পর্যালোচনা

দেশের বাজেট দশের হলেই সফলতা

প্রকাশ : ১৯ জুন ২০১৯, ০০:০০

সাঈদ চৌধুরী

বাজেট আসলেই অনেকগুলো বিষয়ের কথা মনে হয়। কতটা সঠিক বা বেঠিক তার ব্যাখ্যা অভিন্ন নয়। বড় বাজেট হিসেবে যথেষ্ট গঠনমূলক ও সক্ষমতার বাজেট মনে হলেও এ বাজেটে আরো কিছু বিষয় স্পষ্ট করে উল্লেখপূর্বক যোগ করা প্রয়োজন ছিল। বাজেটে জলবায়ু ও পরিবেশ, কৃষির সক্ষমতা আনয়নে কাজ ও সঞ্চয়পত্রের লাভের ওপর করারোপ এবং কালোটাকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে জমি ও ফ্ল্যাট কেনার অনুমোদন বিষয়গুলো নিয়ে আরো বিস্তর ভাবার জায়গা ছিল।

বদ্বীপ পরিকল্পনায় নারীদের পরিবেশের কাজে সম্পৃক্তকরণ, নদী ও খাল খনন এবং হাওর অঞ্চলের উন্নয়নের কথা বলা হলেও পরিবেশের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। এ বিষয়টির ওপর আলাদাভাবে বরাদ্দ রাখার প্রয়োজন ছিল। পরিবেশ দিন দিনই খারাপ হচ্ছে । যেমনি শিল্পায়ন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে মানুষের অসচেতনতা। যেহেতু পরিবেশ দূষণের সঙ্গে সরাসরি মানুষের কর্মদক্ষতা নির্ভরশীলতার সম্পর্ক রয়েছে সুতরাং এ বিষয়টি আরো গুরুত্ব পাওয়ার কথা। বর্তমান সময়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ ক্ষেত্রে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় তাদের কাজ বাড়াতে না পারলে ভবিষ্যতে হুমকির মুখে পড়বে জনস্বাস্থ্য।

জলবায়ু তহবিলে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং এ কাজের ব্যাপ্তি নিয়ে ভাবনার সময় হয়েছে। শুধু তাই নয়, নদীগুলো বা খালগুলো খননই শেষ কথা নয়। এই জলাশয়গুলোর পানিকে কীভাবে বিশুদ্ধ করা হবে, তা সরকারিভাবেও ভাবতে হবে। বিশ্বের অনেক দেশে শিল্প-সমৃদ্ধ এলাকায় সরকার নিজে উদ্যোগী হয়ে ইটিপি পরিচালনা করে। এখন আমাদের দেশেও কিন্তু এ সময় চলে এসেছে। বিভিন্ন খালের মুখে সেন্ট্রাললি ইটিপি নির্মাণ না করতে পারলে বিশুদ্ধ পানির আকাল সৃষ্টি হবে একসময়। সুতরাং পরিবেশবিষয়ক বাজেট নিয়ে আরেকটু বেশি ভাবনার জন্য নিবেদন রইল। সেন্ট্রাল ইটিপি নির্মাণে অর্থায়ন বড় বেশি প্রয়োজন। তবে এবার বাজেটে মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়েছে। এজন্য সরকারকে ধন্যবাদ। শিল্প এলাকা যেমন নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ সব জায়গায় মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র নির্মাণে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে গ্রাহক যেভাবে লাভ হারাচ্ছেন এতে করে পেনশনভোগী মানুষগুলো বিশেষ করে যারা টাকা ব্যাংকে রেখে জীবন চালান, তাদের জন্য জীবন চালানো দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। ফ্ল্যাট ও প্লটের নিবন্ধন ফি কমানোর সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের লাভ কমানোর ব্যাপারটি একেবারে অসামঞ্জস্য বলা যেতে পারে। একদিকে মধ্যবিত্তরা পড়ে যাবেন বিপাকে; অন্যদিকে উচ্চবিত্তরা পাবেন সুবিধা! সঞ্চয়পত্রের লাভের ওপর কর কমিয়ে বরং ফ্ল্যাট ও প্লটের নিবন্ধন ফির ওপরই নিয়ন্ত্রণ আনা প্রয়োজন আর এতে করে মধ্যবিত্ত ও নি¤œ মধ্যবিত্ত মানুষগুলো কিছুটা হলেও স্বাচ্ছন্দ্যে থাকবেন।

কৃষকের যন্ত্রাংশের মূল্যের ওপর কর ছাড়লেও কৃষকদের স্বাস্থ্যবিমা বা কৃষকদের কৃষিকাজে সরকারের বিভিন্ন লগ্নির ব্যাপারে তেমন আশাজাগানিয়া কিছু উল্লেখ করা হয়নি। কৃষক এবার ধানের দাম নিয়ে প্রচন্ড রকম বিপাকে পড়েছেন। হঠাৎ ঝড়ে অনেক কৃষক কিস্তি ঋণের টাকা পরিশোধ করতেও হিমশিম খাচ্ছেন। এ খাতে নতুন ঋণদান কর্মসূচি, তাৎক্ষণিক ঋণের ব্যবস্থার বিষয়গুলো বিবেচনায় আনার প্রয়োজন ছিলা খুব বেশি।

মোবাইলে কথা বলার ক্ষেত্রে যেভাবে টাকার বোঝা গ্রাহককে চাপানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, এ নিয়ে আরো ভাবার রয়েছে। সামাজিক সুরক্ষায় যে অর্থলগ্নি করা হচ্ছে সেখানে শেষ পর্যন্ত কতজন মানুষ উপকৃত হয়, তার সঠিক পরিমাণও জানা যায় না বলে এখানে দুর্নীতির সম্ভাবনা বেশি থাকে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায় ভাতাগুলো সঠিকভাবে বিন্যস্ত না হওয়া। জনপ্রতিনিধিরা অনেক সময়ই ভাতা প্রদানে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে থাকেন। অনেক বৃদ্ধ মানুষ, বিধবা নারী ভাতা পান না অথচ পাশেই ভাতা পান কর্মক্ষম মানুষÑ এমন উদাহরণও কম নয়। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষগুলো চিকিৎসার পুরো ভার সরকার নেবেÑ এমন বাজেট প্রত্যাশা করি। অনেক রোগাক্রান্ত শিশু বিনা চিকিৎসায় মারা যায় অথচ সরকারি সাহায্য তারা পায় না। উপজেলা থেকে শুরু করে জেলা পর্যায় পর্যন্ত ঘুরে ঘুরেও সাহায্য সময়মতো না পাওয়ার কারণে মৃত্যুকে বরণ করে নিতে হয়।

দুর্নীতি প্রতিরোধ কার্যক্রমের বাজেট সংক্রান্ত কোনো আলাদা ব্যাপ্তি পাওয়া যায়নি। দুদকের কাজ মাঠপর্যায়ে পরিচালনার জন্য দুদক যাতে শক্তিশালীভাবে কাজ করতে পারে, এজন্য দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারের আলাদা বাজেট থাকা প্রয়োজন বলে মনে করি। ভালো দিকগুলোর মধ্যে সিগারেটের দাম বৃদ্ধি, গবেষণায় অর্থায়ন, তরুণদের কাজের সৃষ্টিতে বড় বিনিয়োগ এবং পোশাকশিল্পের বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনাগুলো উল্লেখযোগ্য। শিক্ষা খাতে ভাগ ভাগ করে আরো কিছু ভালো কাজ করা যেতে পারত।

বাজেট সাধারণ মানুষের জন্য সুফল বয়ে আনলেই তা কেবল দেশের জন্য ভালো। যে যে বিষয়গুলো বাদ পড়ে গেছে বা আংশিক আছে অথচ প্রয়োজনীয় তা নিয়ে সরকার ভাববে এটাই প্রত্যাশা। অনেকগুলো খাত নিয়েই একটি দেশ আর সে দেশের প্রধান উপাদান হলো নাগরিক। বেশির ভাগ নাগরিক তাদের মূল অধিকারটুকু পাবে সরকারের প্রত্যাশা থাকে এটাই কিন্তু সেখানে যে যে বিষয়গুলো বাদ সাধে সে সে বিষয়গুলো গবেষণা করে পরিত্রাণ করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত। আমাদের দৃঢ়চেতা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এমন প্রত্যাশা আমাদের রয়েই যাবে চিরকাল ।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

"