বিশ্লেষণ

বাজেট বনাম ভোক্তাদের প্রত্যাশা

প্রকাশ : ১৭ জুন ২০১৯, ০০:০০

এস এম নাজের হোসাইন

এনবিআরের আয় হচ্ছে আমদানি শুল্ক, আয়কর, ভ্যাট, মূসক। আমাদানি পণ্যের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ট্যাক্স ভোক্তাদের ঘাড়েই পড়ে, একইভাবে ভ্যাটের জোগান সাধারণ ভোক্তারাই দিয়ে থাকেন। যদিও ব্যবসায়ীরা বলে থাকেন তারা ভ্যাট দিয়ে জাতীয় অর্থনীতি বেগবান রাখছেন। আমরা প্রায়ই দেখি বাজেটে বিভিন্ন পণ্যের শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাব করা হলেও বাজেট ঘোষণার পর দিন থেকেই বেশকিছু পণ্যের দাম বেড়ে যায়। বাজেটে ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন গ্রুপের জন্য বিভিন্ন ধরনের নগদ সহায়তা ও ভুর্তকি, শুল্ক হ্রাসসহ প্রণোদনার প্রস্তাব করা হলেও সাধারণ ভোক্তাদের জন্য কোনো প্রণোদনা রাখা হয় না। সবক’টি অর্থমন্ত্রীর বাজেটে বাজেট (আয়) ঘাটতি মেটানোর জন্য সাধারণ জনগণের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের পরিধি বাড়ানো হলে তাতে সাধারণ জনগণের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ব্যাংক হিসাবের ওপর উৎসে কর ও আবগারি শুল্ক আরোপ থাকায় সাধারণ মানুষ ব্যাংকবিমুখ হবে এবং বৈধপথে রেমিট্যান্স ও আর্থিক লেনদেনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ঢালাওভাবে সম্পূরক শুল্ক আরোপ বহাল থাকলে দেশীয় শিল্প সুরক্ষা কমার আশঙ্কা এবং যেসব পণ্য দেশে উৎপাদিত হয় না এবং যেসব শিল্প উৎপাদনে দেশীয় দক্ষতা অর্জিত হয়নি, তাদের সুরক্ষা দিতে সম্পূরক শুল্ক আরোপ ভোক্তা স্বার্থপরিপন্থি। অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর জন্য অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের সুষ্ঠু বিচার না করে তাদের জন্য বিশাল বরাদ্দ রাখা জনগণের করের টাকার অস্বচ্ছ ব্যবহার বলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে সুশাসন যে রকম প্রতিষ্ঠা জরুরি তেমনি ব্যাংকগুলোতে আমানতকারী ও ভোক্তাদের সত্যিকারের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হওয়া আবশ্যক।

বিশাল আকারের ঘাটতি বাজেট হওয়ায় বাজেটে অর্থ সংস্থানে সরকারের বিপুল পরিমাণ ব্যাংকঋণ গ্রহণ ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অধিকন্তু বাজেটে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর বিশেষ করে উৎসে কর কর্তন, সম্পূরক শুল্ক, মূসক, আবগারি শুল্ক এর পরিধি না বাড়িয়ে এবং সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও টিসিবিকে কার্যকর করার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা দরকার। ভোক্তাদের জন্য শিক্ষা ও সচেতনতামূলক খাতে বরাদ্দ বৃদ্দি, বাজেট ঘোষণার পর পরই সম্পূরক শুল্ক আদায় শুরু হওয়া, কৃষি, শিক্ষা, জ্বালানি খাতে ভুর্তকি হ্রাস, এনর্জি সেভিং বাল্ব, গ্যাস সিলিন্ডার, গণপরিবহন, আয়করের সীমা ৪ দশমিক ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো, কালো টাকা সাদা করার সুবিধা বহাল এবং ব্যবসায়ীদের জন্য বিভিন্নভাবে নগদ সহায়তা, প্রণোদনা, ভুর্তকি প্রদান ও প্রচুর শুল্ক হ্রাসের বিষয়টি বাজেট ভোক্তাবান্ধব না হয়ে ব্যবসায়ীবান্ধব হতে পারে। বিভিন্ন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের অতিমাত্রায় বিজ্ঞাপন ও মার্কেটিং পলিসির কারণে ভোক্তারা প্রতিনিয়তই পণ্য ও সেবা ক্রয়ে ঠকছেন। কারণ ভোক্তা হিসেবে শিক্ষা ও সচেতনতার অভাব। বাজেটে ব্যবসায়ীদের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধার বিধান রাখা হয় তার অন্তত কিছুটা হলেও ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প-কলকারখানায় নিয়োজিত শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের সাধারণ ভোক্তারা যেন পান সে বিষয়ে দিক নির্দেশনা দরকার। অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি রোধে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্তদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বৃদ্ধি, টিসিবিকে শক্তিশালী ও জোরদার করার বিষয়টি বরাবরের মতো উপেক্ষিত থাকা, কৃষি উৎপাদন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত, স্বাস্থ্য খাতে সুবিধা বাড়ানো, শহরের নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য আবাসন সুবিধা, রেল ও গণপরিবহন খাতে আরো অধিক বরাদ্দ বাড়ানো দরকার।

বাজেটে প্রতি বছর কালো টাকা সাদা করার বিধান রাখার প্রক্রিায়াকে নেতিবাচক। এ কারণে স্বাভাবিক কর আদায় প্রক্রিয়া শ্লথ হয়; যা অসাধু ব্যবসায়ী ও কর ফাঁকিবাজদের আরো অপকর্মে উৎসাহিত করবে। এছাড়াও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর মূল্য সংযোজন করের আওতা বৃদ্ধিকে হতাশাজনক। কারণ ব্যবসায়ীরা সব সময় ভোক্তাদের থেকে ভ্যাটের টাকা আদায় করে যথাযথভাবে পরিশোধ করেন না বরং মূসকের টাকা ভোক্তাদের থেকে আদায় করে রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে নিজেদের পকেট ভারী করেন। পরোক্ষ কর হিসাবে ভ্যাট-ট্যাক্স যা-ই ধরা হবে সব গিয়ে পড়বে ভোক্তার পকেটে। আর কর ফাঁকিবাজ ব্যবসায়ীরা কর বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে নিজেদের পোয়াবারো হবে। অন্যদিকে চট্টগ্রামকে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, বাণিজ্যিক রাজধানী ও অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বলা হলেও বাজেটে চট্টগ্রামের জন্য বিশেষ বরাদ্দ থাকে না। চট্টগ্রামে গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিতরণ লাইনে সংকটের কারণে শিল্প, ব্যবসা বাণিজ্য ও গৃহস্থালির স্বাভাবিক কার্যক্রম ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাধাগ্রস্ত হলেও কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানির জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকা, ঢাকা-চট্টগ্রাম মেট্রো চালু ও রেললাইনের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা হলে জাতীয় অর্থনীতি এবং শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে। এদিকে দেশে চলমান বিদ্যুৎ সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত ভোগান্তি যখন চরমে তখন প্রস্তাবিত বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত, সোলার প্যানেল, এনার্জি সেভিং বাল্ব এ বরাদ্দ বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে আরো ভুর্তকি বাড়ানোর দরকার। জ্বালানি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলে সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন ত্বরান্বিত হবে এবং দেশে শিল্পায়ন জোরদার হবে। অন্যদিকে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন বর্তমান হার বৃদ্দি এবং এ ভাতার পরিমাণ ও গ্রহীতার হার বৃদ্ধি এবং এর বিতরণ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও যথাযথ সামাজিক পরীবিক্ষণ ও মনিটরিং জোরদার করতে হবে। একইসঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতা বাড়ানো, সামাজিক বনায়ন, উপকূলীয় বাঁধ, গ্রামীণ রাস্তা ও সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য খাদ্য সহায়তার মতো ব্যাপক কর্মসংস্থানমূলক প্রকল্পে আরো বরাদ্দ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে বলা হয় কৃষি উৎপাদনের জন্য ডিজেল ভুর্তকি প্রদান করা হলেও সার ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি কৃষি উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে।

প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কৃষি ও চাষযোগ্য আবাদি জমি হ্রাসের নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশনা থাকলে আগামীতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্দি পাবে। কৃষি সার ও বীজ বিপণনে বিএডিসিকে সচল না করার কারণে দেশি-বিদেশি বহুজাতিক ব্যবসায়ীদের হাতে সার ও বীজ বিপণনের প্রক্রিয়াটি তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় কৃষি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে কিনা সন্দেহ। প্রকৃত কৃষক ও উৎপাদনকারীর যথাযথ মূল্যপ্রাপ্তি নিশ্চিতকল্পে সরকারের উদ্যোগে প্রত্যন্ত অঞ্চলে শস্য গুদাম ও হিমাগার স্থাপন করা, সরকারি উদ্যোগে কৃষিপণ্য ক্রয়ের এবং বিপণন খাতে সমবায় জোরদার করা দরকার, কৃষিঋণ বিতরণে গুটিকয়েক ব্যাংক ও দুই-একটি এনজিওকে দায়িত্ব প্রদান না করে এর সংখ্যা বৃদ্ধি, এসএমই ঋণ, বর্গাচাষি ঋণ ও মহিলাদের জন্য এসএমই ঋণ বিতরণের প্রক্রিয়া আরো সহজতর করা ও আরো বেশি সংখ্যক সংস্থার ওপর দায়িত্ব প্রদান ও এর পরিধি বাড়ানো দরকার। বাজেটে বিভিন্ন উৎসে কর বিশেষ করে শুল্ক ও ভ্যাটের পরিধি বাড়ানো সঠিক হবে না, কারণ এসব ভ্যাট, ট্যাক্সগুলো শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ঘাড়ে গিয়ে পড়ে এবং জনজীবনে ভোগান্তি বাড়ায়। ব্যবসায়ীরা এটিকে জনগণের পকেট কাটার নতুন অস্ত্র হিসেবে নিয়ে থাকে।

সরকারি উদ্যোগে ওএমএসের পরিধি আরো বাড়ানো, সাধারণ মানুষের খাদ্যের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য চালের ওপর ভুর্তকি প্রত্যাহার না করে এটি আরো অব্যাহত রাখা দরকার। ১০ টাকার ফেয়ার প্রাইসকার্ড যুগান্তকারী হলেও মাঠ পর্যায়ে নিয়মশৃঙ্খলার গাফিলতির কারণে এটি ব্যর্থ হলেও এটি চালু রাখা ও পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন। একইসঙ্গে বাজেটের সুপারিশ অনুযায়ী ভোজ্যতেল, দুধ, ডাল, শিশুখাদ্যসহ যেসব খাতে শুল্ক ও কর প্রত্যাহার করা হয়, সেসব খাতের সুফল যেন সাধারণ জনগণ পায় সেজন্য যথাযথ মনিটরিং করা এবং ব্যবসায়ী ও ভোক্তা স্বার্থসংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী কর্তৃপক্ষে ভোক্তাদের সত্যিকারের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়াও জরুরিভাবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে শক্তিশালীকরণ ও দ্রুত বিভাগীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণ, জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরের জন্য পর্যাপ্ত লোকবল, লজিস্টিক সুবিধা বৃদ্ধি, তৃণমূল পর্যায়ে ভোক্তা অধিকার ও শিক্ষা বিষয়ে কর্মসূচি পরিচালনায় বরাদ্দ সংস্থান, ব্যবসায়ী সংগঠনের পাশাপাশি ভোক্তা সংগঠনগুলোকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান, খাদ্য ও পণ্য পরীক্ষায় বিএসটিআইয়ের আরো সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন, টিসিবিকে পেশাদার এবং দক্ষ লোকবল ও তহবিল দিয়ে একটি আপদকালীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যকর করা, বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১-কে আধুনিকায়ন ও কার্যকর করা, প্রতিযোগিতা কমিশনকে দ্রুত বিভাগীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণ কার্যকর করা দরকার। এছাড়াও নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের মূল্য সহনীয় ও স্থিতিশীল রাখা সরকারের একটি অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার হলেও এ অঙ্গীকার পূরণে সরকারের রাজনৈতিক দৃশ্যমান উদ্যোগ প্রয়োজন। এছাড়াও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যেহেতু শুধুমাত্র ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সুরক্ষা করে থাকে, সে কারণে দেশের সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে পৃথকভাবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার করা হলে দেশীয় ভোক্তারা অনেক বেশি উপকৃত হতে পারেন। আশা করি, সরকার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবে।

লেখক : ভাইস প্রেসিডেন্ট

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

[email protected]

 

"