মুক্তমত

বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস

প্রকাশ : ১২ জুন ২০১৯, ০০:০০

ইসমাইল মাহমুদ

একটি দেশ জাতি তখনই উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করতে পারে, যখন ওই দেশের প্রতিটি শিশু পরিপূর্ণ সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে ওঠে। আজ ১২ জুন বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। শিশুদের অধিকার সুরক্ষা ও শিশুশ্রম প্রতিরোধের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম সংস্থা (আইএলও) ২০০২ সাল থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে প্রতি বছর দিবসটি পালন করে। বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৮০টি দেশে প্রতি বছরের ১২ জুন দিবসটি পালিত হয়। প্রতি বছর এ দিনে আমরা শিশুদের অধিকার নিয়ে তাদের অমানবিক শ্রম নিয়ে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করি। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে দিবসটি নিয়ে টকশোর আয়োজন করা হয়। যেসব প্রতিষ্ঠান শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমিকের কাজে ব্যবহার করে, তাদের তুলাধুনা করা হয় নির্ধারিত ওই দিবসেই। দিবসটি পেরিয়ে গেলেই ‘যা লাউ, তাই কদু’। অর্থাৎ বছরের বাকি ৩৬৪ দিন শিশুশ্রমের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আমরা পুরোপুরি নিশ্চুপ।

জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ ১৯৮৯ অনুসারে ১৮ বছরের কম বয়সি সবাই শিশু বলে বিবেচিত। অপরদিকে বাংলাদেশ শিশু আইন ১৯৭৪ অনুসারে ১৬ বছরের কম বয়সি প্রত্যেকেই শিশু। তবে বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুসারে ১৪ বছরের কম বয়সিরা শিশু। এ আইনে ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সিরা কিশোর বলে বিবেচিত। শিশুশ্রম বলতে সাধারণত ১৮ বছরের কম বয়সি ছেলে বা মেয়েকে পূর্ণ বেতনে, অর্ধেক বেতনে বা বিনা বেতনে যেকোনো শ্রমে নিয়োজিত করাই হলো শিশুশ্রম। আন্তর্জাতিক আইএলওর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা বিশ্বে প্রায় ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিশু নানাভাবে শ্রম বিক্রি করছে। তাদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি শিশু নানা রকম ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত রয়েছে। এর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

২০১৩ সালের জাতীয় শিশুশ্রম সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু নানা রকম শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৭ লাখ শিশু রয়েছে যাদের কাজ শিশুশ্রমের আওতায় পড়ে। বাকি শিশুদের শ্রম অনুমোদনযোগ্য। দেশের মোট শিশুর ১৩ শতাংশ নানা রকম শ্রমের সঙ্গে জড়িত রয়েছে বলে একাধিক সূত্রে জানা যায়। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সরকার শ্রম আইনের সংশোধন করে। এ আইনে শিশুদের শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত করাকে স্পষ্ট নিষেধ করা হয়েছে। সংশোধিত আইনে ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সি কিশোররা হালকা কাজ করতে পারবে। সংশোধন অনুসারে কর্মরত শিশু বলতে বোঝায় ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সি শিশুদের মধ্যে যারা সপ্তাহে ৪২ ঘণ্টা পর্যন্ত হালকা পরিশ্রম বা ঝুঁকিহীন কাজ করে। এ শ্রম অনুমোদনযোগ্য। তবে ৫ থেকে ১১ বছর বয়সি কোনো শিশু যদি কোনো ধরনের ঝুঁকিহীন কাজও করে, তবে সেটা শিশুশ্রম হিসেবে গণ্য হবে।

২০০৩ সালের জাতীয় শিশুশ্রম সমীক্ষায় দেখা গেছে, তখন প্রায় ৭৪ লাখ কর্মরত শিশু ছিল। তাদের মধ্যে ৩১ লাখ ৭৯ হাজার শিশুর কাজ শিশুশ্রমের আওতায় ছিল। এক দশকের ব্যবধানে ২০১৩ সালের জাতীয় শিশুশ্রম সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু নানা রকম শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে। অপরদিকে গত বছরের সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ১৮টি খাতে ১৬ লাখ ৯৮ হাজার ৮৯৪ জন শিশু শিশুশ্রমে নিয়োজিত। তাদের মধ্যে ৭ লাখ ৪৫ হাজার ৬৯০ জন মেয়ে শিশু। শিশুশ্রম বেশি দেখা গেছে কৃষিক্ষেত্র ও কল-কারখানায়। বর্তমানে শিশুশ্রমে নিয়োজিত ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু রয়েছে যারা একসময় স্কুলে গেলেও এখন আর স্কুলে যায় না।

শিশুশ্রম প্রতিরোধে কাজ করছে বর্তমান সরকার। ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম নির্ধারণ করে সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধের অঙ্গীকার করেছে। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কাজ চলছে। প্রথম ধাপে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় শ্রমজীবী শিশুদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পেশা থেকে সাধারণ শ্রমে নিযুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত ১৪-১৮ বছর বয়সি ৬০ হাজার শিশুকে কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলে অপেক্ষাকৃত কম পরিশ্রমের কাজে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। সরকারের অঙ্গীকার ২০২১ সালের মধ্যে শিশুশ্রম মুক্ত বাংলাদেশ। সরকারের পাশাপাশি ইউনিসেফ, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম, বাংলাদেশ শ্রম ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, আইন ও সালিস কেন্দ্র, ওয়ার্ল্ড ভিশন, সিএসআইডি, অপরাজেয় বাংলাদেশ, তরঙ্গ, শাপলা নীড়, ইডুকো, কোয়ালিশন ফর আরবান পুওর, ডন ফোরাম, তেরেদেশ নেদারল্যান্ডস ইত্যাদি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা শিশুশ্রম বন্ধে কাজ করছে।

শিশুদের অধিকার নিশ্চিতকরণে ও শিশুশ্রম প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সনদ-দলিল প্রণয়ন করা হয়েছে। ১৯২৪ সালের শিশু অধিকার বিষয়ক জেনেভা ঘোষণা, যার ওপর ভিত্তি করে ১৯৫৯ সালের শিশু অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক দলিল রচিত হয়; যা ১৯৮৯ সালের ২০ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অনুমোদিত হয়। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ এ সনদে অনুসমর্থন দিয়ে স্বাক্ষর প্রদান করে। ১৯৯০ সালের ২ সেপ্টেম্বর এ সনদ জাতিসংঘের কার্যকরী দলিলে পরিণত হয়। এ সনদে রয়েছে ৫৪টি অনুচ্ছেদ এবং ২টি প্রটোকল। এ ছাড়া রয়েছে বাংলাদেশে জাতীয় শিশুনীতি-২০১১।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"