মুক্তমত

বিজ্ঞান শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে কেন?

প্রকাশ : ১৯ জুন ২০১৯, ০০:০০

অলোক আচার্য

সাধারণ শিক্ষায় আমাদের দেশে তিন ধরনের শিক্ষা প্রচলিত রয়েছে। বিজ্ঞান শিক্ষা, মানবিক শিক্ষা ও বাণিজ্য শিক্ষা। বহু দিন ধরেই এ পদ্ধতির শিক্ষা চালু রয়েছে। যখন পিইসি বা জেএসসি ছিল না, তখনো নবম শ্রেণিতে উঠলেই তাকে যেকোনো এক বিভাগে ভর্তি হতে হতো। সাধারণভাবে যেসব ছাত্রছাত্রী তুলনামূলক মেধাবী তারা বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হতো। বাকিরা মানবিক এবং বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হতো। এখনো তাই হয়। যারা বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে লেখাপড়া করে ধরেই নেওয়া হয় তারা মেধাবী। কিন্তু বিষয়টি পুরোপুরি সঠিক নয়। এখন অনেক মেধাবী ছাত্রছাত্রী বিজ্ঞানের বাইরে তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য বাণিজ্য বা মানবিক বেছে নিচ্ছে। এই তিনটি আলাদা আলাদা বিভাগ করার উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীর আগ্রহ। শিক্ষার্থীদের আগ্রহে ভিন্নতা থাকে। সেদিকে দৃষ্টি রেখে এবং ভবিষ্যতে ভিন্ন ধরনের চাকরির ব্যবস্থা করতে এই তিন বিভাগের ব্যবস্থা করা হয়। কয়েক দশক আগেও দেশে বিজ্ঞান বিভাগের চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি। ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বিজ্ঞান বিভাগ। অষ্টম শ্রেণি থেকে যারা একটু মেধাবী তারা প্রায় সবাই বিজ্ঞান বিভাগ নিত। বিপরীতে মানবিক এবং বাণিজ্যে বিভাগের চাহিদা ছিল তুলনামূলকভাবে কম। অভিভাবকদের কাছেও বিজ্ঞান বিভাগ আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের কাছে বিজ্ঞান বিভাগের আগ্রহ হারাচ্ছে। চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় ১৭ লাখ পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে ৭ লাখ ৭৫ হাজার ৩৪০ জন শিক্ষার্থী মানবিক শাখার; যা মোট শিক্ষার্থীর ৪৫ শতাংশের বেশি। বিজ্ঞানে শিক্ষার্থী ছিল ৩১ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এই চিত্রেই স্পষ্ট হয়ে উঠে আজকাল বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমেছে অনেকটাই। শিক্ষা পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে মাধ্যমিকে মোট এসএসসি পরীক্ষার্থীর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগের পরীক্ষার্থী ছিল ৪২ দশমিক ৮১ শতাংশ। আর ২০১৬ সালে এই হার নেমে দাঁড়ায় ২৯ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী নবম এবং একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির হারের দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চাহিদা বাড়ছে বাণিজ্য এবং মানবিক বিভাগের। বিশেষ করে বাণিজ্য বিভাগের ওপর। এ কথা সত্যি যে, বিশ্বায়নের যুগে বাণিজ্য বিভাগের ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ কিছুটা বেশি। আর ছেলে বা মেয়ে উভয়ই ব্যাংক, বিমাসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় চাকরির স্বপ্ন দেখে সেই শুরু থেকেই। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑ বিজ্ঞান বিভাগের ওপর থেকে ছাত্রছাত্রীরা আগ্রহ হারাচ্ছে কেন। বিজ্ঞান বিভাগেও চাকরির যথেষ্ট সুযোগ আছে। কয়েকটি বিষয় বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় এর পেছনে যে কারণগুলো রয়েছে তা হলোÑ ১. বিজ্ঞান বিভাগের বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা, যা স্কুলজীবন থেকেই শুরু হয় এবং দুর্বল থেকেই লেখাপড়া চালিয়ে যায়। বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞানের মতো বিষয়ে। ২. বিজ্ঞান বিভাগের ক্যারিয়ার গঠনের সুযোগ অন্য বিভাগ থেকে তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। বেড়েছে বাণিজ্য এবং মানবিক ক্ষেত্রে।

এবার ব্যাখ্যা করা যাক। একসময় বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়ার উদ্দেশ্যই ছিল হয় ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়া। আমাদের দেশে এখনো এমন বহু অভিভাবক আছেন যারা সন্তানের আগ্রহ না থাকলেও কেবল সে মেধাবী বলে নবম শ্রেণি থেকেই জোর করে বিজ্ঞান বিভাগ চাপিয়ে দেওয়া হয়। তার উদ্দেশ্য থাকে তাকে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বানিয়ে ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। কিন্তু তারা এ কথা বুঝতেই চান না যে, তার সন্তান আনন্দ না পেলে সে বিষয়ে কীভাবে লেখাপড়া করবে। তবে সেই আগ্রহটাইবা হারাচ্ছে কেন? কেন আনন্দের সঙ্গে বিজ্ঞান নিয়ে পড়বে না ছাত্রছাত্রীরা। সময় এসেছে বিষয়টি নিয়ে ভাবার এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার। আমাদের দেশে মফস্বল অঞ্চলে যে স্কুল-কলেজ রয়েছে, সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান বিভাগে যেসব শিক্ষক রয়েছেন, তাদের দুর্বলতা রয়েছে। বিজ্ঞান স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কাছে আজও কঠিন এবং জটিল একটি বিষয়। গণিতও রীতিমতো একটি ভয়ের বিষয়। অথচ বিজ্ঞান যে মজার একটি বিষয়, সে বিষয়টি উপস্থাপন করতে ব্যর্থ শিক্ষকরা। আবার বিজ্ঞান বিভাগ মানেই গণিত ও ইংরেজির সঙ্গে আরো অতিরিক্ত কয়েকটি বিষয় প্রাইভেট পড়া। প্রাইভেট মানেই বাড়তি খরচ। এ হিসাবটাও অভিভাবকরা মাথায় রাখেন। তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণও থাকে না। বিজ্ঞানের কাঠিন্যের ধারণাটি সেই প্রথম থেকেই চলে আসছে। তাই বিষয়টিকে সহজ করে উপস্থাপন করতে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতেও দেখা যায় না শিক্ষককে। শিক্ষক সেই গতানুগতিক পদ্ধতিতেই বিজ্ঞান শিক্ষা উপস্থাপন করেন। অথচ যে বিষয়টি চিত্র বা অন্য উপকরণ অথবা ডিজিটাল মাধ্যমে খুব সহজে এবং অল্প সময়েই উপস্থাপন করা সম্ভব, সেই বিষয়টি কয়েকটি ক্লাস নিয়েও ছাত্রছাত্রীদের কাছে সহজ পাঠ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। এ ক্ষেত্রে আর একটি বিষয় বিবেচ্য হলো কেবল লেকচার বা চক, ডাস্টারভিত্তিক লেখাপড়ার মাধ্যমে কোনো জটিল পাঠ আপাত বোঝানো গেলেও ছাত্রছাত্রীর মনে তার স্থায়িত্ব খুব বেশি হয় না। কিন্তু যদি উপকরণ বা ডিজিটাল মাধ্যমে উপস্থাপন করা যায়; তা হলে তার স্থায়িত্ব থাকে অনেক বেশি। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকের সফলতার হার বেশি থাকে। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ বিদ্যালয়েই তা হচ্ছে না। কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নজরদারি করছে কম। ফলে স্কুলজীবন থেকেই বিজ্ঞানের ওপর অহেতুক ভীতি থেকে যায়; যা পরবর্তী সময়েও প্রভাব ফেলে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিলেবাসের মাত্রাতিরিক্ত চাপ, বিজ্ঞান শিক্ষার মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়ভার, স্কুল-কলেজে চাহিদানুযায়ী গবেষণাগার না থাকা, দক্ষ শিক্ষকের অভাব, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব ইত্যাদি বিজ্ঞান শিক্ষাকে শিক্ষার্থীদের কাছে দুর্বোধ্য করে তুলছে।

নবম-দশম শ্রেণিতে কোনোমতে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়ালেখা শেষ করে অনেক ছাত্রছাত্রী কলেজে গিয়ে মানবিক বা বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হয়। এর কারণ কিন্তু সেই দুর্বোধ্যতা। তারা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। আবার অনেকেই কলেজ থেকে বিজ্ঞান নিয়ে পড়া শেষে উচ্চশিক্ষায় মানবিক বা বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হয়। বিজ্ঞানকে মজার করে তুলতে দেশে এখন নানা কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়। তবে তার বেশির ভাগই হচ্ছে শহরকেন্দ্রিক। গ্রামগঞ্জে সেসব কার্যক্রম খুব কম। এ ক্ষেত্রে অন্ততপক্ষে যদি মাঝে মাঝে বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করা যায়; তা হলে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানের মজার বিষয়গুলো দেখতে পারে। এখানেও যে আনন্দ খুঁজে পাওয়া যায়, তা বুঝতে পারবে। তাদেরই কিছু সহপাঠী যখন নতুন কিছু বানানোর চেষ্টা করবে, তখন তা অন্য সহপাঠীকেও প্রভাবিত করবে। সেই আনন্দ বা আগ্রহ যাতে ছাত্রছাত্রী ধরে রাখতে পারে প্রথমত শ্রেণিতে শিক্ষক এবং অভিভাবকের সঙ্গে সরকারেরও যথেষ্ট ভূমিকা আছে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করার। অভিভাবকদের উচিত তার সন্তানের আগ্রহের দিকটি গুরুত্ব দেওয়া। জোর করে চাপিয়ে দিলে সন্তান সত্যি বিষয়টির ওপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে। সেসঙ্গে শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের ক্ষেত্রে যেন উপকরণ ব্যবহার করেন, তা স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে তদারকি করতে হবে। তাছাড়া এমন কিছু ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রছাত্রী প্রয়োজন। নতুন প্রজন্ম যদি বিজ্ঞান নিয়ে অগ্রসর না হয়; তা হলে অগ্রগতিও বাধাগ্রস্ত হবে। নতুন চিন্তাভাবনা, নতুন কিছু আবিষ্কারÑ এসব বিজ্ঞানেরই কাজ। তাছাড়া আজ নির্মাণকাজসহ বিভিন্ন কাজে বাইরের দেশ থেকে প্রযুক্তি এনে অধিক খরচে ব্যবহার করছি তা ব্যয়বহুল। কিন্তু নিজ দেশে প্রযুক্তির উৎকর্ষ ঘটানো গেলে আমাদের বিদেশনির্ভর হয়ে থাকতে হবে না।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

"