মুক্তমত

পাটের বহুমুখীকরণ আজ সময়ের দাবি

প্রকাশ : ১৫ জুন ২০১৯, ০০:০০

আবু আফজাল সালেহ

একসময় পাট ছিল আমাদের একমাত্র রফতানি পণ্য। কিন্তু বিদেশি চক্রান্ত, সুদক্ষ পরিচালনা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে প্রায় মরে গেছে এ শিল্প। বর্তমান সরকার এ খাতকে গতি সঞ্চার করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। যার ফলও আমরা হাতেনাতে পাচ্ছি।

সম্প্রতি পাটের উৎপাদন বাড়ছে। উন্নতির গ্রাফচিত্র আমরা তুলে ধরতে পারি। ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে পাটের উৎপাদন ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে পাটের উৎপাদন ছিল ৫১ লাখ টন। সর্বশেষ অর্থবছরে পাটের উৎপাদন হয়েছে ৯২ লাখ টন। এতে দেখা যাচ্ছে, প্রতি বছর পাটের উৎপান বাড়ছে। পাটের রফতানিও বেড়েছে। যেমন ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পাট রফতানি হয়েছে ৪১ কোটি ৪৬ লাখ ডলার। আগের বছর একই সময়ের চেয়ে ২৬ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৪ সালে দেশের পাটের উৎপাদন ছিল ৬৫ লাখ বেল, ২০১৫ সালে ৭০ লাখ বেল, ২০১৬ সালে ৮৫ লাখ বেল এবং ২০১৭ সালে ছিল ৯২ লাখ বেল। কৃষিজমির হ্রাস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রয়োজনে ‘পাট চাষ জোন’ গড়ে তোলা যেতে পারে। পাটপণ্যের পাশাপাশি হরেক, বাহারি, নিত্যব্যবহার্য, ফ্যাশনেবল বহুমুখী পাটসামগ্রীর প্রসার ও বিপণন এ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন গতি সঞ্চার করেছে। বাংলাদেশে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯১ দশমিক ৯৯ লাখ বেল কাঁচাপাট উৎপাদন হয়েছে। কাঁচাপাট রফতানি হয়েছে ১৩ দশমিক ৭৯ লাখ টন। পাট রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। এ খাতে রফতানি আয় ১ হাজার ২৯৪ দশমিক ৬৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশ বিশ্বের মোট পাটের ৩৩ শতাংশ উৎপাদন করে এবং কাঁচাপাটের প্রায় ৯০ শতাংশই রফতানি করে।

আমাদের ব্যবহারিক জীবনে পাটের গুরুত্ব অপরিসীম। এই পাট থেকে উৎপাদিত পণ্য যেমন বস্ত্র, থলে, দড়ি, কাছি, সূক্ষ্ম বস্ত্র ও কার্পেট আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে প্রতিনিয়ত ব্যবহার হয়ে থাকে। এই বাংলাদেশের পাট থেকে তৈরি ‘জুটন’ পৃথিবীর নানা দেশে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে। আমাদের পাটকলের তৈরি কার্পেট পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে এখনো বিশেষভাবে সমাদৃত। এ ছাড়া পাটের তৈরি ঝুড়ি, শিকে এবং কারুকাজ শোভিত অন্যান্য দ্রব্য বিদেশিদের শুধু দৃষ্টি কাড়ছে। এগুলো রফতানি করে বাংলাদেশ এখনো যথেষ্ট পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। বাজারে পাটের তৈরি চালের বস্তা ও সুতলি থেকে গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় প্রায় ১০০ কোটি টাকার বহুমুখী পাটপণ্যের বাজার সৃষ্টি হয়েছে। পাটপণ্যের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের নান্দনিক ব্যাগ, সেমিনার ফাইল ও প্রমোশনাল পণ্য, নানা ধরনের গৃহস্থালি, বাহারি সাজসজ্জায় ব্যবহৃত পণ্যসামগ্রী অন্যতম। বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা থাকলেও ধারাবাহিকভাবে বছরে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বহুমুখী পাটপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে গত বছর প্রায় ৭০০ কোটি টাকার বহুমুখী পাটপণ্য রফতানি হয়েছে।

করতে হবে পাটের বহুমুখীকরণ। পাটের বহুমুখীকরণ যত বাড়ানো যাবে, ততই পাটের অর্থনীতিতে অবদান বাড়বে। শুধু পাটেই নয় যেকোনো পণ্যের ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য। আমরা যতই আধুনিক হচ্ছি ততই রুচিবোধে ভেরিয়েশন আসছে। আর এ কারণেই বহুমুখীকরণ ছাড়া অন্য উপায় কম ফলপ্রসূ হবে। মানুষের রুচির ব্যাপক পরিবর্তন হচ্ছে এবং তা অতি দ্রুততার সঙ্গে পরিবর্তন হচ্ছে। খাপখাওয়াতে তাই পাটের বহুমুখীকরণে সুষ্ঠু পরিকল্পনা দরকার।

পাটের মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন-২০১০ ও বিধিমালা-২০১৩ আছে। কিন্তু মোড়কজাতের বাইরেও পাটের অন্যান্য বিষয়েও আইন করা দরকার। বিপণন, বীজ, সংরক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত রূপরেখা আইনে সংযোজন করা যেতে পারে। পলিথিন উৎপাদন, বিপণন, ব্যবহার বন্ধ ও পাটপণ্যের মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের লক্ষ্যে চাহিদা অনুযায়ী গুণগত মানস¤পন্ন পণ্য উৎপাদন এবং এর প্রচার বাড়াতে হবে। মানসম্মত পাট উৎপাদন, পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, পাটপণ্যের বহুমুখীকরণ, পাটকলের আধুনিকায়ন, পাটপণ্যের বাজার সম্প্রসারণÑ এই পাঁচটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে ‘জাতীয় পাটনীতি-২০১৮’-এর খসড়ার অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। পাটের গুরুত্বের বিষয়টি প্রকাশের জন্য সরকারে যে আন্তরিকতা তা প্রশ্নাতীত। কারণ বর্তমান সরকারের উদ্যোগে ২০১৭ সালেই সর্বপ্রথম ৬ মার্চকে জাতীয় পাট দিবস হিসেবে পালন করা হয়। প্রতিবারই নতুন সেøাগান নিয়ে সরকার প্রচার ও প্রসার বাড়াতে সচেষ্ট। তাই দেশ-বিদেশে পাটের বাজার পুনরুজ্জীবিত করতে ‘জুট পাল্প পেপার অ্যাক্ট’ এবং ‘পাট আইন’ প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি।

পাটের কম দাম পান প্রান্তিক কৃষকরা। কৃষকের চেয়ে মধ্যস্বত্বভোগীরা বেশি লাভবান হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিনা পুঁজিতে কৃষকের মাথায় ব্যবসা করে থাকে। তাদের কোনো লোকসানের ভয় নেই, কিন্তু কৃষকের লোকসানের আশঙ্কা থাকে। তারা আবার সিন্ডিকেটও তৈরি করে থাকে। কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি পাট ক্রয়ের ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। এসব নেতিবাচক দিকগুলো শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এতে কৃষকরা লাভবান হবেন এবং পাট চাষে ঝুঁকবেন।

পাটসংশ্লিষ্ট কুটির শিল্পের জোরদারকরণ প্রকল্প হাতে নিতে হবে। দক্ষ জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। তা হলে বহুমুখীকরণে তাড়াতাড়ি ফল পাব আমরা। তাদেরও বারবার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ থেকে দক্ষতর জনবল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তা হলে বৈচিত্র্য আনতে পারব। সরকারের নতুন নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দ্রুত খাপখাওয়াতে পারবেন তারা। পাট ও পাটসামগ্রী বিপণনে হাট-বাজার সম্প্রসারণ করতে হবে, গুদাম মেরামত বা নতুন তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য সংশ্লিষ্টদের মাঝে ব্যংকগুলোকে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থাকরণের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

সোনালি ব্যাগের প্রসারের ব্যবস্থা করতে হবে। ক্ষতিকারক পলিথিনের ব্যবহার কমিয়ে এতে আকৃষ্ট করতে হবে। প্রয়োজনে প্রথমদিকে সোনালি ব্যাগের উন্নয়ন বা ব্যবহারে ভর্তুকির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আমদানি করা পচনশীল পলিমার ব্যাগের যে দাম তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ দামেই পাওয়া যাবে সোনালি ব্যাগ। বর্তমানে এক কেজি পলিথিন তৈরি করতে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা খরচ হয়। এর চেয়ে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশিতেই পাওয়া যাবে প্রতি কেজি সোনালি ব্যাগ। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলে দাম আরো কমবে। ব্যাগটির দাম কমিয়ে দেবে মূলত এর বিভিন্ন বাই-প্রডাক্ট (উপজাত)। এর গুরুত্বপূর্ণ দুটি বাই-প্রডাক্ট হলো লিগনিন ও হেমোসেলুলোজ। বিভিন্ন ধরনের কসমেটিক সামগ্রী তৈরিতে ব্যবহার করা হয় লিগনিন। এটি ভালো দামে বিক্রি হবে। আর হেমোসেলুলোজ সার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পাটের যে আঁশ এই ব্যাগ তৈরিতে ব্যবহার করা হয় তার মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ উচ্ছিষ্টাংশ হিসেবে বেরিয়ে আসবে। বাকি ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশই হবে কোনো না কোনো প্রডাক্ট। পাট একটি পরিবেশবান্ধব পণ্য। পরিবেশ বিনাশী পলিথিন এমন একটি রাসায়নিক বস্তু যা পচনশীল নয়। এটি পোড়ালেও দুর্গন্ধযুক্ত ধোঁয়া বের হয়ে পরিবেশ নষ্ট করে দেয়। এটি যেখানে পড়ে থাকে সেখানে থেকেই কৃষি ফসলের জমিতে মাটির রস চলাচলে বাধার সৃষ্টি করে। বিভিন্ন খাল-বিল, নদী-নালা, ড্রেন, নর্দমা সব জায়গায় পরিত্যক্ত পলিথিন জমে জমে পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়ে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে থাকে। সেজন্যই পলিথিনের বিকল্প হিসেবে শুধু বাংলাদেশে নয়, আমাদের প্রতিবেশী ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশে ক্যারিয়িং ব্যাগ হিসেবে পাটের তৈরি ব্যাগ অনায়াসে ব্যবহার করা হচ্ছে।

পাটের কোনো কিছুই ফেলনা নয়। ছোট-বড় সব ধরনের পাটগাছ থেকে পাতা নিয়ে পুষ্টিকর পাটশাক খাওয়া যায়। এ পাটশাক শুকনো হিসেবেও দীর্ঘদিন ঘরে সংরক্ষণ করে খাওয়ার সুযোগ থাকে। পাটের পুরো মৌসুমে জমির মধ্যে যে পাতা পড়ে, তা উক্ত জমির জৈব পদার্থ যোগে উর্বরতা বাড়াতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। পাটের শিকড়, গাছ, পাতা থেকে সার যোগ হলে পরবর্তী ফসল আবাদে ওই জমিতে আর কোনো বাড়তি সার প্রয়োগের প্রয়োজন পড়ে না। জনগণের মধ্যে দেশীয় পণ্যের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টিতে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া। সর্বনাশা পলিথিনের ব্যবহার স¤পূর্ণরূপে বন্ধ করে সুলভ ও আকর্ষণীয় পাটপণ্য তৈরি করার প্রতি জোর দিতে হবে। এজন্য শ্রম ব্যবস্থাপনায় আধুনিক ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষকতা, শ্রমিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অধিক মনোযোগ দিতে হবে। পাটশিল্পে দক্ষ কর্মী সৃষ্টিতে অধিক ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট স্থাপন করা দরকার।

পাট একটি পরিবেশবান্ধব বস্তু। এজন্য সরকার ২০১০ সালে পাটজাত মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে। বর্তমানে মোট ১৭টি পণ্যে পাটজাত মোড়ক ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে পাটপণ্যের চাহিদা প্রায় ৭ দশমিক ৫০ লাখ টন এবং এর মধ্যে যা বাংলাদেশ রফতানি করে ৪ দশমিক ৬০ লাখ টন। যা প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকেও বেশি। পাট থেকে উন্নত মানের ভিসকস সুতা উৎপাদন হয়। যার সুতি কাপড় থেকে বাজারমূল্য বেশি। পাটখড়ি জ্বালানির প্রধান উৎস হলে কয়েক বছর ধরে পাটখড়ির চারকোল বিদেশে রফতানি হচ্ছে আয় হচ্ছে হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে পাট থেকে তৈরি হচ্ছে চা। এতে জীবন রক্ষাকারী উপাদান আছে। প্রচলিত ব্যবহারের পাশাপাশি বহুমুখী ব্যবহারের ফলে পুনরুদ্ধার হচ্ছে রফতানি বাজার। দেশব্যাপী পাটের আবাদ, উৎপাদন ও দাম বেড়েছে। দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার পাটের চট বা জিও টেক্সটাইলের অভ্যন্তরীণ বাজার তৈরি হয়েছে।

ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে পলিথিন বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক জিনিসপত্র ব্যবহারে অনুৎসাহিত করে ইতিবাচক জনমত গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি-মিডিয়া-বেসরকারি সেক্টর সবাইকে আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। তা হলে আমরা ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারব।

লেখক : কবি ও কলামিস্ট

abuafzalsaleh@gmail.com

 

"