মতামত

ব্যাংকঋণ বনাম গ্রাহক স্বার্থ

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০১৯, ০০:০০

এস এম নাজের হোসাইন

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, কেলেঙ্কারি বেশ আলোচিত ও সমালোচিত একটি ইস্যু। যার পরিণামে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন সফল গভর্নরকে অকালে বিদায় নিতে হয়েছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে আলোচিত অর্থমন্ত্রীর বিদায়। ব্যাংকের সুদের হার এক ডিজিটে নিয়ে আসা নিয়ে সাম্প্রতিক কালের জোরালো আলোচনা হলেও খোদ প্রধানমন্ত্রী কয়েকবার বলার পরও ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুদের হার এক ডিজিটে নামিয়ে আনতে পারেনি। পরে অবশ্য সরকারের কয়েক মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে প্রথমে সরকারি ব্যাংক ও পরবর্তীতে বেসরকারি ব্যাংকগুলো নামিয়ে আনার ঘোষণা দিলেও ব্যাংকের গ্রাহকদের বক্তব্য হলো এখানে এখনো অনেকগুলো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সুদের হার এক ডিজিটে নামাতে নানা গড়িমসি করছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরও বেসরকারি ব্যাংক মালিকরা সুদের হার কমাতে গড়িমসি করলে সরকার তাদেরকে বিশাল আকারের সুবিধা প্রদান করেন। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে হোটেলে ডেকে নিয়ে মিটিংয়ে বসার দুঃসাহস পর্যন্ত তারা দেখিয়েছেন। তবে অনেকেই বলে থাকেন বাংলাদেশ সব সম্ভবের দেশ।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি বেশ আলোচনার ঝড় তুলেছে, তা হলো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে করতে একজন গ্রাহকের সর্বশেষ শার্ট, প্যান্ট থেকে শুরু করে সব দিয়েও সর্বশেষ আন্ডারওয়্যারটি ছাড়া আর কিছুই থাকল না। বিষয়টি অনেকে কাল্পনিক মনে করলেও এটি সত্যিকারের কাহিনি। যারাই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের দ্বারস্থ হয়েছেন তাদের অধিকাংশের বেলায় এ দৃশ্যটি প্রমাণিত হয়েছে বারবার। স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের একসময় সুদখোর বলা হতো জোরেশোরে। কারণ তারা স্বর্ণবন্ধক রেখে চড়া সুদে ঋণ প্রদান করে থাকেন। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে এখনো স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা এ খাতে বড় জোগানদার। ঠিক একইভাবে একটি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান যখন কাউকে ঋণ দেন, তখন তার যাবতীয় সহায় সম্বল ঋণের বিপরীতে জামানত-বন্ধকি রেখে ঋণ দেন। সহায়-সম্বল বন্ধকি নিয়ে নেওয়ার পরও তারা আবার খোলা চেকও জামানত নিচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে আপত্তি দিয়েছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা? বাংলাদেশ কর্তারা হিমঘরে বসে নির্দেশনা দিলেও ব্যাংকগুলো কর্ণপাত করে না। আর ঋণের সুদ যা-ই হোক না কেন, ঋণ আদায় প্রক্রিয়াটি ভয়াবহ; যা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। যেমন আপনি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ২০ লাখ টাকা ঋণ নিলেন ১৫ বছরের জন্য। যদি আপনার মাসিক কিস্তি হবে ২৩৫০০ টাকা। আর ১৫ বছরের প্রথম ১০ বছর আপনার ঋণের কোনো আসল পরিশোধ হবে না, ১০ বছর পরে এসে আপনার আসল পরিশোধ হওয়া শুরু হবে। আমাদের দেশে বড়মাপের অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকারের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। কিন্তু সেই আদিম যুগের মহাজনি প্রথার মতো সুদ কষার হিসাব এখনো বাংলাদেশ থেকে যায়নি। আর সাধারণ গ্রাহকের পক্ষে কথা বলা লোকের সংখ্যা ক্রমাগত কমছে। সাবেক সফল গর্ভনর ড. আতিউর রহমান কিছু সংস্কার শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে অকালে বিদায় নিতে হয়েছে।

ব্যাংকের প্রচলিত ঋণের সুদ নির্ধারণ ও কিস্তি আদায়ের প্রক্রিয়াটির বিষয়ে অনেকে বলবেন, এটি পুরো বিশ্বজুড়ে সুদ নির্ধারণ প্রক্রিয়া, সে কারণে বাংলাদেশে এটা পরিবর্তন সম্ভব নয়। সেখানে বলতে হয়, দরিদ্র মানুষকে জামানতবিহীন ঋণ দিয়েও তা সফলভাবে আদায় বাংলাদেশ দেখিয়েছে। যার কারণে বাংলাদেশে উদ্ভাবিত ক্ষুদ্রঋণ পদ্ধতি এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সফল দারিদ্র্যবিমোচনের মডেল। সে কারণে প্রচলিত ব্যাংকঋণের সুদ নির্ধারণ ও আদায় প্রক্রিয়াটিও পরিবর্তন বাংলাদেশ থেকে শুরু হতে পারে। এখানে প্রচলিত ব্যাংকের ঋণের দুটি গল্প উপস্থাপন করতে চাই। দেশে সুনামধারী একজন ব্যাংকের গ্রাহক যিনি মফস্বল শহরের একটি শপিং মলে জুতার দোকানের মালিক, ব্যবসার প্রয়োজনে ঋণ নিলেন মাত্র ১৫ লাখ টাকা। ব্যাংক ব্যবস্থাপক প্রথমে ওডি হিসাবে ঋণ দিলেন পরে তা পরিবর্তন করে এসএমই ঋণে পরিবর্তন করে দেন। ওই গ্রাহক তিন বছর প্রতি মাসে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করে ১৬ লাখ টাকা পরিশোধ করার পর ওই গ্রাহক যখন পুরো ঋণটি শেষ করতে চাইল, তখন ব্যাংক আরো ১৫ লাখ টাকা দাবি করল? একপর্যায়ে বিষয়টি ফায়সালা করতে না পেরে ক্যাবের কার্যালয়ে অভিযোগ জানাল, ক্যাব বিষয়টি নিয়ে প্রথমে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরবর্তীতে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির মধ্যস্থতায় মীমংসা করার উদ্যোগ নেন। স্থানীয় ব্যাংক শাখা ব্যবস্থাপক ওই গ্রাহকের নামে ৫টি মামলা ঠুকে দেন। ঋণ নেওয়ার সময় জামানত হিসাবে তার জমি বন্ধকি রাখা হয় এবং তারিখবিহীন খোলা চেক জামানত নেওয়া হয়। যা দিয়ে আদালতে চেকের মামলা রজ্জু করেন। প্রচলিত বিচারব্যবস্থায় আদালত কোনো ধরনের বিচার-বিশ্লেষণ না করে আসামির বিরুদ্ধে পাওনা টাকা আদায়ে সমন ও গ্রেফতারি নোটিস ইস্যু করেন। একপর্যায়ে ক্যাব এবং ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপে মাত্র ৮ লাখ টাকায় বিষয়টি মীমাংসা হয়। গ্রাহক তার বন্ধকিকৃত জমি ও খোলা চেকগুলো ফেরত পান এবং ঋণ থেকে মুক্তি পান।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চাকরিজীবী ২০১০ সালে এইচএসসিসি ব্যাংক থেকে ১৫ বছর মেয়াদি ২৭,৫০,০০০ টাকা ঋণ নিয়ে ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট কিনলেন। চুক্তি ছিল ৯.৯৯ শতাংশ হারে সূদ নেবে। সেই হিসাবে মাসিক কিস্তি পরিশোধের পরিমাণ ছিল ২৭,৫০০ টাকার মতো। পরবর্তী এক বছরের মধ্যে সুদের হার বেড়ে গেল পর্যায়ক্রমে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত এবং মাসিক কিস্তি গিয়ে ঠেকল ৩৪,০০০ টাকায়। তার পরিকল্পনা ছিল পাঁচ বছর পরে এককালীন বাকি টাকা নগদ পরিশোধ করে ঋণমুক্ত হবেন। যথারীতি পাঁচ বছর পরে ব্যাংকে গিয়ে বকেয়ার হিসাব নিতে গিয়ে দেখেন ২৬,২৫,০০০ টাকা বকেয়া আছে। ভদ্রলোক অবাক, এটা কীভাবে হয়, কারণ তিনি ইতোমধ্যে ২২ লাখ টাকা পরিশোধ করে ফেলেছেন। কারণ জিজ্ঞেস করাতে ব্যাংক বলল, ‘১৫ বছরের ঋণের সুদ অগ্রিম হিসাব করে মাসিক কিস্তির সঙ্গে ৯৫ টাকা শতকরা হারে কেটে নেওয়া হচ্ছে এবং গৃহঋণের এটাই নিয়ম’। অর্থাৎ এই পাঁচ বছরে ঋণের আসল কাটা গেছে মাত্র ৫ শতাংশ হারে। এটা যেন মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা। পরে সে নিজের বোকামি বুঝতে পেরে অনেক মূল্যবান প্রপার্টি বিক্রি করে ব্যাংকের বকেয়া টাকা এককালীন পরিশোধ করলেন।

এখানে এখন প্রশ্ন হলোÑ সুদখোর বলে যাদেরকে আমরা প্রতিনিয়ত গালি দিচ্ছি, সে এনজিওগুলো ঋণের কিস্তি আদায়কালে মূল টাকার সঙ্গে ঋণের সুদের সমন্বয় করলেও ব্যাংক ও লিজিং কোম্পানিগুলো আগে পুরো সুদ আদায় করে নিয়ে ৫-১০ বছর ঋণের কিস্তি দেওয়ার পর ক্রমান্বয়ে মূল টাকাগুলো সমন্বয় করে থাকেন। যার কারণে একজন ঋণী গ্রাহক ব্যাংকের ঋণের টাকা দিতে দিতে ফতুর হয়ে যান। আর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক ও কর্মচারীরা দিনে দিনে এয়ারকন্ডিশন বাড়ি, গাড়ির মালিক হয়ে আরাম-আয়েশে জীবনযাপন করে থাকেন। ব্যাংক মালিকরা প্রতিনিয়ত একের পর আর নতুন নতুন ব্যাংক খুলছেন আর যারা এর জোগান দেন, সেই ঋণী/গ্রাহকরা দিনে দিনে ফতুর হয়ে যাচ্ছেন। এনজিওগুলো আরো একটি কাজ করে থাকেন, তা হলো কোনো কারণে কোনো ঋণী গ্রাহক ব্যবসায় লোকসান দিলে তারা তাকে বর্ধিত ঋণ দিয়ে তার ব্যবসাটি পুনরায় চালু করতে সহায়তা করেন এবং ঋণী কোনো কারণে মারা গেলে তার ঋণটি বিমা থেকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে ঋণ গ্রাহকের যাবতীয় ঋণ মওকুফ করেন। ব্যাংকের বেলায় ঋণী গ্রাহক মারা গেলে তার পরিবার-পরিজনকে সে টাকা পরিশোধ করতে হয়।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে অভিযোগ জানানোর জন্য দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণকারী বাংলাদেশের কাছে প্রতিকার পাওয়ার জন্য আবেদন জানানোর রীতি আছে। সাবেক গর্ভনর ড. আতিউর রহমানের আমলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১১ সালের ১ এপ্রিল গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্র (সিআইপিসি) গঠন করে। পরিধি বাড়তে থাকায় পরে একে ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস (এফআইসিএসডি) নামে পূর্ণাঙ্গ বিভাগে রূপ দেওয়া হলেও গর্ভনর পরিবর্তন হওয়ার পর এটি একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। কোনো গ্রাহক অভিযোগ করলে তার কোনো প্রাপ্তি স্বীকার পর্যন্ত করা হয় না। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, গ্রাহক হয়রানি সম্পর্কে তারা কি কিছু করতে পেরেছেন? যদিও এই এফআইসিএসডি প্রতি বছর তাদের কার্যক্রমের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকেন। তবে এ প্রতিবেদনের সত্যতা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন আছে। কিন্তু কতজন গ্রাহক এখান থেকে প্রতিকার পেয়েছেন তার সত্যতা নিয়ে সন্দেহের মূল কারণ হলো ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ কর্তার কোনো কথা শুনছে না, সেখানে এই এফআইসিএসডি সেকশনের কথা কতটুকু আমলে নেবে? বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাকেও কোনো কোনো সময় আমলে না নিয়ে সরকারের শীর্ষ মহলের কাছে দেনদরবার করে থাকেন। ফলে একজন সাধারণ গ্রাহকের আহাজারি ও কান্না তাদের কাছে যাচ্ছে না। ফলে ব্যাংকগুলোতে অনিয়ম, গ্রাহক হয়রানি এখন রীতিতে পরিণত হয়েছে। যার খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো জাতিকে। ব্যাংক লুটপাট, ঋণ প্রদানে অনিয়মসহ নানা রোগে ব্যাংকগুলো যেমন আক্রান্ত, তেমনি ঋণ প্রদানে উচ্চ সুদ, আবার গ্রাহকের টাকায় ব্যাংকের পকেট ভারী করলেও লাভের পরিমাণ খুবই নগণ্য। যারা ব্যাংকের মালিক তারা যে পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করেছে তার দশ গুণ তুলে নিচ্ছেন নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে।

অনেক বিশেষজ্ঞরা গ্রাহক পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ দিলেও এটি মূলত গ্রাহকদের সঙ্গে আরো একটি প্রতারণার শামিল। কারণ কোনো গ্রাহক অভিযোগ করে প্রতিকার পেলে সে অন্য গ্রাহকদেরকে বিষয়টি জানাবেন। কিন্তু গ্রাহক ব্যাংকঋণ নেওয়ার সময় যে রকম পায়ের সেন্ডেল ক্ষয় করে ঋণ পান, সে রকম একটি অভিযোগ দিয়ে পুরো বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের এফআইসিএসডি অফিসে জুতা ক্ষয় করেও প্রতিকার না পেলে অভিযোগ জানানো তো দূরের কথা, এর ধারে কাছেও যাবেন না। অভিযোগ নিষ্পত্তিতে এফআইসিএসডির চরম শৈথল্যতা প্রদর্শন, অনাগ্রহ এবং অধিকাংশ স্থানে গ্রাহকদের অভিযোগে নিরুৎসাহিত করার ঘটনায় এ বিভাগটির প্রতি সাধারণ গ্রাহকদের আস্থা ও বিশ্বাস হারানোর ফলে গ্রাহকরা এখন অসহায় হয়ে পড়েছে। ভোগান্তির মাত্রা চরম হলেও গ্রাহকরা এখানে অভিযোগ করতে অনাগ্রহী। কারণ অভিযোগ জানানোর হেলপ লাইনটি সচল নয়। তাই গ্রাহক স্বার্থ রক্ষায় দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবিলম্বে এফআইসিএসডি সেলটি পরিপূর্ণভাবে কার্যকর করা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরের আদলে গণশুনানির আয়োজন সময়ের দাবি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

লেখক : ভাইস প্রেসিডেন্ট

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

cabbd.nazer@gmail.com

 

"