেছেন, সেই মানুষ সুখী যার সামান্য পৈতৃক জমি আছে, যেখানে চাষাবাদ করে সে তার আবশ্যিক আহার জোটাতে পারে; নিজস্ব পুকুরের মাছ তাকে প্রোটিন দেয়, গাভীর দুধ সে পায় কিছু ইত্যাদি। তিন যুগেরও আগে যখন কবিতাটি পড়েছিলাম, আমার মনে তখন প্রশ্ন জেগেছিল, তা হলে কি সুখী মানুষরা স্বপ্নহীন? জীবনধারণের জন্য আবশ্যিক আহার্য ছাড়া তার কিছু চাইবার থাকবে না? সেই প্রশ্নটি তিন যুগ ধরে লালন করেছি বুকের মধ্যে; হয়তো মনোযোগ দিয়ে সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চেষ্টাই করিনি। বাঙালির মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ভাবতে বসে আলেক্সজান্ডার পোপের স্বপ্নহীন সুখী মানুষের কথা মনে পড়ে গেল। কেন? সেটা নিয়েই আজকের আলোচনা।

সম্প্রতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম রচিত “৬-দফা ‘মুক্তিসনদও’ ছিল না, ‘সিআইএর দলিলও’ ছিল না” শিরোনামে নাতিদীর্ঘ একটি গদ্য পড়ে আমার মনে দুটি কথা এসেছে; তার একটি ‘স্বপ্ন’ দ্বিতীয়টি ‘নায়ক’। সুতরাং বলাই বাহুল্য আজকের আলোচনায় ‘নায়ক’ নিয়েও সামান্য কথা বলার চেষ্টা থাকবে। আমি নিজে যেহেতু বিশ্বাস করি, বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে তার যাপিতজীবনালোকে একমাত্র বঙ্গবন্ধুই ‘মহানায়ক’ চরিত্রটি ধারণ করেন; সংগত কারণেই যদি কেউ ‘মহানায়ক’-এর চরিত্রে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষে কালিমা ছিটাতে চান, তার প্রতিবাদ করাটাকে দায়িত্ব মনে করি। আমার বিশ্বাস, শিরোনাম পড়েই বোঝা গেছে কী বলতে চেয়েছেন জনাব সেলিম।

স্বপ্নবান প্রতিটি মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি নিজেকে নায়কের অবস্থানে দেখা এবং তিনি এটাও জানেন ‘বড় গাছের ছায়ায় কখনো ছোট গাছ বেড়ে ওঠার সুযোগ পায় না।’ সুতরাং নিজেকে ‘নায়ক’-‘মহানায়কের’ উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে, তার সামনে থাকা ‘নায়ক’-‘মহানায়কের’ ভাস্কর্যটি সরিয়ে ফেলতে হবেÑ এমন একটি ভুল ধারণা কারো থাকতেই পারে। আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই দূর অতীত তো বটেই, নিকট অতীতেও তেমন দৃষ্টান্ত সহজেই দেওয়া যাবে। ত্রিশোত্তর কবিরা যেমন রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করতে চেয়েছেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে লেনিনের ভাস্কর্য অপসারণ, ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে তার নামে অপপ্রচার-মিথ্যাচার ইত্যাদি; আবার বিপরীত দিকে জিয়ার ভাঙা ব্রিফকেস-ছেঁড়া গেঞ্জিÑ সবই একসূত্র থেকে পাওয়া। নাৎসি নেতা হিটলারের প্রচারমন্ত্রী জেমস গোয়েবলসের ‘মিথ্যাকে সত্য বানাবার সূত্রের’ কথা আমরা সবাই জানি। সুতরাং বঙ্গবন্ধুর মতো মহানায়ক যতক্ষণ মহিরুহ হয়ে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, ততক্ষণ আমার ‘মহানায়ক’ তো দূরের কথা ‘নায়ক’ হওয়ার সুযোগও তো নেই।

তা ছাড়া বাঙালির ইতিহাসে নায়কের সংখ্যা তো একেবারেই অঙ্গুলিমেয় নয়। সহজেই আমরা উচ্চারণ করতে পারি, ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, নেতাজি সুভাষ, মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, প্রীতিলতা, ইলামিত্র, দেবী চৌধুরানী, রানী ভবানী, শেরে বাংলা, মওলানা ভাসানী, নজরুল, জীবনানন্দ, তিতুমীর, সৈয়দ নজরুল, তাজউদ্দীন, রফিক-শফিক-জব্বার-মতিউর-আসাদ, বীরশ্রেষ্ঠ-বীরউত্তমরা, হাজংমাতা রাশিমনি, মনি সিংহ, নূর হোসেনসহ সহস্র নাম। নায়কের জন্ম হয় মানুষের ভালোবাসায়-বিশ্বাসে; যারা ভাবেন নায়ককে খর্ব করলেই নিজের নায়ক হওয়ার পথ প্রশস্ত হবে, তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। মিথ্যাচার করে কারো নামে কলঙ্ক রটিয়ে ইতিহাসে নায়ক হয়ে ওঠা যায় না; যদি যেত এরশাদ বা মইন ইউও নায়ক হয়ে উঠতে পারতেন; পেরেছেন কি? সুতরাং ব্যক্তিগত-গোষ্ঠীগত-দলগত-সম্প্রদায়গত স্বার্থে অথবা ঈর্ষা-হিংসা-বিদ্বেষ-কূপমন্ডূকতা-স্বার্থান্ধতার কারণে কেউ কোনো জাতীয় নায়ককে প্রশ্নবিদ্ধ করে হীন স্বার্থান্ধতায় নিজের অবস্থানকে আঁস্তাকুড়ে নিয়ে যাবেন না!

আসুন আমরা এবার নায়ক-মহানায়কের সঙ্গে স্বপ্নের যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা করি। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম স্বপ্ন সম্পর্কে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বলেছিলেন, ‘স্বপ্ন সেটা নয়, যা তুমি ঘুমের মধ্যে দেখো; স্বপ্ন বরং তাই, যা তোমাকে ঘুমাতে দেয় না!’ আমার মনে হয় আলেক্সজান্ডার পোপের সুখী মানুষরা ঘুমিয়ে ‘স্বপ্ন’ দেখার দলে, যে ‘স্বপ্ন’ আসলে স্বপ্নই নয়। যে স্বপ্ন ঘুম ভাঙার পর তাকে হয়তো কখনো সামান্য আলোড়িত করে, শিহরিত করে এবং স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়; কিন্তু ‘নায়ক’ স্বপ্ন দেখেন এবং সে স্বপ্নকে ছড়িয়ে দেন অন্যের মননে ও চেতনায়। আমরা যদি লক্ষ করি, দেখতে পাব ‘নায়ক’রা সবাই কোনো না কোনোভাবে নিজের স্বপ্নকে ছড়িয়ে দিয়েছেন অন্যের মননে-চেতনায়। যে স্বপ্ন আমাদের নতুন পথের দিশা দিয়েছে, পথচলার প্রেরণা দিয়েছে; যে স্বপ্ন কখনো আমাদের সাহসী ও সংগ্রামী করেছে আর আমরা স্বপ্নবান মানুষকে অনন্য উচ্চতায় স্থান দিয়েছি স্বপ্নের নায়ক হিসেবে। অন্য এক অর্থে আমরা সবাই ‘নায়ক’, কেউ ব্যক্তির ‘নায়ক’, কেউ পরিবারের নায়ক, কেউ গোষ্ঠী-গোত্র-সম্প্রদায়ের নায়ক, কেউ আঞ্চলিক নায়ক ইত্যাদি। কিন্তু সর্বস্তরের নায়ক হয়ে ওঠা সহজ বিষয় নয়। সর্বস্তরের নায়ক হয়ে ওঠার জন্য চাই, ‘স্বপ্নবুনন’ এবং ‘স্বপ্নের বিস্তৃতি’। এবার আসি বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গে; বাঙালির সহস্র স্বপ্ননায়কের তিনি একজন, কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে কীভাবে তিনি হয়ে উঠলেন ‘মহানায়ক’; সেটি গুরুত্বপূর্ণ, সেটি আলোচ্য অনুষঙ্গ।

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে কখনো আমাদের স্বশাসিত হওয়ার সুযোগ আসেনি। স্বশাসিত হওয়ার স্বপ্নটি আমাদের বুকে সেঁটে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। শেখ মুজিব তার যাপিতজীবনে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম-দেশপ্রেম-বাঙালির প্রতি ভালোবাসা আর আত্মত্যাগের মহিমায় ‘নায়ক’ হয়ে উঠেছিলেন ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের আগেই। ১৯৭০-এর নির্বাচন আর ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ তাকে নায়ক থেকে ‘মহানায়ক’ করে তোলে। কেউ চাইলেই নায়ক-মহানায়ক হয়ে উঠতে পারেন না, মানুষের বিশ্বাস আর ভালোবাসাই তাকে ‘নায়ক-মহানায়ক’ করে তুলতে পারে। শেখ মুজিব তার রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে বাঙালির আশা-আকাক্সক্ষার কথা উচ্চারণ করেছেন দৃঢ়তার সঙ্গে। ভাষা আন্দোলন থেকে যুক্তফ্রন্ট, যুক্তফ্রন্ট থেকে শিক্ষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন থেকে ৬ দফা এবং স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন, এভাবেই তিনি জাতিকে বৃহত্তর আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করে তোলেন। এমন নয় যে, এসব আন্দোলন-সংগ্রাম শেখ মুজিব একাই করেছেন, বাঙালির সে লড়াই-সংগ্রামে অনেকেই সম্পৃক্ত ছিলেন; কিন্তু বঙ্গবন্ধু বাঙালির সংগ্রামকে একক নেতৃত্বে পৌঁছে দিলেন স্বাধীনতার স্বপ্নপ্রকোষ্ঠে। ১৯৭০-এর নির্বাচনে তার নেতৃত্বে বাঙালির নিরঙ্কুশ বিজয় এবং ১৯৭১-এর ৭ মার্চ পরবর্তী কদিনে বাঙালির স্বাধীনতা লাভের স্বপ্নটি আপামর বাঙালির চোখে চোখে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। আলেক্সজান্ডার পোপের স্বপ্নহীন সুখী মানুষের চোখেও সেদিন ছড়িয়ে গেল বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নটি। বাঙালির আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘স্বপ্নহীন সুখী মানুষের’ চোখে সেসময় তিনি যে স্বপ্ন জুড়ে দিলেন, সেই স্বপ্নের তাড়নায় ‘অতন্দ্র’ নিরস্ত্র বাঙালি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বিশ্ব জানে ৩০ লাখ মানুষের বুকের রক্ত, ২ লাখ মায়ের সম্ভ্রম আর অবর্ণনীয় সীমাহীন দুর্ভোগ মোকাবিলা করেই বাঙালি স্বাধীনতার সূর্যটাকে নিজের করে নেয়। বাঙালি জাতির ভাষারাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অভূতপূর্ব স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেই শেখ মুজিব ‘নায়ক’ থেকে ‘মহানায়ক’ হয়ে উঠলেন। তার ঠিকানা হয়ে উঠল বাঙালির প্রতিটি ঘর। যত দিন পৃথিবী থাকবে, সভ্যতা থাকবে, মানুষ থাকবে, যত দিন মানুষ ইতিহাস চর্চা করবে; তত দিন শেখ মুজিব বাঙালির মহানায়ক হিসেবে ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন।

আসুন আমরা আমাদের নায়কদের খাটো করার হীন প্রবণতা থেকে নিজেদের সংবরণ করি আর মহানায়কের সম্মান নিজের গৌরব ভেবে মাথার তাজ করে রাখি। দেশ-জাতি আর মানুষের কল্যাণে আসুন আমরা শুভস্বপ্ন রচনা করি আর সে স্বপ্নকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট হই। বাঙালির জীবনে নতুন নায়ক-মহানায়কের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি; বিশেষত বঙ্গবন্ধুর সেই ঘোষণা, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’-এর কথা আমরা যেন ভুলে না যাই। স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছি, কিন্তু বাঙালির জীবনের সার্বিক মুক্তি আজও আসেনি। আজ বাঙালির ‘মুক্তির সংগ্রাম’ এগিয়ে চলেছে, আমরা যেন আজ জাতির নতুন ‘নায়ক’ চিনে নিতে ভুল না করি। আসুন আমরা সবাই স্বপ্নের পক্ষে, নায়কের সপক্ষে থাকি।

লেখক : কবি ও লেখক, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব

 

"