বিশ্লেষণ

পদ্ধতিগত সংস্কার প্রয়োজন ভিজিএফে

প্রকাশ : ১৪ জুন ২০১৯, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

ভিজিএফ ও কাবিখা কর্মসূচি বাস্তবায়নে আধুনিক নীতিমাল তৈরি করতে বিভাগীয় কমিশনারগণকে ২০১৪ সালের মে মাসে নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। তার সেই নির্দেশ আজও আলোর মুখ দেখেনি। গতানুগতিক ঘুণে ধরা পুরাতন পদ্ধতিতেই চলছে ভিজিএফ কর্মসূচির চাল বিতরণ। আর এই সুযোগে চাল বিতরণ নিয়ে সারা দেশে চলছে নানা অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, ওজনে কম দেওয়া, চেয়ারম্যানের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের হাতাহাতি, মারামারির মতো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা।

দেশের গরিব, দুঃখী ও অসহায় মানুষ যাতে একসঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারেন, এজন্য সরকার প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে চাল বিতরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সরকার চেয়েছিল ধনী, দরিদ্র সবাই আনন্দে ঈদ উদযাপন করুক। ঈদের কটাদিন ভালোভাবে কাটুক। গরিবের ঘরেও ঈদ আনন্দের বার্তা নিয়ে আসুক। সরকারে এ মহৎ উদ্যোগ সত্যই অভিনন্দনযোগ্য এবং প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু সরকারের সেই মহৎ উদ্দেশ্য গুটিকয়েক রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বহীনতা, কর্তব্যকর্মে অবহেলা, সীমাহীন লোভ ও অসৎ উদ্দেশ্যের কারণে ভেস্তে যাবেÑ তা হতে পারে না। এর অবসান হওয়া প্রয়োজন। এতে তৃণমূল পর্যায়ের স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দুর্নাম হচ্ছে। স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব হ্রাস পাচ্ছে। মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে তাদের ওপর থেকে। গণতন্ত্রের জন্য এটা একটা অশনিসংকেত।

এবার ঈদুল ফিতরের আগে প্রতিটি ভিজিএফ কার্ডধারীকে ১৫ কেজি করে চাল প্রদানের সরকারি নির্দেশনা ছিল। অথচ দুঃখের বিষয় গরিব-দুঃখী মানুষের সামান্য ১৫ কেজি চাল নিয়ে সারা দেশে কী এক লঙ্কা কান্ডই না ঘটে গেল। কোথাও ১৫ কেজির পরিবর্তে দেওয়া হয় ১০ থেকে ১২ কেজি চাল। কোথাও অবৈধভাবে বিক্রির সময় পুলিশ আটক করে ভিজিএফের চাল। কোথাও ভুয়া তালিকা তৈরি নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ইউপি চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলরদের হয় ঝগড়াবিবাদ। হাতাহাতি। মারামারি। এ ধরনের এক ন্যক্কারজনক ঘটনায় নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার কদমচিলান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে শুয়ে থাকতে হয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেডে। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক।

আগে দেখেছি, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বাররা ছিলেন সমাজের সম্মানিত ব্যক্তি। তারা নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে সমাজের সেবা করতেন। মানুষের কল্যাণে কাজ করতেন। ছোটখাটো ঝগড়াবিবাদের মীমাংসা করতেন। মানুষ আপদে-বিপদে নির্ভয়ে তাদের কাছে ছুটে যেতেন। তৃণমূলে তারাই ছিলেন দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের নিরাপদ ভরাসাস্থল। তখন দলভিত্তিক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচন ছিল না। ছিল না স্থানীয় সরকারের কাজে কেন্দ্রীয় সরকারের এত হস্তক্ষেপ। এত বাড়াবাড়ি।

যারা গরিব, দুঃখী, অসহায় মানুষের সামান্য খয়রাতি চাল আত্মসাৎ করে, ওজনে কম দেয়। ভুয়া তালিকা তৈরি করে গরিবের হক নষ্ট করে তারা জনপ্রতিনিধি নামের কলঙ্ক। তাদের এই অপকর্মকে ধিক্কার ও নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। আবার এসবের বিপরীতধর্মী ঘটনা ঘটারও নজির আছে আমাদের দেশে। গত বছর দরিদ্র সমাবেশের মাধ্যমে ভিজিএফের চাল বিতরণ করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন ফুলপুর উপজেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিগণ। এ উদ্যোগের নায়ক ছিলেন ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ও বর্তমান সরকারে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী শরিফ আহমেদ। তার ওই ব্যতিক্রমধর্মী কর্মকান্ড সারা দেশে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। গত বছর ঈদুল আজহার আগে স্বজনপ্রীতি ঠেকাতে ইউপি সদস্য ও দলীয় নেতাকর্মীদের হাতে কার্ড না দিয়ে দরিদ্র সমাবেশ ডেকে ঈদের বিশেষ ভিজিএফ কার্ড বিতরণ করে ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলা প্রশাসন। প্রথমে ইউনিয়নগুলোতে মাইকিং করে জানিয়ে দেওয়া হয় কার্ড বিতরণের স্থান ও তারিখ। তারপর সেখানে এলাকার দরিদ্র নারী-পুরুষ একত্রিত হলে শুরু হয় বাছাইপর্ব। স্থানীয় এমপি প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগণের উপস্থিতিতে প্রকৃত সুবিধাভোগী চিহ্নিত করে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ভিজিএফের কার্ড। সমাবেশে উপস্থিত হলেও কোনো সচ্ছল সামর্থ্যবান লোককে ভিজিএফ কার্ড দেওয়া হয়নি। একই ব্যক্তির একাধিক কার্ডপ্রাপ্তি রোধকল্পে কার্ড গ্রহণকারীদের জাতীয় পরিচয়পত্র একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছিল। উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাশেদ হোসেন চৌধুরীর মতে, কার্ড বিতরণ থেকে শুরু করে চাল বিতরণ পর্যন্ত নেওয়া হয়েছিল যথাযথ নজরদারির ব্যবস্থা।

আমাদের কথা হলোÑ ফুলপুর উপজেলা যদি সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে গরিব অসহায় মানুষের মধ্যে ঈদের আগে ভিজিএফের চাল বিতরণ করতে পারে , তা হলে অন্যরা পারবেন না কেন? ভিজিএফ কার্ড ভাগাভাগি নিয়ে লালপুর উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সঙ্গে কদমচিলান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়াম্যান; সেলিম রেজার কথা কাটাকাটির জের ধরে চেয়ারম্যানের নাক ফাটিয়ে দেবে কেন দুর্বৃত্তরা? গুরুতর আহত অবস্থায় কেন তাকে ভর্তি হতে হবে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে? কেন ঠাকুরগাঁও জেলার জামালপুর ইউনিয়নের ভিজিএফের চাল ওজনে কম দেওয়ার অভিযোগ পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হবে? শুধু কি কদমচিলান ও জামালপুর ইউনিয়নেই ঘটছে এই অনিয়ম? না আরো অনেক ইউনিয়নে ঘটছে এ ধরনের অবাঞ্ছিত ঘটনা। গত ৩০ মে নেত্রকোনা সদর উপজেলার দক্ষিণবিশিউড়া ইউনিয়ন পরিষদে বরাদ্দকৃত ৮২৭ জন ভিজিএফ কার্ডধারীর মধ্যে চাল বিতরণ কর্মসূচি চলাকালে ইউপি চেয়ারম্যান জনপ্রতি ১৫ কেজি চালের পরিবর্তে ১০-১১ কেজি করে বিতরণ করেন। আর সেই সময় সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিতরণ কার্যক্রম পরিদর্শনে গেলে পরিমাণে কম দেওয়ার বিষয়টি হাতে-নাতে ধরা পড়ে। পরবর্তীতে ইউএনও সুমনা আল মজিদের হস্তক্ষেপে বিতরণে কম দেওয়ার ফলে উদ্বৃত্ত প্রায় ৪০ বস্তা চাল ইউনিয়নের বিনা কার্ডধারী দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা হয়। অন্যদিকে গত ৪ জুন, রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার কালুপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল হক মানিকের মালিকানাধীন গুদামে অভিযান চালিয়ে ১৯৭ বস্তা চাল জব্দ করে পুলিশ। এ ঘটনায় মানিক চেয়ারম্যানসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেছেন উপজেলা প্রকল্প বস্তবায়ন কর্মকর্তা। এ ছাড়া কুড়িগ্রামের চিতলমারী উপজেলার রানীগঞ্জ, অষ্টমীরচর, রমনা মডেল ইউনিয়ন, বরগুনার আমতলী উপজেলার আড়পাঙ্গাশিয়া, বাঁশখালী উপজেলার শিলকুপ ও শেরপুর জেলার শ্রীবরদীর কুড়িকাহনীয়া ইউনিয়নে ভিজিএফের চাল বিতরণে অনিয়মের খবর ফলাও করে প্রকাশিত হয় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।

সরকার সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় যদি সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা দিতে পারে, মাতৃত্বকালীন ভাতা দিতে পারে, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা দিতে পারে। বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের উপবৃত্তির টাকা দিতে পারে মোবাইল বাংকিং-এর মাধ্যমে, তা হলে গরিব-দুস্থ অসহায় মানুষের মধ্যে কেন ভিজিএফের সামান্য ক’কেজি চাল সঠিকভাবে বিতরণ করতে পারবে নাÑ এটা আমার কাছে মোটেও বোধগম্য নয়। আমার মনে হয়, সরকারের নীতিনির্ধারদের সদিচ্ছা ও দৃঢ়সংকল্পের মাধ্যমেই এ কাজটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন শুধু আন্তরিকতা ও পদ্ধতিগত সংস্কার।

জানা যায়, অধিদফতর হতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে উপজেলায় বরাদ্দপ্রাপ্তির পর উপজেলা নির্বাহী অফিসার কর্তৃক জনসংখ্যা/আয়তন/ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ/ ক্ষতিগ্রস্ত লোকসংখ্যা/ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার আয়তন/উপকারভোগীর সংখ্যার ভিত্তিতে ইউনিয়নওয়ারি উপবরাদ্দ প্রদান করা হয়। ইউপি চেয়ারম্যান কর্তৃক ইউনিয়ন কমিটিতে উপস্থাপন এবং উপকারভোগী/ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার নিরূপণ করার পর ওয়ার্ডভিত্তিক দায়িত্ব প্রদান করা হয়। প্রাপ্ত তালিকা ইউনিয়ন কমিটি থেকে যাচাই-বাছাই করে উপজেলা কমিটিতে প্রেরণ করা হয়। উপজেলা কমিটির অনুমোদনের পর অনুমোদিত তালিকা আবার ইউনিয়ন পরিষদে পাঠানো হয়। পাশাপাশি ইউনিয়নভিত্তিক ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করে চেয়ারম্যানের অনুকূলে ডিও প্রদান করা হয়। অতপর গুদাম হতে খাদ্যশস্য/ ত্রাণসামগ্রী উত্তোলন করে ট্যাগ অফিসারের উপস্থিতিতে উপকারভোগীদের নামে বিতরণ করা হয়। দুর্যোগে আক্রান্ত দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং স্বাভাবিক সময়ে দরিদ্র জনগণকে সেবা দেওয়াই এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)

নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লি., নাটোর

[email protected]

 

"