পর্যালোচনা

বিএনপিতে প্রয়োজন অভ্যন্তরীণ সংস্কার

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০১৯, ০০:০০

কবীর মোল্লা

স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি নামক দলটির জন্ম হয়েছে ক্ষমতার মসনদ থেকে। পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের গায়ে হাওয়া লাগিয়ে জেনারেল জিয়া ক্ষমতার মসনদ দখল করেন। কোনো রাজনৈতিক অভিলাষ নেই বললেও হ্যাঁ-না ভোট আয়োজন করে অন্য ১০ জন সামরিক শাসকের মতো ক্ষমতায় পাকাপোক্তভাবে বসেন জেনারেল জিয়া।

বাংলাদেশ জাগো দল তারপর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নামক দল গঠন করে জেনারেল জিয়া হয়ে যান সেই দলের চেয়ারম্যান। জাতীয় নির্বাচনে প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতায় বসে বিএনপি। তখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ৩৯ আসন নিয়ে সংসদে বিরোধী দলে। জেনারেল জিয়ার সামরিক শাসনামলে এক কঠিন সময় পার করে ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগ।

রাজনৈতিক দলের উত্থান-পতন থাকবেই, তবে সঠিক নেতৃত্ব সঠিক সময়ের সঠিক সিদ্ধান্ত জনগণের কাছে সেই দলকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে। তার প্রমাণ শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

১৯৭৯ সালের নির্বাচনে যে দলটি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ পেয়ে সরকার গঠন করেছিল, সেই দলটি গত ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে মাত্র পাঁচটি আসন পেয়ে জনপ্রিয়তার খাদে নেমে এসেছে। নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি।

১৯৭৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল আওয়ামী লীগ। তবে আওয়ামী লীগের ৩৯ আসন দলটির সুনাম ক্ষুণœ করেনি। ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করে পুনরায় ক্ষমতাসীন হয়। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলের আসনে বসে।

১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে ক্ষমতাসীন হলে বিএনপি বিরোধী দলের আসনে বসে। তখনো বিএনপির আসন ছিল সম্মানজনক। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট আবারও ক্ষমতা গ্রহণ করে। তবে এটিই ইতিহাসের পাতায় তাদের শেষ ক্ষমতা গ্রহণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০০৯ সালের নির্বাচনে তাদের যে সম্মানজনক আসন ছিল, এখন আর সেই সম্মান নেই।

২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে নির্বাচন প্রতিরোধ করতে পেট্রলবোমা দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ হত্যার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে বিএনপির ঘাড়ে। রাজনৈতিক যেকোনো আন্দোলনে সংগ্রামে প্রতিবাদ আছে, প্রতিরোধ আছে। কিন্তু পেট্রলবোমায় পুড়িয়ে মানুষ হত্যার ভয়ংকর রাজনীতি এ দেশের মানুষ গ্রহণ করেনি। আর এ কারণেই এবারের নির্বাচনে জনগণ তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার দিকে।

২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নিয়ে মস্ত ভুল করেছে বিএনপি। এ অবস্থায় দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত হন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। আর দলকে নেতৃত্ব দেন সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার থেকে একুশের গ্রেনেড হামলার প্রধান আসামি তারেক রহমান।

একসময়ের আওয়ামী নেতা, বর্তমান গণফোরাম সভাপতি ড. কামালের হাতে নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপি এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে। নিঃসন্দেহে নির্বাচনে অংশগ্রহণ দলটির জন্য একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। কারণ বিএনপি যে রাজনৈতিক দল হিসেবে এখন প্রায় দেউলিয়া হতে বসেছে, তা এই নির্বাচনে অংশ না নিলে বোঝা যেত না। লন্ডন থেকে হাতের ইশারায় অপেক্ষা করা আর দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তোলা এক কথা নয়। বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা এমন যে, নির্বাচনে একক দল হিসেবে তারা সব আসনে প্রার্থী দিতে পারেনি। রাজনৈতিক দল আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেমনি জনগণের কাছে থাকে; তেমনি নতুন নতুন নেতৃত্ব তৈরি করে সামনের কাতারে নিয়ে আসে। দলটির সাংগঠনিক অবস্থা এমনই দুর্বল যে, বছরের পর বছর বিভিন্ন ইউনিটে নির্বাচন হয় না। রাজনীতি হলো মাঠের খেলা। আর মাঠের সঙ্গী হলো জনগণ। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে না থাকলে জনগণ এক দিন দলটিকে ভুলে যাবে। শুধু প্রেস ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে মাসে এক-আধবার মানববন্ধন করলে রাজনৈতিক আন্দোলন-পাঠের পূর্ণাঙ্গতা আসে না। মাঠের মানুষের মনোভাব না বুঝে লন্ডন থেকে আসা সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থেকে রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা পর্যন্ত হয়ে পড়েছেন অলস। এ অলসতা তাদের নিয়ে গেছে রাজনীতির অন্তর্কলহের অজানা বৃত্তে। আর সে কারণে বিএনপিতে একদিকে রয়েছে আন্দোলনবিমুখ ব্রিফিং সংস্কৃতি; অন্যদিকে রয়েছে মাঠে পড়ে থাকা নেতাকর্মীরা। কিন্তু যথাযথ রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে হাজির না হলে নেতাকর্মীদের মাঠে নামানো কঠিন। এর প্রমাণ পাওয়া গেছে গত মঙ্গলবার দলের পল্টন কার্যালয়ে। বুড়ো ছাত্রনেতারা তাদের বাদ দেওয়া মেনে নিতে পারেননি। তাই তারা সব ধরনের রাজনৈতিক শিষ্টাচার বিসর্জন নিয়ে সিনিয়র রাজনৈতিক নেতাদের বাইরে রেখে দলীয় কার্যালয়ে তালা লাগিয়ে দেন। এর ফলে দলটির দেউলিয়াপনা আরো প্রকটভাবে প্রকাশ পেয়েছে এবং দলে যে চেইন অব কমান্ড নেই, তাও সামনে এসেছে।

ছাত্রদলের মতো সংগঠনটি এখন অছাত্র ও বুড়ো বিগত হয়ে যাওয়া ছাত্রদের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে। এর ফল অবশ্য তারা পেয়েছে ডাকসু নির্বাচনে। সেখানে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ভালো ফল করেছে নিরপেক্ষ ছাত্ররা। অন্যদিকে ছাত্রদলের অবস্থান ছিল অনেক নিচে। দলটির জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সাংগঠনিক অবস্থান বিবেচনা করলেও একই চিত্র পাওয়া যাবে। জাতীয় নির্বাচনে ভরাডুবির পেছনে শুধু সরকারদলীয় রাজনীতিকদের দোষারোপ না করে বিএনপির নেতাদের উচিত নিজেদের দুর্বলতাগুলো অনুসন্ধান করে দেখা। না হলে রাজনীতির চোরাবালিতে চিরতরে হারিয়ে যাবে এ দলটি।

নির্বাচিত সংসদ সংসদে যোগদান করা নিয়েও দলটি পানি কম ঘোলা করেনি। বিএনপি একবার বলেছে, তারা এই সংসদ মানে না। আবার বলেছে, দলনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানাতে সংসদে যাবে। আবার বলেছে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের নির্দেশে ও সিদ্ধান্তে দলটির নির্বাচিতরা সংসদে যোগদান করেছেন। আবার শপথ নিয়ে সংসদে যোগদান করে দলটির নেতারা বলছেন, এই সংসদ অবৈধ। অত্যন্ত বালখিল্য এই মন্তব্য ডালে বসে গাছ কাটা সমতুল্য। তারা বুঝে উঠতে পারছেন না, নাকি বুঝেও এ ধরনের মন্তব্য করছেন, তা সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য নয়। এর ফলে গণতন্ত্রের প্রতি দলটির নেতাকর্মীদের প্রতিশ্রুতি কতটা পোক্ত, সাধারণ মানুষের মনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

নব্বই দিন শেষ হওয়ার আগে বিএনপির চারজন সদস্য শপথ নিয়ে ইতিহাসে দলটির মুসলিম লীগের ভাগ্যবরণ করার সব আয়োজন সমাপ্ত হয়েছে।

এদিকে বিএনপি খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য কার্যকর কোনো আন্দোলন করতে পারেনি। রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সফল আন্দোলনে খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভব এবং বিএনপির থানা, জেলাসহ প্রতিটি কমিটিকে সুসংগঠিত করে দলে শৃঙ্খলা ও একতা ফিরিয়ে আনলে সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে পরবর্তী নির্বাচনে ভালো কিছু করা সম্ভব। সবকিছুর আগে প্রয়োজন সঠিক নেতৃত্ব। যোগ্য নেতা ছাড়া দলটি অভ্যন্তরীণ সংস্কার করতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে বিএনপি ব্যর্থ হলে জনগণ আরেকটি মুসলিম লীগের করুণ পরিণতি দেখবে।

লেখক : মন্ট্রিয়াল, কানাডা প্রবাসী

 

"