মতামত

মাদকবিরোধী অভিযান সক্রিয় রাখতে হবে

প্রকাশ : ১১ জুন ২০১৯, ০০:০০

ড. ফোরকান উদ্দিন আহমদ

মাদকাসক্তি এক নীরব ঘাতক ব্যাধি। যে দ্রব্য গ্রহণে আসক্তি জন্মে তার নাম মাদকদ্রব্য। মাদকদ্রব্য গ্রহণের ফলে মাদকাসক্তের স্বাস্থ্যহানি হয়, জীবনীশক্তি কমতে থাকে, শরীরের ইন্দ্রিয়গুলো নিস্তেজ হয়ে যায়, আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়, মানসিক ভারসাম্য লোপ পায়, কর্মদক্ষতা ও ক্ষমতা হ্রাস পায়, হতাশা এবং অবসাদ তাকে ঠেলে দেয় এক অন্ধকার জীবনে। সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলে। কোনো ব্যক্তি মাদকাসক্ত হলে তার মধ্যে নানা রকম পরিবর্তন দেখা দেয়। এসব পরিবর্তনকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমনÑ দৈহিক পরিবর্তন, আচরণগত পরিবর্তন, মানসিক পরিবর্তন, বোধশক্তিতে পরিবর্তন, কাজকর্মে পরিবর্তন ইত্যাদি। মাদকাসক্তি অপরাধ নয়, রোগ। মাদকাসক্ত ব্যক্তি তাই কোনো অপরাধী নয়, একজন রোগী। মাদকাসক্তি একটি মারাত্মক বয়সের অসুস্থতা। এইডস, ক্যানসার ও হৃদরোগের মতো এটি একটি ভয়াবহ রোগ। এ রোগটি নিরাময়ের অযোগ্য হলেও মাদকাসক্ত ব্যক্তি যদি সুস্থতার জন্য আগ্রহী হন, চিকিৎসা ও চিকিৎসা-পরবর্তী পরিচর্যার মাধ্যমে অসুস্থ মনোভাব ও জীবনধারা পরিবর্তন করেন, জীবনকে সুশৃঙ্খলপূর্ণভাবে পরিচালনা করার জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ নেন; তা হলে তিনিও মাদকমুক্ত থেকে সুন্দরতম জীবন উপভোগ করতে পারেন।

মাদকাসক্তির অভিশাপে নিমজ্জিত এখন গোটা পৃথিবী। মাদকদ্রব্যের ভয়াবহতা আজ কোনো দেশ বা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সমগ্র বিশ্ব এ সমস্যার সম্মুখীন। পৃথিবীর অন্যতম উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশও এ সমস্যায় জর্জরিত। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ মাদক পাচারের ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। জাতি আজ বেশি উদ্বিগ্ন কারণ বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে ধারণা করা হয় যে, বাংলাদেশে মাদকাসক্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের প্রায় দ্বিগুণ। এ দেশের মাদকাসক্তদের অধিকাংশই তরুণ এবং শতকরা ৮৫ ভাগ মাদকাসক্তের বয়স ১৫ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। আমাদের দেশে বহুবিধ মাদকদ্রব্যের মধ্যে এখন ‘ইয়াবা’ হলো সবার প্রিয়। এই মাদকদ্রব্য বর্তমানে বাজারের আলু-পটোলের মতো সবখানেই পাওয়া যায়।

মাদকাসক্তির কারণ বহুবিধ। উঠতি বয়সি তরুণরা নেশা করে কৌতূহলবশত বন্ধুদের প্ররোচনায় অনেকে মাদকাসক্ত হয়ে ওঠে। মা-বাবার অসুখী দাম্পত্য জীবনের কারণে অনেক হতাশাগ্রস্ত তরুণ নেশা করে থাকে। পাড়া-মহল্লার ক্লাবের আড্ডা থেকেও মাদকাসক্তির বিস্তৃতি ঘটে। কর্মবিমুখতা ও ভ্রান্ত জীবন দর্শন, অপসংস্কৃতি ও অসৎ সঙ্গের প্রভাব, মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা, ব্যক্তিত্ব ও নৈতিক দৃঢ়তার অভাব, মাদকাসক্তির কুফল সম্পর্কে অজ্ঞতা, হতাশা (প্রধানত বেকারত্বজনিত), অত্যাধুনিক সাজগোজের প্রবণতা ও স্মার্ট হওয়া সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা, রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা লাভের অদম্য আকাক্সক্ষা ইত্যাদি মাদকাসক্তির কারণ।

মাদকের ভয়াবহতা উপলব্ধি করে সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। গত বছরের ২৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদে মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন পাস হয়েছে। ইয়াবা, কোকেন, হেরোইন পরিবহন, কেনাবেচা, কারবার, সংরক্ষণ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তান্তর, সরবরাহ ইত্যাদি অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবনের বিধান রয়েছে। মাদক বহনের পরিমাণ অনুযায়ী সাজা কমবেশির বিধান রাখা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ আইনের অধীন অপরাধ সংঘটনে অর্থ বিনিয়োগ, সরবরাহ, মদদ ও পৃষ্ঠপোষকতা দিলেও একই ধরনের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এই প্রথম মাদকসেবী ও মাদক কারবারির পাশাপাশি মাদক কারবারে পৃষ্ঠপোষক বা অর্থলগ্নিকারী, মদদদাতাদেরও কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা হয়েছে নতুন আইনে। তবে বিচারের চিত্রটি আশাপ্রদ নয়। অন্যদিকে জিরো টলারেন্সের আওতায় মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন এখনো তেমন দৃশ্যমান নয়।

মাদকের ভয়াবহ অভিশাপ থেকে পরিত্রাণ পেতে কয়েক দফা প্রস্তাব যেমনÑ মাদকদ্রব্যের জোগান তথা অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সীমান্তের স্পর্শকাতর এলাকায় স্থাপিত স্মার্ট ডিজিটাল বর্ডার সার্ভেইল্যান্স অ্যান্ড টেকটিক্যাল রেসপন্স সিস্টেমের সহায়তা নেওয়া আবশ্যক। সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম স্থাপনের ফলে সীমান্তে যেকোনো ধরনের মুভমেন্ট সম্পর্কিত ছবি ও ভিডিও সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মনিটরে দেখা যায়। মাদকবিরোধী কঠোর আইনে বিচার বিলম্বিত হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। কর্মরত অতিরিক্ত জেলা জজ কিংবা দায়রা জজদের নিয়ে মাদকদ্রব্য অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা বলা হয়েছে। ৩১ মার্চ ২০১৮ তারিখে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী অধস্তন আদালতে মোট বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ২৮ লাখ ৯২ হাজার ১৩৭। মামলার ভারে জর্জরিত বিচারকরা মাদক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হবেন না, এটিই বাস্তবতা। দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আদালতে সুষ্ঠু পরিকল্পনাভিত্তিক বিচার ব্যবস্থার বিন্যাস আবশ্যক।

মাদকাসক্তি প্রতিকার ব্যবস্থাকে সামাজিক আন্দোলন হিসেবে উদ্বুদ্ধকরণ, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, আত্মকর্মসংস্থান ও মাদকবিরোধী বিভিন্ন র‌্যালি বা সমাবেশের আয়োজন করতে হবে এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এ ছাড়া মাদক সমস্যার সমাধানকল্পে কর্মমুখী শিক্ষার প্রসারের জন্য বর্তমান সরকারকে কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে এবং এ প্রসঙ্গে কারিগরি প্রশিক্ষণের ওপরও জোর দিতে হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রচার ও প্রসারের জন্য মসজিদভিত্তিক শিক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইমাম ও ধর্মীয় শিক্ষকরা পারিবারিক সম্পর্ক সুদৃঢ়করণ বিষয়েও বিভিন্ন কর্মশালার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন।

মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার রোধে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচির পাশাপাশি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই জাতিকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দেওয়া যায় না। তরুণ প্রজন্মকে মাদকদ্রব্যের করালগ্রাস থেকে রক্ষা করা এ মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। আর এজন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এ ব্যাপারে গণমাধ্যমগুলোর অত্যন্ত স্পষ্ট ও তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। এ ছাড়া মাদকদ্রব্য চোরাচালানিদের বিরুদ্ধেও গণসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

মানব ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকে মাদকের উৎপত্তি হলেও বর্তমানে এর অনিয়ন্ত্রিত এবং ক্রমবর্ধমান ব্যবহারে সমাজ ব্যবস্থায় এক মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি হয়েছে। মাদকের করালগ্রাসে মানবিক মূল্যবোধ ধ্বংস হচ্ছে। বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা। এ সমস্যা প্রতিরোধে প্রয়োজন সামাজিক গণসচেতনতা। সমাজের সব গুণী লোককে মাদকবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত করে বিশেষত সব তরুণ ছাত্রছাত্রী ও যুবকর্মীর মাধ্যমে একে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিয়ে মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সবাইকে কার্যকর ভূমিকার প্রতি যতœশীল হতে হবে।

আজকের ও আগামী দিনের সুস্থ, সুন্দর, সুখকর জীবনের জন্যই মাদকদ্রব্যের ব্যবহার রোধ করতে হবে। সমগ্র বিশ্ববাসীকে মাদকবিরোধী আন্দোলনে সোচ্চার করার মধ্য দিয়ে মাদকের মরণ ছোবল থেকে দেশকে বাঁচতে হবে। দেশ ও বিশ্ব বিবেক সে প্রত্যাশাতেই প্রহর গুনছে। কবি সুকান্তের মতো আমাদের সবার দৃঢ়প্রত্যয় হোকÑ

‘চলে যাব তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ

প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল,

এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি

নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার’

লেখক : কলামিস্ট

 

"