মুক্তমত

নয়া প্রযুক্তির ধারায় ডিজিটাল চলচ্চিত্র

প্রকাশ : ১৪ জুন ২০১৯, ০০:০০

সৌমিত্র দেব

গণযোগাযোগের ধারায় বিকাশমান একটি শিল্প হলো ডিজিটাল চলচ্চিত্র। নয়া প্রযুক্তিকে ধারণ করেই এর অগ্রযাত্রা। এখানে আছে সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত। দেশ কাল পাত্র সব কিছু ছাপিয়ে যেতে পারে এই মাধ্যম। এ বিষয়ে আলোচনার আগে জানতে হবে চলচ্চিত্র সম্পর্কে। উইকিপিডিয়ার তথ্যে বলা হয়েছে, ‘চলচ্চিত্র এক ধরনের দৃশ্যমান বিনোদন মাধ্যম। চলমান চিত্র তথা ‘মোশন পিকচার’ থেকে চলচ্চিত্র শব্দটি এসেছে। এটি একটি বিশেষ শিল্প মাধ্যম। বাস্তব জগতের চলমান ছবি ক্যামেরার মাধ্যমে ধারণ করে বা এনিমেশনের মাধ্যমে কাল্পনিক জগৎ তৈরি করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। চলচ্চিত্রের ধারণা অনেক পরে এসেছে, ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে। আর এনিমেশন চিত্রের ধারণা এসেছে আরো পরে। বাংলায় চলচ্চিত্রের প্রতিশব্দ হিসেবে ছায়াছবি, সিনেমা, মুভি বা ফিল্ম শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়।

চলচ্চিত্রের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহ। যে সংস্কৃতিতে তা নির্মিত হয় তাকেই প্রতিনিধিত্ব করে চলচ্চিত্রটি। শিল্পকলার প্রভাবশালী মাধ্যম, শক্তিশালী বিনোদন মাধ্যম এবং শিক্ষার অন্যতম সেরা উপকরণ হিসেবে খ্যাতি রয়েছে চলচ্চিত্রের। ছায়াছবির সঙ্গে ভিজ্যুয়াল বিশ্বের সমন্বয় থাকায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে সবচেয়ে ভালো যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। অন্য কোনো শিল্প মাধ্যম সাধারণের সঙ্গে এতটা যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম নয়। অন্য ভাষার চলচ্চিত্রের ডাবিং বা সাব-টাইটেল করার মাধ্যমে নিজ ভাষায় নিয়ে আসার প্রচলন রয়েছে।

প্রথাগতভাবে চলচ্চিত্র নির্মিত হয় অনেকগুলো একক ছবি তথা ফ্রেমের ধারাবাহিক সমন্বয়ের মাধ্যমে। এই স্থিরচিত্রগুলো যখন খুব দ্রুত দেখানো হয় তখন দর্শক মনে করেন তিনি চলমান কিছু দেখছেন। প্রতিটি ছবির মাঝে যে বিরতি তা একটি বিশেষ কারণে দর্শকের চোখে ধরা পড়ে না। ধরা না পড়ার এ বিষয়টাকে দৃষ্টির স্থায়িত্ব বলে। সহজ কথা বলা যায়, ছবির উৎস সরিয়ে ফেলার পরও এক সেকেন্ডের ১০ ভাগের ১ ভাগ সময় ধরে দর্শকের মনে তার রেশ থেকে যায়। এভাবে চলমান ছবির ধারণা লাভের বিষয়টাকে মনোবিজ্ঞানে বিটা চলন নামে আখ্যায়িত করা হয়।’

এভাবে নানা কথায় সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে চলচ্চিত্রকে। তবে বাংলাদেশের খ্যাতনামা চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদ মনে করেন চলচ্চিত্রের সংজ্ঞা বারবার বদলেছে। তিনি বলেন, ‘চলচ্চিত্রের একাডেমিক অঙ্গনে সিনেমা শব্দের পরিবর্তে ‘মুভিং ইমেজ’ শব্দটি প্রবর্তনের জোরালো তাত্ত্বিক আওয়াজ তোলা হচ্ছে আজকাল। চলচ্চিত্রের বৃহত্তর সংজ্ঞা কি খুবই দরকার হয়ে পড়েছে? লক্ষ করার বিষয়, মুভিং ইমেজ শব্দটি বাংলা ‘চলচ্চিত্র’ শব্দের আক্ষরিক অর্থের অনেক কাছাকাছি।

সিনেমা বা চলচ্চিত্র সব সময়ই প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিত্যনতুন উদ্ভাবন। এটা সত্য, নির্বাক যুগের বাঙময় ছবিতে আমরা ‘শিশিরের শব্দ’ শুনতে পেতাম আর আজকের ছবি সারাক্ষণ বকবক করে। তাই বলে, এতকাল পরে মাধ্যমটির কণ্ঠরোধ করা বোধহয় ঠিক হবে না। বহুকাল সাদা-কালোর আলো-ছায়া ছিল চলচ্চিত্রের মূল বিশেষত্ব। তাতে রং লাগলে ‘সর্বনাশ’ হয়ে যাবে বলে তখনকার ডাকসাইটে নির্মাতারাও আশঙ্কা করেছিলেন। সত্যজিত রায়ের অশনিসংকেত বা মৃণাল সেনের আকালের সন্ধানে দেখলে বোঝা যায়Ñ দুর্ভিক্ষেরও রং আছে। চলচ্চিত্রের ফরম্যাট নিয়েও অন্ধ হতে রাজি নন অনেক নির্মাতা। এ ব্যাপারেও তারেক বলেছেন, ৩৫ মিলিমিটারের সঙ্গে ১৬ মিলিমিটারের পার্থক্য মূলত মাত্র ১৯ মিলিমিটারÑ একথা মানতে অনেক চলচ্চিত্র পন্ডিতই প্রস্তুত ছিলেন না। কিন্তু বাস্তবতা হলো ষাট-সত্তর এমনকি আশির দশকের প্রথম সারির অনেক নির্মাতাই তাদের মাস্টারপিস তৈরি করেছেন ১৬ মিলিমিটার ফরম্যাটে। বাংলাদেশেও তার উদাহরণ রয়েছেÑ তানভীর মোকাম্মেলের চিত্রা নদীর পাড়ে (১৯৯৯) ও মোরশেদুল ইসলামের চাকা (১৯৯৩)।

তা হলে এবার আমরা ডিজিটাল চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলি। ডিজিটাল বাংলাদেশ তত্ত্ব যেমন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের সুফলকে মানুষের দোরগড়ায় পৌঁছে দিতে চায়, ডিজিটাল চলচ্চিত্রও তেমনি প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে খুব সহজে দর্শকের কাছে পৌঁছাতে চায়। ডিজিটাল চলচ্চিত্র ব্যয় কমিয়েছে। সহজে পরিবহনযোগ্য হয়েছে। তারেক মাসুদের মতে, ‘আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ডিজিটাল চলচ্চিত্র এখন আর তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়। ভবিষ্যতের ব্যাপারও নয়। এটি ইতোমধ্যে একটি বাস্তবতা। বিখ্যাত-অখ্যাত, প্রবীণ-নবীন, বড় বাজেট-ছোট বাজেট, উন্নত দেশ, অনুন্নত দেশ, কাহিনিচিত্র-প্রামাণ্যচিত্র নির্বিশেষে নির্মিত হচ্ছে ডিজিটাল ফিল্ম। বিচিত্র কারণে নির্মাতারা ঝুঁকছেন এ ফরম্যাটটির দিকে। অভিন্ন কয়েকটি কারণ অবশ্য ধারণা করা যায়, যা ফরম্যাটটিকে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। নির্মাতার স্বাধীনতা, কারিগরি সুযোগ-সুবিধা, আর্থিক সাশ্রয় ও সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ তাদের অন্যতম। তবে সৃজনশীলতার সুবিধার দিকটিই হয়তো প্রধান কারণ। যা ভিম ভেন্ডারস, কিয়েরোস্তামি, ‘ডগমা’ ধারার নির্মাতা থেকে শুরু করে মাইকেল মুর, হলিউড ব্লকবাস্টার ওপেন ওয়াটারের (২০০৩) পরিচালকÑ সবাইকে একত্র করেছে।

২০০০ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে ডিজিটাল চলচ্চিত্রবিষয়ক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অনেক বিখ্যাত নির্মাতার সঙ্গে আব্বাস কিয়েরোস্তামি ও সামিরা মাখমালবাফ অংশগ্রহণ করেন। ওই সেমিনারের জন্য সামিরার লেখা নিবন্ধের কিছু অংশের অনুবাদ এখানে তুলে ধরছিÑ ‘ঐতিহাসিকভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণের সৃজনশীল প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক, আর্থিক ও কারিগরিÑ এ তিনটি নিয়ামক শক্তি নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে।... চাকাকে যদি বলা যায়, মানুষের পায়ের গতি সঞ্চালন, তা হলে নির্মাতার জন্য ক্যামেরা তার চোখের সম্প্রসারণ। গত শতাব্দীতে ব্যবহৃত ক্যামেরার অতিরিক্ত ওজনের পাশাপাশি জটিলতার কারণে এটি চালাতে যে পরিমাণ যান্ত্রিক জ্ঞানসম্পন্ন জনবল দরকার হতো, তাতে করে চলচ্চিত্র-নির্মাতার আবেগ ও চিন্তার জন্য এই চোখ আসলে একটা বোঝা ছিল। কিন্তু আজ ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমরা ক্যামেরাকে কল্পনা করতে পারি একজোড়া সরু কাঁচের চশমা কিংবা একজোড়া লেন্সের সঙ্গে, যা চোখের কর্নিয়ায় সংযোজিত হবে অথচ বোঝাই যাবে না।

ডিজিটাল বিপ্লবকে আমি কারিগরি জ্ঞানের সর্বশেষ অর্জন হিসেবে দেখি। তবে এই বিপ্লব সিনেমার বিরুদ্ধে নয়, বরং সিনেমা-ইন্ডাস্ট্রির কিছু পেশাদারি কাঠামো ও চরিত্রের বিরুদ্ধে। ডিজিটাল সিনেমার কারণে আমরা চলচ্চিত্রের কেন্দ্রবিন্দুÑ চিত্রনাট্য, দৃশ্যায়ন, সৃজনশীল সম্পাদনা, অভিনয়সহ কোনো কিছুই হারাব না। ডিজিটাল ছবি, যা বদলে দেবে, তা হলো চিত্রগ্রহণের ধরন, আলোর আয়োজন, পোস্ট-প্রডাকশন ল্যাবের কাজ ইত্যাদি। চলচ্চিত্র উৎপাদন যন্ত্রের এ কারিগরি বিপ্লরের ফলে ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে হয়তো চলচ্চিত্রের মৃত্যু হবে, তবে এই বিপ্লবই চলচ্চিত্রকে সৃজনশীল শিল্প হিসেবে বাঁচিয়ে রাখবে।

লেখক : কবি, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রাভিনেতা

mansoumit@yahoo.com

 

"