বিশ্লেষণ

ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে মৃত্যুর শঙ্কা

প্রকাশ : ১৮ জুন ২০১৯, ০০:০০

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ

ওষুধশিল্পের অভাবনীয় উন্নতি ঘটলেও দেশের বাজার ভেজাল ওষুধে সয়লাব হয়ে গেছে। ফলে ওষুধের মান নিয়ে প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। একশ্রেণির ওষুধ কোম্পানি বেশি মুনাফা লাভের আশায় তৈরি করছে বিভিন্ন ধরনের ভেজাল ওষুধ। এসব ভেজাল ওষুধ সেবন করে রোগীরা আক্রান্ত হচ্ছে জটিল ও কঠিন রোগে। অনেক সময় এসব ওষুধ সেবনের কারণে মারা যায় অনেক রোগী। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালালেও বন্ধ করা যাচ্ছে না ভেজাল ওষুধের দৌরাত্ম্য।

ওষুধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যালোপ্যাথিক থেকে শুরু করে আয়ুর্বেদিক সব ওষুধেই মিলছে ভেজাল। এ অপরাধের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা না থাকায় ভেজাল ওষুধের ব্যবহার বাড়ছে। এ ছাড়া ওষুধ খাতের দুর্নীতি, আইন প্রয়োগের শৈথিল্য, প্রশাসনের নজরদারির অভাব, প্রযুক্তিগত অসমর্থতা, দক্ষ-প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে ভেজাল ওষুধ বাজারজাতের প্রধান কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ১০ জুন ফার্মগেটের খামারবাড়িতে আ কা মু গিয়াস উদ্দিন মিলকী মিলনায়তনে ‘বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপপরিচালক মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার জানিয়েছেন, রাজধানীর ৯৩ শতাংশ ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। তিনি জানান, গত ৬ মাসের নিয়মিত বাজার তদারকির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, রাজধানীর প্রায় ৯৩ শতাংশ ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। তিনি আরো জানান, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রাখার দায়ে ভোক্তা আইনের বিভিন্ন ধারায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা ও সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

এর আগে ২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদনে ব্যর্থ ২০টি কোম্পানির সব ওষুধ এবং ১৪টি কোম্পানির অ্যান্টিবায়োটিক সরবরাহ, বিক্রি বন্ধ ও বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকোর্ট। যে ২০ ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিকে ওষুধ উৎপাদন বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলোÑ এক্সিম, এভার্ট, বিকল্প, ডলফিন, ড্রাগল্যান্ড, গ্লোব ল্যাবরেটরি, ন্যাশনাল ড্রাগ, নর্থ বেঙ্গল, রেমো কেমিক্যাল, রিড ফার্মা, জানফা, কাফমা, মেডিকো, স্কাই ল্যাব, স্পার্ক, টুডে, ট্রপিক্যাল, ইউনিভার্সেল, স্টার ও সুনিপুণ। এবং যে ১৪টি কোম্পানিকে অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলোÑ আদদীন, বেঙ্গল, ব্রিস্টল, ক্রিস্টাল, ইন্দোবাংলা, মিল্লাল, এমএসটি, অরবিট, ফার্মিক, ফিনিক্স, সেভ, রাসা, বেলসেন ও আলকাদ।

ভেজাল ওষুধ সম্পর্কে মিটফোর্ড হাসপাতালের ইউরোলজিস্ট ও অ্যান্ড্রোলজিস্ট বিভাগের ডা. এম মাহফুজুর রহমান বলেন, ভেজাল ওষুধ সেবন করলে রোগী সুস্থ হওয়ার বদলে আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে। অনেক সময় রোগীর জীবনও চলে যেতে পারে। সাধারণত ভেজাল ওষুধ সেবন করলে রোগীর প্রথমে বমি, মাথাব্যথা হতে পারে। এসব ওষুধ সবচেয়ে বেশি মানুষের লিভার ও কিডনিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ভেজাল ওষুধের ফলে মেটাপলিজম রোগ লিভারে বেশি ধরা পড়ে। তিনি আরো বলেন, ওষুধ ভেজাল হওয়ার কারণে কিডনিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বে ১৫ শতাংশ ওষুধই ভেজাল। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ ভেজাল ওষুধ তৈরি হয় ভারতে। এরপর নাইজেরিয়ায় ২৩ শতাংশ। এ দেশটির মোট ওষুধের মধ্যে ৪১ ভাগই ভেজাল ওষুধ। এরপর রয়েছে পাকিস্তান; যার শতকরা ১৫ শতাংশ ওষুধই ভেজাল। বাংলাদেশের ওষুধ নিয়ে কোনো গবেষণা করা হয়নি। তবে দেশের একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে শতকরা ১০ ভাগ ভেজাল ওষুধ বিক্রি হয়। যার মূল্য ১ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশে দুটি ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি রয়েছে। একটি রাজধানীর মহাখালীতে আর একটি চট্টগ্রামে। যদিও এই দুটি ল্যাবরেটরির কার্যবিধি প্রশ্নবিদ্ধ! জব্দকৃত ভেজাল ওষুধ বেশির ভাগ টেস্টের আগেই বদলে ফেলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ওষুধ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এখানকার কিছু কর্মকর্তার যোগসূত্র রয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়। ওষুধ টেস্টিং ল্যাবরেটরি দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৫ সালে ওষুধের নমুনা সংগ্রহ করা হয় ৭ হাজার ১টি। এর মধ্যে মানোত্তীর্ণ নমুনার সংখ্যা ৬ হাজার ৬১২টি ও মানবহির্ভূত নমুনার সংখ্যা ২৫৬।

ভেজাল ওষুধের অনুসন্ধানে জানা যায়, বহু বৈধ কোম্পানিও ভেজাল ও নি¤œমানের ওষুধ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া সরকারি হাসপাতালের বিনামূল্যের ওষুধ ফার্মেসিগুলোতে বিক্রি হচ্ছে অবাধে। একই সঙ্গে ওষুধের মেয়াদ টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে তা বিক্রি করছে ফার্মেসিগুলো। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে কেউ কেউ আটক হলেও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে আবারও পুরোনো ব্যবসায় নেমে পড়ছেন।

বাংলাদেশের ওষুধের সবচেয়ে বড় পাইকারি মার্কেট রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতাল এলাকা। ভেজাল ও নি¤œমানের ওষুধ তৈরির অন্যতম আখড়াও হচ্ছে ঢাকার মিটফোর্ড এলাকা এবং এখান থেকেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভেজাল ওষুধ ছড়াচ্ছে। এর পরও এখানে ওষুধ টেস্টিংয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। মিটফোর্ডের কিছু ওষুধ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেশির ভাগ ওষুধ কোম্পানি এখান থেকে ওষুধের কাঁচামাল কিনে নিয়ে যায়। যে ওষুধগুলোর দাম বেশি ও সহজে পাওয়া যায় না, সেসব ওষুধগুলো ভেজাল করে থাকেন তারা।

ভেজাল কীভাবে করা হয়, তা জানতে চাইলে তারা জানান, আসল ওষুধের কাঁচামালের সঙ্গে আটা ও চিনি মিশিয়ে ওষুধ তৈরি করে। এটি পরীক্ষা ছাড়া ধরা সম্ভব নয়। এ ছাড়া কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সমিতির মাধ্যমে সারা দেশের ওষুধের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সংগঠনের প্রভাবশালী নেতাদের মাধ্যমেই রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ওষুধের দোকানে ছড়িয়ে পড়ে ভেজাল ওষুধ।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়ের বাজারের এক ওষুধ ব্যবসায়ী জানান, ওয়াল ব্যথানাশক-১০ এমজি মূল্য ১০ টাকা; যা ভেজালগুলো একই রকম প্যাকেট ১ টাকা পিস কিনে ১০ টাকায় বিক্রি করে থাকে। মেট্রোনিউজল-৫০০ এমজি অপারেশন রোগীদের জন্য মূল্য প্রতি পিস ১ টাকা ৩০ পয়সা অথচ এই নামের ওষুধ ২০ থেকে ৩০ পয়সায় কিনে কিছু দোকানি ১ টাকা ৩০ পয়সায় বিক্রি করে থাকেন। ক্যাটগার্ড রোগীর সেলাইয়ে লাগে যার মূল্য ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা অথচ সেখানে তা কিনে কিছু দোকানি ৪০ থেকে ৫০ টাকায়, যা আসল ওষুধ মূল্যে বিক্রয় করে থাকেন। অপারেশনে জেন্ডামাইসিন ইনজেকশন ২০ টাকায় কিনে ২৯০ টাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা বিক্রয় করে থাকেন। লাভ বেশি হওয়ার কারণে তারা এসব ভেজাল ওষুধ বিক্রি করছেন।

বাংলাদেশে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন এবং বিতরণের অভিযোগে ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে ২০টি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করে সরকার। সেই সঙ্গে আরো ৩৮টি প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি করে ওষুধ উৎপাদনের অনুমতি বাতিল করে তাদের সতর্কতা দেওয়া হয়। প্রশ্ন হচ্ছে একজন রোগী কীভাবে বুঝবে কোন ওষুধটি ভেজাল, নকল বা নিম্নমানের?

বাংলাদেশে ১৯৮০ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ক্ষতিকর প্যারাসিটামল সিরাপ খেয়ে অসংখ্য শিশুর মৃত্যু ঘটেছিল। সরকারের ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের হিসাবে সংখ্যাটি ২ হাজারের বেশি। পুরো আশির দশকজুড়েই কয়েকটি কোম্পানির তৈরি প্যারাসিটামল সিরাপ খেয়ে ছোট ছোট বাচ্চাদের কিডনি অকেজো হয়ে মৃত্যুর ঘটনাটি ব্যাপক আলোচিত একটি ব্যপার ছিল। গণমাধ্যমে এ নিয়ে খবর প্রকাশ হতে থাকলে একপর্যায়ে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর কয়েকটি কোম্পানির প্যারাসিটামল সিরাপ পরীক্ষা করে। তাতে ধরা পড়ে ক্ষতিকারক ড্রাই-ইথিলিন গ্লাইকল নামের বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতি, যা সেবনে কিডনি অকেজো হয়ে মৃত্যু ঘটতে পারে। এরপর ১৯৯২ সালে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর ৫টি মামলা করে। ২ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে তার কয়েকটি ঘটনার বিচার হয়। এখনো কয়েকটি মামলা আদালতে বিচারাধীন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজির অধ্যাপক সায়েদুর রহমান জানান, অনেক সময় ভেজাল বা নি¤œমানের ওষুধের ক্ষতিকর প্রভাব ধীরে বা দীর্ঘ সময় পরে পড়লে ধরাও যায় না, সেটি ভেজাল ওষুধের কারণে হয়েছে কি না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল রোগী নয়, অনেক সময় চিকিৎসকদের পক্ষেও বোঝা সম্ভব হয় না, কোনটি ভেজাল ওষুধ!

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে বছরে উৎপাদন হয় ২৫ হাজার রকমের ওষুধ। এর মধ্যে মাত্র ৪ হাজার ওষুধ পরীক্ষা করে দেখার সামর্থ্য আছে সরকারের। এর ২ থেকে ৩ শতাংশ ওষুধ ভেজাল, নকল বা নিম্নমানের। বাকি ২১ হাজার ওষুধের আদৌ কোনো পরীক্ষা-ই করা হয় না। বাংলাদেশে ওষুধশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে মোট উৎপাদিত ওষুধের অন্তত ২ শতাংশ অর্থাৎ প্রতি বছর ৩০০ কোটি টাকার বেশি পরিমাণ অর্থের ভেজাল, নকল এবং নি¤œমানের ওষুধ তৈরি হয়। এই হিসাবটি দিলেও ওষুধ কোম্পানির মালিকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ ঔষধশিল্প সমিতি’র সাধারণ সম্পাদক এসএম সাফিউজ্জামান বলছেন, যারা ভেজাল ওষুধ বানান, তাদের অধিকাংশই সমিতির সদস্য নয়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ভেজাল বন্ধে সচেতন না হলে সাধারণ মানুষ হয়তো আবারও আমদানি করা ওষুধের ওপর নির্ভর করতে শুরু করবেন। তাতে দেশের ১৬ হাজার কোটি টাকার ওষুধের বাজার ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বে। সে জন্য সরকারের উচিত, অবিলম্বে ভেজাল ওষুধ উৎপাদন ও বিপণনে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কালবিলম্ব না করে সংশ্লিষ্ট সব মহল এ ব্যাপারে তৎপর হবেÑ সেটাই প্রত্যাশা...!

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

"