পর্যালোচনা

সাদাসিধে সারেঙ্গির মন্ত্রিত্ব লাভ

প্রকাশ : ১৪ জুন ২০১৯, ০০:০০

বিশ্বজিত রায়

ভারতের লোকসভা সদস্য নির্বাচিত অতঃপর মন্ত্রিত্বের সাধ পাওয়া প্রতাপ চন্দ্র সারেঙ্গিকে নিয়ে সরগরম সোশ্যাল মিডিয়া। মোদি সরকারের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, পশুপালন, ডেইরি, মৎস্য দফতরের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া সারেঙ্গির সাদাসিধে জীবনবোধ মানুষের মন জয় করেছে। পোশাক-পরিচ্ছদ ও চালচলনে অতিসাধারণ এবং হালকা গড়ন গোঁফ-দাড়িতে অবিন্যস্ত মানুষটি মন্ত্রী হয়ে সর্বত্র তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। গত ৩০ মে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় শপথ নিয়েছেন ভারতের ওড়িশার বালেশ্বর থেকে নির্বাচিত এই বিজেপি নেতা। মন্ত্রিসভায় যখন সারেঙ্গির নাম ঘোষণা করা হয়, তখন সবচেয়ে বেশি করতালি পড়েছিল অপরিচিত এ ব্যক্তিটির জন্য। কারণ কুঁড়েঘরে থাকা, সাইকেলে করে চলাফেরা করা, এমনকি নির্বাচনী প্রচারে অটোতে চড়ে সাধারণ মানুষের দুয়ারে গিয়ে ভোট চাওয়াটাও নজর কেড়েছে কৌতূহলী মানুষের। মোদির মন্ত্রিপরিষদে উঠে আসা সারেঙ্গির ব্যক্তি পরিচয় ও উষ্কখুষ্ক ছবি ঘুরছে-ফিরছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। আগ্রহের বড় জায়গা দখলে নেওয়া সারেঙ্গির সাধারণ জীবনাচরণ বর্তমান উচ্চাভিলাষী সমাজব্যবস্থায় প্রায় বিরল।

এ কলির কালে নির্লোভ নিঃস্বার্থ নিখাদ নিরহংকারী মানুষ খুঁজে পাওয়া দুর্লভ-দুষ্কর। সমাজ প্রসারিত পৃষ্ঠে যে দু-একজন আছেন, তাও মন্দ মুমূর্ষুতায় পতিত। তাই সুস্থ স্বচ্ছ বোধশক্তির মানুষগুলো নিজেদের আড়াল করে রাখেন সহজ-সরল সাদামাটা জীবনাচরণের আত্মশুদ্ধি ভাঁজে। লোভ-লালসাগ্রস্ত বিলাসী জীবনের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যময় মোহ পরাস্ত করতে পারে না তাদের। এই সমাজ সভ্যতায় টিকে থাকা কল্যাণকর পুণ্যময় আধ্যাত্মিক ভাবনায় বিশ্বাসী অল্পসংখ্যক মানুষ আছেন বলেই এখনো ভরসা মেলে। তাদের অনুসরণ করে এগিয়ে যাওয়া যায় সামনের দিকে। ওদের ভালো মানুষী ক্রিয়াকর্ম সমাজের সর্বস্তরে কিছুটা হলেও রেখাপাত করে। দিয়ে যায় ভালো হওয়ার তাগিদ। জন্ম দেয় বিস্ময় ভাবশক্তির। অবক্ষয়ের অতলে তলিয়ে যাওয়া ভ্রষ্ট বিবেকবোধকে টেনে তুলতে সহায়তা করে। কদাচিৎ উদয়ায়িত এসব মানুষের ভোগবিলাসিতা পরিত্যাজ্য জীবন মানুষকে যতটুকু না শিক্ষা দেয়, তার চেয়ে বেশি অনুকরণীয় হয়ে থাকে এই সমাজ রাষ্ট্রে।

ভারতের মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়া প্রতাপ চন্দ্র সারেঙ্গির কথা বলছি। যাকে পৃথিবীর কোনো সুখকর শক্তিই কাবু করতে পারেনি। চাওয়া-পাওয়ার হিসেবে কখনো জড়াননি নিজেকে। ইহলৌকিক এই সুখ-শান্তি সংসার পরিত্যাগ করে সন্ন্যাস গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের এই মন্ত্রী। জীবন সাধনায় হয়তো আঁচ করতে পেরেছিলেন ঈশ্বর সাধনায়ই সবচেয়ে বড় সাধনা। সেই চিন্তাচেতনা থেকেই গিয়েছিলেন বেলুর মঠে। কিন্তু সেখানে পরিবাজ্যাবৃত্তি আর হয়ে ওঠেনি সারেঙ্গির ভাগ্যে। ফেরত আসতে হয় তাকে। ফিরে এসে সেই স্বাভাবিক জীবনযাপন অর্থাৎ কুঁড়েঘরে বসবাস আর পুরোনো বাইসাইকেল সঙ্গী পোশাক পরিচ্ছদে অগোছালো মানুষটি মন্ত্রিত্বে অভিষিক্ত হয়ে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছেন। ভবঘুরে প্রতাপকে মন্ত্রিত্ব দিয়ে মোদি যতটা না বিস্ময় বিহ্বলতার জন্ম দিয়েছেন, তার চেয়ে বাহবা কুড়ানোর বড় কাজটা করেছেন তাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রার্থিতা দিয়ে। এ ছাড়া ধন্যবাদ পাওয়ার নীরব কাজটি করেছেন ওড়িশার জনগণ। তারা ভোট দিয়েই প্রতাপ সারেঙ্গির মতো এলোমেলো সহায়-সম্বলহীন একজন মানুষকে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছেন। এতে ওড়িশাবাসী প্রমাণ করেছেন তাদের কাছে প্রভাব-প্রতিপত্তি বড় নয়, সত্যিকারের সমাজ সাধককেই তাদের বেশি প্রয়োজন। যা আমাদের বঙ্গ বাস্তবতায় এতটা গুরুত্ববহ নয়।

আমরা কেবল মোহে মত্ত। প্রতাপ সারেঙ্গির মতো অর্থবিত্তহীন সাদাসিধে মানুষকে কি আমরা আমাদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে গ্রহণ করতে পারব? ওড়িশার জনগণের মতো আমরা তেমনটা হতে পারব না। আমাদের বাস্তবতা ভিন্ন। এ দেশের নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে এমন প্রতাপ সারেঙ্গিকে দলের পক্ষ থেকে যেমন প্রার্থী বিবেচনা করা অসম্ভব; তেমনি ভোট বিবেচনায়ও কোনো ভোটার সারেঙ্গি সমতুল্য কাউকে ভোট দিতে সম্মত হবে না। কারণ এখানে অর্থবিত্ত প্রভাব-প্রতিপত্তিই যোগ্যতার মাপকাঠি। অর্থ দিয়ে নির্বাচনের প্রার্থিতা কেনা যায়। আবার অর্থের জোড়ে নির্বাচনী বৈতরণী পারও হওয়া যায়। আমাদের মানসিকতা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রতাপের জায়গা নেই। যদি সারেঙ্গিসম কাউকে প্রার্থী দেওয়া হয়; তা হলে এখানকার জনগণ বলবে, ‘দুরু এইড্যার টেকাটোকা নাই, তারে প্রার্থী দিছে, এইড্যারে কেডায় ভোট দিব।’ অর্থাৎ অর্থ দিয়ে ভোট ও প্রার্থিতা কেনার বাংলাদেশি বাস্তবতা ওড়িশায় নেই। আর নেই বলেই প্রতাপ সারেঙ্গির মতো মানুষ লোকসভা সদস্য হয়, আবার মন্ত্রীও হয়।

মন্ত্রী প্রতাপের ব্যক্তিগত জীবন একেবারেই সাধারণ। সন্ন্যাসী হতে চেয়েও পারেননি, তবে হতে পেরেছেন মন্ত্রী। ওড়িশার মোদিখ্যাত প্রতাপ ওড়িশার বালেশ্বর থেকে লোকসভা সদস্য নির্বাচিত হন। বিজেডি প্রার্থী রবীন্দ্র কুমার জেনাকে ১২ হাজার ৯৫৬ ভোটে হারিয়েছেন তিনি। বালেশ্বরের এক খড়ের চালার বাড়িই তার স্থায়ী ঠিকানা। পোশাক-পরিচ্ছদ ও চলাফেরাও সাধারণ। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করলেও বাহন তার একমাত্র সাইকেল। প্রচারও চালিয়েছেন সাইকেলে চড়েই। তার রাজ্যের মানুষ তাকে ‘ওড়িশার মোদি’ হিসেবে সম্বোধন করেন। ওড়িশা উপকূলের রাজনীতির মানুষ তিনি। ১৯৫৫ সালে ওড়িশার নীলগিরির গোপীনাথপুর গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। স্থানীয় ফকিরমোহন কলেজ থকে স্নাতক পাস করেন। ছেলেবেলা থেকে আধ্যাত্মিক বিষয়ে ব্যাপক আগ্রহ তার। সেসব নিয়ে লেখালেখিও করতেন। সন্ন্যাসী হয়ে মানুষের সেবা করতে চেয়ে চলে যান মঠে। বেলুড় মঠে যোগ দিতে চেয়েছিলেন সারেঙ্গি। আত্মস্থানন্দজি মহারাজের সঙ্গে দেখাও করেন তিনি। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ায় মায়ের সেবার জন্য বাড়িতেই থেকে যান তিনি। সমাজের জন্যই কাজ করতে চেয়েছিলেন। গণশিক্ষা মন্দির যোজনার অধীনে ময়ূরভঞ্জ ও বালেশ্বরের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় দুস্থ শিশুদের জন্য অনেক স্কুলও গড়েছেন নিজের চেষ্টায়। এ ছাড়া এলাকার সার্বিক উন্নয়নে তার অবদান কম নয়। মায়ের মৃত্যুর পর পাড়ার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাই অবিবাহিত প্রতাপের দেখাশোনা করে। গ্রামের মানুষের কাছেও ঘরের লোক তিনি। ২০১৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত রাজ্য বিজেপির সহসভাপতি এবং ওড়িশার বিশ্ব হিন্দু পরিষদের যুগ্ম সভাপতিও ছিলেন তিনি। হলফনামায় তিনি জানান, কোনো ঋণ নেই তার। নেই কোনো গহনাও। সামান্য স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছেÑ এমনটাই জানিয়েছিলেন তিনি। [সূত্র : জনকণ্ঠ, ৩১.০৫.১৯]

মন্ত্রিত্বে প্রশংসা কুড়ানো প্রতাপের রয়েছে কিছু সমালোচিত দিকও। ওড়িশায় প্রবল জনপ্রিয় এ মানুষটি নানা ঘটনায় সমালোচিতও হয়েছেন। ১৯৯৯ সালে ভারতে একজন খ্রিস্টান মিশনারি গ্রাহাম স্টেইনস এবং তার দুই সন্তান খুন হন হিন্দু জনতার হাতে। ভারতের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নেতারা এ হত্যাকান্ডের জন্য দায়ী করেন কট্টরপন্থি হিন্দু গোষ্ঠী বজরং দলকে। প্রতাপ চন্দ্র সারেঙ্গি তখন ছিলেন বজরং দলের নেতা। তবে সরকারি তদন্তে ওই ঘটনার সঙ্গে কোনো গোষ্ঠীর সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া ২০০২ সালে বজরং দলসহ ডানপন্থি হিন্দু গোষ্ঠীগুলো ওড়িশা রাজ্য বিধানসভায় হামলা চালায়। এ ঘটনায় সারেঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, অগ্নিসংযোগ, হামলা এবং সরকারি সম্পদের ক্ষতি করার অভিযোগ আনা হয়। এসব নেতিবাচক দিক পাত্তাই পায়নি সারেঙ্গির জনপ্রিয়তার কাছে। সারেঙ্গি তার এলাকায় ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার জন্য সাইকেলে চড়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ভুবনেশ্বরে প্রায়শই তাকে দেখা যেত হেঁটে বা সাইকেলে চড়ে রাজ্যপরিষদের সভায় যাচ্ছেন। রাস্তার ধারের কোনো সাধারণ খাবার দোকানে খাচ্ছেন। রেলস্টেশনের প্ল্যাটফরমে ট্রেনের জন্য দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। যখন তিনি মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, তখন তার নির্বাচনী এলাকায় উৎসব শুরু হয়ে যায়। সমাজ ও রাষ্ট্রকে বদলে দিতে প্রতাপ সারেঙ্গির মতো মানুষই প্রয়োজন।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

জামালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ

[email protected]

 

"