মুক্তমত

ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হোক

প্রকাশ | ১১ জুন ২০১৯, ০০:০০

সুমনা মৃধা

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো কৃষি। বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে ক্রমেই এগিয়ে যাচ্ছে মধ্যম আয়ের দেশগুলোর কাতারে। বাংলাদেশের এ অগ্রযাত্রায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে কৃষি ও কৃষক। কৃষি খাতে দুর্বারগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কৃষিপণ্যের মধ্যে সম্প্রতি সবচেয়ে বেশি আলোচিত পণ্য ধান। ধান উৎপাদনে বর্তমানে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। যদিও আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান অন্যান্য দেশ থেকে অনেক পেছনে, তবু পিছিয়ে নেই উৎপাদনশীলতায়। বাংলাদেশের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) খাদ্য উৎপাদন এবং প্রবৃদ্ধি-সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী ধান উৎপাদন বৃদ্ধির হারে বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানটি দখল করে আছে বাংলাদেশ। ২০১৮ সালে দেশটির প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অন্য শীর্ষ দেশগুলোয় এ হার ছিল নেতিবাচক। চীনে দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং ভারতে ২ শতাংশ। এফএওর তথ্যমতে, বর্তমানে ধানের গড় উৎপাদনশীলতা প্রায় ৩ টন আর বাংলাদেশে তা সোয়া ৪ টন। কৃষির অভাবনীয় উন্নয়নে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ও জীবিকার ধারা। সব ধরনের বৈরী প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা যেমন সেচের পানির স্বল্পতা, বন্যা, খরা, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা প্রভৃতি মোকাবিলা করে কৃষিক্ষেত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশের কৃষকরা। এধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের রোল মডেল। আয় হবে হাজার কোটি বৈদেশিক মুদ্রা।

এফএওর জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃষি অভিযোজন প্রতিবেদন অনুসারে, আগামী দিনগুলোতে বিশ্বের যেসব দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়তে পারে, সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি। কিন্তু আমাদের দেশের বর্তমান ধানের বাজার ও কৃষকদের হতাশার চিত্র দেখার পরও কি আমরা কৃষকদের থেকে কৃষিপণ্যের উৎপাদন আরো বেশি পাওয়ার আশা করতে পারি? এহেন পরিস্থিতিতেও ধান তথা কৃষিপণ্য উৎপাদনে কৃষকদের আগ্রহ কি আদৌ বিরাজমান থাকবে? বজায় থাকবে কি আমাদের খাদ্যে অর্জিত স্বয়ংসম্পূর্ণতা?

চলতি মৌসুমে দেশজুড়ে হয়েছে ব্যুরো ধানের বাম্পার ফলন। এরই মধ্যে ধানের ফলন অর্জন করেছে লক্ষ্যমাত্রা। কৃষকের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ওপর দন্ডায়মান আমাদের অর্থনীতি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, উন্নয়নের নেপথ্যের এ কারিগরদের ভাগ্যের কোনো উন্নয়ন ঘটছে না। বরং তাদের জীবনযাপন আজ হুমকির সম্মুখীন। বোরো ধানের বাম্পার ফলন হওয়া সত্ত্বেও কৃষকদের গুনতে হচ্ছে বিরাট লোকসান। কৃষকরা পাচ্ছেন না ধানের ন্যায্যমূল্য। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১ কেজি ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ হয় ২৪ টাকা। সে হিসাবে মণপ্রতি খরচ হয় ৯৬০ টাকা। অথচ কৃষকদের ধান বিক্রি করতে হচ্ছে প্রতি মণ ৫০০-৫৫০ টাকা। অঞ্চলভেদে প্রতি মণ ৩৫০-৪০০ টাকায়ও বিক্রি হতে দেখা গেছে। এতে কৃষকরা উৎপাদন খরচের অর্ধেক মূল্যও পাচ্ছেন না। সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ধানের মূল্য প্রতি মণ ১০৪০ টাকা এবং প্রতি কেজি ২৬ টাকা। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে এ ধান ১২-১৩ টাকা কেজি মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। সরকার ধান-চাল ক্রয়ের জন্য ২৫ এপ্রিল থেকে ৩১ আগস্ট নির্ধারণ করলেও সার্বিকভাবে তা কার্যকর হচ্ছে না। বাজারে কৃত্রিম পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা তাদের ইচ্ছামতো নির্ধারিত দামে কৃষকদের থেকে ধান ক্রয় করছেন। ফলে সরকার নির্ধারিত দামে তো ধান বিক্রি হচ্ছেই না, এমনকি তার অর্ধেক দামেও কৃষকরা ধান বিক্রি করতে পারছেন না। উৎপাদিত ধান নিয়ে বিপদগ্রস্ত কৃষকরা। বর্তমানে যেখানে দেশে রয়েছে পর্যাপ্ত ধান এবং ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না কৃষকরা, সেখানে ভারত থেকে আমদানি করা হচ্ছে হাজার হাজার টন চাল। ফলে ধানের দাম আরো কমে যাচ্ছে। এতে ভারত এবং আমদানিকারক উপকৃত হলেও বেড়ে যাচ্ছে কৃষকদের লোকসানের পরিমাণ।

ধান কাটার শ্রমিকদের মজুরির জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বিধায় অনেক কৃষকই ধান কেটে ঘরে তুলতে পারছেন না। অক্লান্ত পরিশ্রমের পর উৎপাদিত ধান থেকে যখন উৎপাদন খরচ পাওয়ারও কোনো সম্ভাবনা নেই, তখন কৃষকরা ধানখেতে আগুন লাগিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ রাস্তায় ধান ছিটিয়ে, কেউবা খেতের পাকা ধানে মই দিয়ে নানা অভিনব পদ্ধতি অবলম্বন করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এভাবে চলতে থাকলে পুঁজি হারানো কৃষকরা ধান চাষে অনাগ্রহী হয়ে উঠবেন। কৃষকরা ধানের আবাদ থেকে বিরত হয়ে পড়লে দেশ খাদ্য ঘাটতিতে পড়বে। বাংলাদেশ হারাবে খাদ্যেশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার গৌরব। পানির দামে ধান বিক্রি হওয়ায় বিমর্ষ কৃষকরা। ধানে এমন ভয়াবহ লোকসানের ফলে ভোগান্তিতে কৃষক। আমাদের দেশের কৃষকরা স্বভাবতই আর্থিকভাবে অসচ্ছল। এমন পরিস্থিতিতে তাদের জীবনযাত্রা আরো অসহায় হয়ে পড়েছে। ছেলেমেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। না খেয়ে জীবনযাপন করতে হচ্ছে অনেককেই। এমতাবস্থায় আশু পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরো বিপজ্জনক হবে। কৃষক বাঁচাতে হলে নিশ্চিত করতে হবে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

"