মুক্তমত

নারীর অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক

প্রকাশ : ২৫ জুন ২০১৯, ০০:০০

ফারিহা হোসেন

বাংলাদেশে নারীদের জয়জয়কার অবস্থা বিরাজ করছে। একসময় নারী শুধু গৃহের বৃত্তে বন্দি ছিলেন। এখন নারীরা গৃহকোণ থেকে বেরিয়ে শিক্ষাঙ্গন, রাজনীতিসহ সব অবস্থানে দিগন্ত বিস্তৃত কর্মে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে নিচ্ছেন। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি বিশ্ব পরিমন্ডলে বাংলাদেশের নারী মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। এ অর্জন শুধু আমাদের মা-বোনদের একার নয়, একই সঙ্গে পুরো জাতির জন্যই গর্বের ও সম্মানের।

বাংলাদেশের নারীরা এখন ঘরে-বাইরে, নেতৃত্বে ও কর্মে সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে অবস্থান করছেন। সদ্য চালু হওয়া রাইড শেয়ারিংসহ হেনকাজ নেই যেটাতে নারীর অবস্থান সগৌরবে নেই। শিক্ষকতা, নার্সিং, চিকিৎসা, বিজ্ঞানী, পাইলট, পুলিশ, নৌ, বিমান, সেনাবাহিনী, ব্যবসা, বাণিজ্য, প্রশাসন, রাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা, ট্রেন চালনা, গবেষণায় সর্বত্রই দোর্দন্ড প্রতাপে নারীরা অবস্থান করছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারী, স্পিকার নারী, সংসদের উপনেতা নারী, বর্তমানে শিক্ষামন্ত্রী নারী, আওয়ামী লীগ, বিএনপির প্রধানও নারী। মোবাইল অ্যাপভিত্তিক পরিবহন সেবা থেকে শুরু করে বিমান উড়িয়ে হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিচ্ছেন নারীরা। রাজনীতি, বিচারাঙ্গন, অর্থনীতি, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সরব উপস্থিতি নারীদের। এভারেস্ট বিজয়ী হয়ে বাংলার নারী আরোহণ করেছেন সাফল্যের শিখরে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম প্রকাশিত বৈশ্বিক লিঙ্গ বিভাজন সূচক (গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্স) ২০১৮ অনুযায়ী, বিশ্বে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে বাংলাদেশের অবস্থান। এ সূচকে বিশ্বের ১৪৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৪৮তম। ২০১৭ সালের তুলনায় বর্তমানে দেশের ২৮ ধাপ অগ্রগতি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এমনটা সম্ভব হয়েছে নারীর অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার কারণে।

নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ও জঁ দ্রজ ‘ভারত : উন্নয়ন ও বঞ্চনা’ (২০১৫ সালে প্রকাশিত) বইয়ে লিখেছেন, ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে নারীর অগ্রগতি অনেক বেশি। বাংলাদেশে ৫৭ শতাংশ নারী কর্মজীবী। ভারতে এ হার মাত্র ২৯ শতাংশ। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পদার্পণে নারীর অগ্রগামিতা নিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা সূচক। নারীর এ অগ্রযাত্রার বিষয়ে দেশের উচ্চ আদালতের প্রথম নারী বিচারক নাজমুন আরা সুলতানার অভিমত, ‘প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীরা দক্ষতার পরিচয় দিয়ে উপযুক্ত অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছেন। নারীরা আর পিছিয়ে পড়াদের দলে নেই। নিম্ন আদালতের বিচারক পদেও এখন নারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। যদিও উচ্চ আদালতে নারীর সংখ্যা খুবই কম। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মনোযোগ প্রয়োজন।’

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদন পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ২০১৬ সালে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৭২তম। ২০০৭ সাল থেকে টানা ৯ বছর লিঙ্গবৈষম্য কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে উন্নতি করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, বর্তমানে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ নারী আছেন। সচিব পদে আছেন সাতজন। যদিও উপসচিব থেকে সচিব পর্যায়ে নারীর সংখ্যা ১ শতাংশ বা তারও কম। দেশে সরকারি ও আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১০ লাখ ৯৬ হাজার ৩৩৪টি। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা ৮৩ হাজার ১৩৩ জন। ১৯৭৪ সালে কর্মক্ষেত্রে নারী ছিল ৪ শতাংশ, এখন ৩৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (সচিব) হোসনে আরা বেগমের অভিমত, শিক্ষার প্রসার ও আর্থসামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। তবে শীর্ষ পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো কম। নারীদের মধ্যে দক্ষতা ও যোগ্যতার অভাব নেই। কিন্তু এজন্য দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানো জরুরি। সাংবাদিকতাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে নারীরা এগিয়ে আসছেন এ পেশায়। এর ইতিবাচক ও উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে সাংবাদিকতার মতো ঝুঁকিপূর্ণ, দায়িত্বশীল পেশায়ও নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। এ পেশায় আসতে নারীকে অনেক চড়াই-উতরাই পাড়ি দিতে হয়েছে। ১০ বছর আগের এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, ঢাকা শহরে কর্মরত দেড় হাজার সাংবাদিকের মধ্যে মাত্র ৬০ জন ছিলেন নারী। মোট সাংবাদিকের ৪ শতাংশ। টেলিভিশন চ্যানেল ও দৈনিক পত্রিকা, অনলাইন বৃদ্ধির কারণে এ সংখ্যা বর্তমানে বেড়েছে। এখন দুই শতাধিক নারী কর্মরত আছেন এ পেশায়। জাতীয় প্রেস ক্লাবের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত প্রথম নারী সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিনের অভিমত, গণমাধ্যমে নারীদের অংশগ্রহণ আশানুরূপভাবে বাড়ছে। নারীরা কঠোর পরিশ্রম, দক্ষতা ও যোগ্যতা দিয়ে এ পেশায় নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে নারীর সংখ্যা এখনো হাতে গোনা। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে উচ্চপর্যায়ে নারীদের পদোন্নতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

চিকিৎসা, শিক্ষা ও সেবার ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা পুরুষকে ছাড়িয়ে গেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজে চলতি শিক্ষাবর্ষে ২২০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। তার মধ্যে ১৩৬ জন ছাত্রী, ছাত্র মাত্র ৮৪ জন। আবার ১০ বছরে পুরুষের তুলনায় এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনকারী নারীর সংখ্যাও ৩ হাজারের বেশি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, এ বছর মেডিকেল কলেজগুলোয় ১০ হাজার ২২৩ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। তার প্রায় ৬০ শতাংশ ছাত্রী। জাতিসংঘের শান্তি মিশনের সদস্য হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংঘাতপূর্ণ অবস্থা থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী ও পুলিশের নারী কর্মকর্তারা অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি মিশনে অংশ নিয়ে আমাদের নারীরা নিখুঁত ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন এবং এজন্য তারা প্রশংসিতও হচ্ছেন। আমাদের প্রত্যাশা, নারীরা দেশের উন্নয়নে দেশ-বিদেশে আরো বেশি সক্রিয় ও নিষ্ঠাবান হবেন। তবেই দেশ, জাতি, পরিবার, সমাজের মঙ্গল হবে। (পিআইডি-শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম নিবন্ধ)

লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও কলাম লেখক

 

"