পর্যবেক্ষণ

আইলার ক্ষত এখনো শুকায়নি

প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৯, ০০:০০

সাধন সরকার

ঘূর্ণিঝড় আইলার ১০ বছর পরও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনপদের লাখ লাখ মানুষ এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। খুলনার কয়রা, দাকোপ, সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনিসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় খাবার পানির সংকট এখনো কাটেনি। অনেক এলাকায় উপকূলীয় বেড়িবাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকার কারণে সহায়-সম্বলহীন মানুষের চোখে ঘুম কাটছে না। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার প্রভাব পড়েছে মানুষ ও প্রকৃতির ওপর। অনেক এলাকা বৃক্ষহীন হয়ে পড়েছে। কাজের সন্ধানে বছরের পর বছর মানুষ এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনপদে ভয়াল ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’ আঘাত হানে ২০০৯ সালের ২৫ মে। খুলনা-সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ এলাকা তছনছ হয়ে যায়। মানুষ, ঘরবাড়ি, গবাদিপশু ভাসিয়ে নিয়ে স্বাভাবিক উচ্চতার চেয়ে প্রায় ১৪-১৫ ফুট বেশি উচ্চতায় লোনাপানি ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও ঘূর্ণিঝড় আইলার ক্ষত কাটিয়ে এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি মানুষগুলো। উপকূলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানি ও বেড়িবাঁধ নির্মাণের দুশ্চিন্তা নিয়ে সংগ্রাম করে যেতে হচ্ছে স্থানীয়দের। কাজের অভাব, সুপেয় পানির অভাব ও নানামুখী সংকটে আইলায় বিধ্বস্ত উপকূলীয় জনপদ ধীরে ধীরে মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠেছে! টিকতে না পেরে অনেকেই জীবনের তাগিদে অন্যত্র পাড়ি জমাচ্ছেন। এখনো শত শত পরিবার খুপরি ঘরে কোনো রকমে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

আইলা উপদ্রব বেশির ভাগ এলাকায় নেই কোনো কর্মসংস্থান, সুচিকিৎসা। লবণাক্ততার কারণে এলাকায় কৃষিকাজ নেই বললেই চলে! অনেক স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। অতি বেশি লবণাক্ততার কারণে ধীরে ধীরে বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ছে উপকূল। আইলা উপদ্রব এলাকায় পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে গত কয়েক বছরে ব্যাপকভিত্তিতে বেড়েছে ঘের বা চিংড়ি চাষ। এলাকায় অন্য সব কাজ বাদ দিয়ে যখন শুধু চিংড়ি চাষে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তখন স্থানীয়দের কাজও কমে যাচ্ছে। লবণাক্ততা মোকাবিলা করে কোনো কোনো এলাকায় ধান চাষ করা সম্ভব হলেও বেশির ভাগ জমিই রয়েছে অনাবাদি। অভাব-অনটন আর নানাবিধ সংকটে পড়ে এলাকায় বাড়ছে বাল্যবিবাহ-বহুবিবাহ, রোগ-শোক, অপুষ্টি, যৌতুকের কারবার, শিশুশ্রম ইত্যাদি। তথ্যমতে, দেশের উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার পর উপকূল এলাকার এসব বাঁধের অনেক জায়গা ভেসে গিয়েছিল, অনেক জায়গা প্রবল জোয়ারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল; সেসব ভেঙে যাওয়া অংশের অনেক জায়গা এখনো যথাযথভাবে মেরামত করা হয়নি। উচিত ছিল আইলার পর কয়রা, দাকোপ, আশাশুনি ও শ্যামনগরের ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ দ্রুত সময়ের মধ্যে মেরামত করা। কিন্তু সেটা না করে বিচ্ছিন্নভাবে কোনো কোনো স্থানে অস্থায়ীভাবে বেড়িবাঁধ সংস্কার করা হয়েছে। ফলে আইলা উপদ্রব এলাকার মানুষের জীবনের আতঙ্ক কাটেনি, জীবনের পরিবর্তন হয়নি।

সম্প্রতি আঘাত আনা ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’র কারণে উপকূল এলাকায় বেশ কিছু স্থানের বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করার ফলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উপকূলীয় বাঁধ স্থায়ীভাবে পুরোটা মেরামত না করলে দুর্যোগের সময় ক্ষতিগ্রস্ত যেকোনো স্থান দিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে ব্যাপক জানমালের ধ্বংস বয়ে আনতে পারে। আইলা উপদ্রব এলাকার মানুষরা পানির সঙ্গে বসবাস করলেও পান করার মতো পানি নেই। এলাকার সুপেয় পানির প্রধান উৎস পুকুর। আবার বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা থাকলেও তা খুব অল্প। অনেকদূর থেকে গ্রামের মানুষ পুকুর থেকে পানি সংগ্রহ করে কোনো রকমে চলছেন। তবে আইলার পর বিভিন্ন এনজিও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নলকূপ, পুকুরে ফিল্টার ও পানি বিশুদ্ধকরণের (পাতন প্রযুক্তি) ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু এখন এগুলো প্রায় অকেজো হয়ে গেছে। দক্ষিণাঞ্চলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লবণাক্ততা বেড়েই চলেছে। নদ-নদী, পুকুর, জলাশয়ে লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়ছে। মোটকথা, এখন যত দক্ষিণে প্রবেশ করা যাবে, ততই লবণাক্ততা বেশি পাওয়া যাবে। এখন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর নলকূপের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক পাওয়া যাচ্ছে। সাতক্ষীরা-খুলনার কোনো কোনো এলাকার নলকূপের পানিতে আর্সেনিক সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। আবার বহু পরিবার জেনেশুনে আর্সেনিকযুক্ত পানি খেতে বাধ্য হচ্ছেন! দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি যে সমস্যা সেটা হলো বিশুদ্ধ পানিপ্রাপ্তি। এখন পুকুর, জলাশয়গুলো দিনে দিনে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে এবং হচ্ছে।

আমার নিজের জন্মস্থান খুলনা। খুলনার পাইকগাছায় কপোতাক্ষ নদীর পাড়ে আমার বেড়ে ওঠা। বহু বছর ধরে আমাদের গ্রামসহ বহু গ্রামের মানুষ পুকুরের পানি খেত। বহু পুকুর-জলাশয় ছিল। এখন ধীরে ধীরে তা নষ্ট হয়ে গেছে। বেশির ভাগ নলকূপ আর্সেনিকযুক্ত! আবার পানির স্তর অনেক নিচে চলে যাওয়ায় নলকূপে পানিও পাওয়া যাচ্ছে না। এখন আমাদের গ্রামের মানুষ তো বটেই আশপাশের অনেক ইউনিয়নের মানুষের পানি কিনে খেতে হচ্ছে। লাখ লাখ টাকা খরচ করে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন গভীর ফিল্টার বসানো হয়েছে হাটবাজারের বহু স্থানে। এখান থেকে স্থানীয় মানুষ পানি কিনে খাচ্ছে। এভাবে পানি কিনে খেয়ে গ্রামের মানুষ কত দিন চলবে! দিনের পর দিন পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে! আইলা উপদ্রব এলাকাসহ উপকূলীয় এলাকায় পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে নতুন নতুন জলাধার সৃষ্টি করতে হবে। এলাকার পুকুরসহ সব ধরনের জলাশয় সংরক্ষণ করতে হবে। বৃষ্টির পানি ধরে তা ব্যবহারের অভ্যাস বাড়াতে হবে। আইলা উপদ্রব এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির প্রকল্পসহ বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে। টেকসই ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বেড়িবাঁধসংলগ্ন বৃক্ষ রোপণ তথা সামাজিক বনায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের এ পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় উপকূলীয় এলাকায় শক্তিশালী ও সুউচ্চ স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। যতদূর সম্ভব লোনাপানির চিংড়ি চাষ নিরুৎসাহিত করতে হবে। কেননা লবণ পানি লোকালয়ে না ঢুকলে ফসলও ভালো হবে, খাওয়ার পানিও পাওয়া যাবে।

লেখক : কলামিস্ট ও পরিবেশকর্মী

[email protected]

 

"