বিশ্লেষণ

বিলম্বে ধান কেনার সিদ্ধান্ত এবং...

প্রকাশ : ১৯ জুন ২০১৯, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

চলতি বোরো মৌসুমে কৃষকের কাছ থেকে প্রতি কেজি ২৬ টাকা দামে আরো আড়াই লাখ টন ধান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিলম্বে হলেও সরকারের এ সিদ্ধান্ত প্রশংসার দাবিদার ও অভিনন্দন যোগ্য। অপরদিকে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিডিপি) বলছে, ধানের দাম কমায় কৃষক চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কৃষকের এ ক্ষতি পূরণের জন্য প্রত্যেক কৃষককে ৫ হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা প্রদান করা উচিত। এতে সরকারের ব্যয় হবে ৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। ১ কোটি ৮০ লাখ কৃষকের ব্যাংক হিসাবে টাকাটা সহজে পৌঁছে দেওয়ারও সুযোগ রয়েছে। রফতানি খাতে ঢালাওভাবে ৫ শতাংশ প্রণোদনা দাবি করা হচ্ছে। এতে লাগবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। ফলে কৃষকের ৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ভর্র্তুকি বেশি নয়। এটা দিলে তা হবে যুক্তিযুক্ত ও সাম্যবাদী আচরণ।

দাম পড়ে যাওয়ায় কৃষকের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে দিতে ২৬ টাকা কেজি দরে আরো আড়াই লাখ টন ধান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর আগে একই দামে কৃষকের কাছ থেকে চলতি বোরো মৌসুমে দেড় লাখ টন ধান কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে চলতি বোরো মৌসুমে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি চার লাখ টন ধান কিনবে সরকারের খাদ্য বিভাগ। এবার বোরো ফলন ‘অনেক উদ্বৃত্ত’ হয়ে গেছে। দেশের খাদ্যগুদামগুলোর ধারণক্ষমতা ১৯ লাখ ৬০ হাজার টন। আর এখন গুদামে আছে ১৪ লাখ টন খাদ্যশস্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা মোতাবেক কৃষকের কাছ থেকে আরো আড়াই লাখ টন ধান কেনা হবে। এতেও বাজার না উঠলে, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহের পরিমাণ আরো বাড়ানো হবে, যাতে কৃষক ন্যায্যমূল্য পান ।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৮ মার্চ, খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির বৈঠকে চলতি বোরো মৌসুমে মোট ১৩ লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২৫ এপ্রিল থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এই সংগ্রহ অভিযান চলবে। এর মধ্যে প্রতি কেজি ২৬ টাকা দরে কৃষকের কাছ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টন ধান, প্রতি কেজি ৩৫ টাকা দরে ১ লাখ ৫০ হাজার টন আতপ চাল এবং প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে ১০ লাখ টন সিদ্ধ চাল চুক্তিবদ্ধ মিল মালিকদের নিকট থেকে সংগ্রহ করা হবে। এতে কৃষকের চেয়ে মিল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীরাই বেশি লাভবান হবেন। তারা কৃষকের কাছ থেকে ১২ থেকে ১৪ টাকা কেজি দরে ধান কিনে চাল তৈরি করে প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে সরকারি গুদামে সংগ্রহ করবেন। অন্যদিকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে কৃষক ধান উৎপাদন করেন, তাকে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ধান বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হতে হবে। সময়মতো সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু না হওয়ায় একশ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী, মিল মালিক ও ফড়িয়া সেই সুয়োগ গ্রহণ করে ইচ্ছামতো ধানের দাম নির্ধারণ করায় ধান নিয়ে মহাবিপদে পড়েন কৃষক। ধানের দাম একেবারে কমে যায়। দেশের বিভিন্ন হাটবাজারে প্রতি মণ বোরো ধান বিক্রি হয় ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা দরে। অন্যদিকে ধান কাটার জন্য প্রতিদিন কৃষিশ্রমিকের মজুরি দিতে হয় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। এতে কৃষকের মধ্যে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কৃষক সংগঠনগুলো দেশের নানা জায়গায় রাস্তায় ধান ফেলে প্রতিবাদ জানায়। মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করে। জেলা প্রশাসকের নিকট স্মারক লিপি প্রদান করে। দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ক্রয় কেন্দ্র স্থাপন করে সরকার নির্ধারিত দামে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয়, কৃষিঋণের সুদ মওকুফ এবং বিনামূল্যে কৃষকের মধ্যে সার, বীজ ও কীটনাশক বিতরণের দাবি জানায়। দাবি জানায় কৃষি খাতে ভর্তুকি ও বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির জন্য। ১৪ দলীয় জোটের শরিকরাও এ ব্যাপারে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

এ পরিস্থিতিতে কৃষককে বাঁচাতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে মন্ত্রণালয়কে বেশি ধান কেনার ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করে খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। পাশাপাশি চাল আমদানি নিরুৎসাহিত করতে আমদানি শুল্ক বাড়ানো হয় এবং ধানের দাম বৃদ্ধির জন্য চাল আমদানি নিষিদ্ধ করতেও নির্দেশ দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

ধান-চালের আর্দ্রতা মাপার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় তিন হাজার মেশিন ক্রয় করবে, যাতে কৃষক সরকারি গুদামে ধান সরবরাহের আগে তার ধানের আর্দ্রতা ঠিক আছে কি না, তা জেনে নিতে পারেন। ভবিষ্যতে কৃষকের কাছ থেকে অধিক পরিমাণ ধান সংগ্রহর জন্য সরকার দেশের ২০০ স্থানে পাঁচ হাজার টন ধারণ-ক্ষমতাসম্পন্ন স্টিলের মিনি পেডি সাইলো নির্মাণ করবে। সেখানে কৃষকের ধান শুকানোর জন্য ড্রায়ার মেশিনেরও ব্যবস্থা থাকবে। এসব কার্যক্রম কৃষকের কাছে থেকে সরাসরি ধান কেনার কর্মকা-কে ত্বরান্বিত করবে এবং কৃষকের ভোগান্তিও কিছুটা হলেও লাঘব হবে।

অন্যদিকে সরকার কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ১০ থেকে ১৫ লাখ টন চাল রফতানির বিষয়টিও সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে। এ ব্যাপারে খাদ্যনীতি বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের (ইএফপ্রি) মতে, বাংলাদেশ এখনো চাল রফতানির পর্যায়ে পৌঁছেনি। ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারকে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনতে ভারতের পশ্চিবঙ্গের মতো পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত। সংস্থাটির পক্ষ থেকে ধান-চালের দাম, কৃষি ব্যবস্থাপনা ও চালের আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি তুলে ধরে বলা হয়, ধানে দামের ওঠানামায় গরিব ক্রেতা ও কৃষক বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। সরকারে এ মুহূর্তের কর্তব্য হবেÑ এ দুই শ্রেণির মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া। বাংলাদেশে ধান-চালের উৎপাদন এখনো স্থিতিশীল জায়গায় পৌঁছায়নি। কোনো বছর উৎপাদন বেশি হয়। আবার কোনো বছর কম হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতারা এ ধরনের অস্থিতিশীল উৎপাদনের দেশ থেকে চাল কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করবে না। এ ছাড়া দেশে রফতানিযোগ্য কী পরিমাণ চাল আছে, তার কোনো বস্তুনিষ্ঠ তথ্যপ্রমাণ নেই। অপরদিকে উৎপাদিত চালের বাজারও খুবই সীমিত। আর এই চালের বাজার ভারত নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে বাংলাদেশ চাইলেও দেশটির পক্ষে চাল রফতানি করা খুব সহজ হবে না।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করে তার দাম মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কৃষকের ব্যাংক হিসাবে পাঠিয়ে দেয়। গ্রাম এলাকা থেকে কৃষকের ধান সংগ্রহের জন্য আছে ‘সেলফ হেলপ গ্রুপ’ নামের দল। তারা কৃষকের ধান সংগ্রহ করে জেলা খাদ্য কর্মকর্তাকে জানায়। আর রাজ্য সরকার ওই ধান বাংলাদেশি টাকায় ২০ টাকা ৮০ পয়সা কেজি দরে সংগ্রহ করে। রাজ্য সরকার এ বছর সরাসরি কৃষকের কাছে থেকে ৫২ লাখ টন ধান সংগ্রহ করবে। বাংলাদেশের তুলনায় পশ্চিবঙ্গ সরকার কৃষকদের ভর্তুকি ও সহায়তা দেয় বেশি। সরকার বেসরকারি গুদাম ভাড়া দিয়ে তাদের ব্যবস্থাপনায় ধান সংগ্রহ করে রাখে। পরে তারা বেসরকারি মিল মালিকদের কাছ থেকে ওই ধান ভাঙিয়ে চাল তৈরি করে। যেসব ‘সেলফ হেলপ গ্রুপ ’ কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করে এনে দেয়, তাদের প্রতি কুইন্টাল ধানের জন্য ৩১ দশমিক ২৫ রুপি করে দেওয়া হয়। গুদামে বয়ে আনার জন্য পরিবহন খরচ হিসেবে অতিরিক্ত ২০ রুপি করে প্রতি কুইন্টালের জন্য দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সরকারে উচিত হবে বছরের শুরুতে ধানের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করে তা কৃষককে জানিয়ে দেওয়া। এতে কৃষক কী পরিমাণ জমিতে ধান চাষ করবেন, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রীর কথাÑ সামনের বছর থেকে যত দ্রুত সম্ভব ধানের সংগ্রহ মূল্য ঘোষণা করা হবে। ধান সংগ্রহের পরিমাণ পর্যাক্রমে বৃদ্ধি করে ৫০ লাখ টনে উন্নীত করা হবে।

আমাদের কথা হলোÑ পশ্চিবঙ্গের রাজ্য সরকার যদি বছরে ৫২ লাখ টন ধান কৃষকের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত মূল্যে সংগ্রহ করতে পারে, তা হলে বাংলাদেশ পারবে না কেন? বাংলাদেশও পারবে। এজন্য প্রয়োজন কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহ ও মূল্য প্রদানের একটি যুগোপযোগী কৃষকবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)

নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লি., নাটোর

[email protected]

 

"