আন্তর্জাতিক

উত্তেজনার নেপথ্যে তেল-বাণিজ্য

প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৯, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

দ্য আরব নিউজের প্রথম পৃষ্ঠায় ইংরেজিতে প্রকাশিত সম্পাদকীয় কলামে বলা হয়েছে, আমেরিকান নিষেধাজ্ঞায় সঠিক বার্তাটি যায়নি। তাই এখন দরকার শক্ত হাতের আঘাত। যদিও এতে সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। তবে এটা যে ইরানকে লক্ষ্য করেই বলা হয়েছে, সেটা স্পষ্ট। আর শক্ত হাতে ইরানের ওপর আঘাত হানার জন্যই আমেরিকার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। আর এ শক্ত হাতের আঘাত বলতে সামরিক অভিযানকে বোঝানো হয়েছে। অন্যদিকে, আয়াতুল্লাহ খামেনি যতই বলেন না কেন, ইরান যুদ্ধের অনুসন্ধান করছে না, তা সত্ত্বেও তার সেনা কমান্ডার যুদ্ধের প্রস্তুতির কথাই বলেছেন। ইরানের কমান্ডার অব দ্য রেভ্যুলেশনারি গার্ডস ও দেশের সব মিলিটারি বাহিনীর নেতা মেজর জেনারেল হোসেইন সালামি বলেছেন, ইরান-আমেরিকার মধ্যে উত্তেজনা চরম পর্যায়ে, শত্রু এখন যুদ্ধ ক্ষেত্রে এসে গেছে। তাই তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অর্থাৎ ইরানও আমেরিকাকে সামরিকভাবেই জবাব দিতে প্রস্তুত। এ সময়কালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নানা অসত্য বাহানা তোলে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপ করেন এবং অতি সম্প্রতি ইরানের তেল বাণিজ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। এর জবাবে ইরানও জানিয়ে দিয়েছে, ইরানের তেল পরিবহনে বাধা সৃষ্টি করলে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেবে। এ নিয়ে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে তীব্র বাকবিতন্ডা চলছে, দেখা দিয়েছে উত্তেজনা।

কেননা, হরমুজ প্রণালি পূর্ব, পশ্চিম ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ও নৌ যোগাযোগের জন্য অপরিহার্য একটি রুট। হরমুজ প্রণালি ভারত মহাসাগরের সঙ্গে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সংযোগকারী সেতুবন্ধ। হরমুজের উত্তরে ইরান এবং দক্ষিণে ইউএই এবং ওমান। বিশ্বব্যাপী তেল পরিবহনে এককভাবে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব সর্বাধিক। প্রতিদিন বিশ্বব্যাপী যে পরিমাণ ক্রুডওয়েল যাতায়াত করে তার ৪০ শতাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করে। অন্যদিকে, কুয়েত, কাতার, ইরান ও বাহরাইনের সব তেল বাণিজ্য, সৌদি আরব ও ইরাকের তেল বাণিজ্যের ৯০ শতাংশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ৭৫ শতাংশ তেল বাণিজ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে সম্পন্ন হয়ে থাকে। অতএব অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ইরান যাতে কোনো প্রকার বাধার সৃষ্টি না করতে পারে, সেজন্য হরমুজের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং সেসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের আমেরিকান বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা বিধানের জন্য এ অঞ্চলে আধুনিক যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ও বি-৫২ বোমারুবিমানসহ অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা মিসাইল মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে মোতায়েনের আদেশ জারি করেন এবং সেটি তামিলও হয়ে গেছে সঙ্গে সঙ্গে। অদূর ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ১ লাখ ২০ হাজার সেনা মোতায়েনের ইচ্ছাও রয়েছে ট্রাম্পের। সামরিক সম্ভার গড়ে তোলা কিসের লক্ষণ বহন করছে, এটা প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

এদিকে সৌদি রাষ্ট্রীয় প্রেস এজেন্সির বরাতে প্রচারিত এক বার্তায় সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে। এ অপরাধমূলক কর্মকান্ড নিরাপত্তা ও মেরিটাইম বা নৌপথে চলাচলের ক্ষেত্রে মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। আরো বলা হয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যও এটা গুরুতর হুমকি। এরূপ অবস্থায় সৌদি এনার্জি মিনিস্টার খালিদ আল ফালিহ বলেছেন, এ ঘটনা নেভিগেশনের স্বাধীনতার জন্য বিপজ্জনক এবং তেল আমদানি-রফতানি বাণিজ্য নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়বে। ফলে সারা বিশ্বে তেল বাণিজ্যের ওপর প্রভাব পড়বে। যদিও ইরান এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় বলে দাবি করে আসছে, তা সত্ত্বেও আমেরিকা, সৌদি আরব বা তার বন্ধুরাষ্ট্রগুলো ইরানের দাবিকে তেমনভাবে আমল দিচ্ছে না। ফলে আরেক দফা সামরিক উত্তেজনা তীব্রতর হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, সৌদি আরব এবং আমেরিকার মধ্যে তীব্র সামরিক ও যুদ্ধ উত্তেজনা বিদ্যমান থাকাবস্থায়ই আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন আমেরিকা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চায় না। প্রেসিডেন্টের উক্ত ঘোষণায় বিশ্ববাসীর মধ্যে শান্তির প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠবে নাÑ এমন আশাবাদ ব্যক্ত করছেন শান্তিবাদী মানুষ। কারণ যুদ্ধ মানেই অশান্তি, রক্তপাত আর মানবসন্তানের নির্মম হত্যা, পঙ্গুত্ববরণ এবং স্থান থেকে স্থানে স্থানান্তরিত হওয়া, উদ্বাস্তু জীবনের অভিশাপ বহন করে জীবনযাত্রা নির্বাহ করা। তাই যুদ্ধে না জড়ানোর ঘোষণায় স্বাভাবিকভাবেই মানুষ খুশি হবে। তবে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে না জড়ানোর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষণা বিদ্যমান বাস্তবতার সঙ্গে কতটুকু সংগতিপূর্ণ, তা নিয়ে কথা উঠেছে অভিজ্ঞ মহলে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কতগুলো ঘটনার উল্লেখ করে রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা এ অভিমত পোষণ করেছেন।

যদিও আমেরিকা-ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ কৌশল নিয়েই এগিয়ে চলেছে এবং পরিপূর্ণ যুদ্ধ প্রস্তুতি সম্পন্ন করেই কোনো এক সুবিধাজনক সময়ে যেকোনো অজুহাতে ইরানের ওপর সামরিক আক্রমণ পরিচালনা করতে পারে। ২০১৫ সালে ইরান বনাম বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পাদিত পারমাণবিক চুক্তিকে ঐতিহাসিক এবং অসাধারণ ভালো একটা চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছিল জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র। এ চুক্তির ফলে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন ও মজুদকরণ হতে সরে আসবেÑ এমনটাই বিশ্বাস ছিল শান্তিবাদী মানুষদের মধ্যে। এ চুক্তি স্বাক্ষরকালে আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট ছিলেন বারাক ওবামা। এ চুক্তি সম্পাদনের মধ্যে আমেরিকার বড় ধরনের বিজয় দেখেছিলেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। ইত্যবসরে ২০১৬ সালে আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট পদ গ্রহণ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান প্রশ্নে সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামার একদম বিপরীত অবস্থান গ্রহণ করেন এবং ইরান ২০১৫ সালের চুক্তি মেনে চলছে না বলে অভিযোগ করে আমেরিকাকে ওই চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেন এক তরফাভাবে। যদিও চুক্তি স্বাক্ষরকারী অন্য বৃহৎ শক্তিগুলো ট্রাম্পের সঙ্গে একমত হতে পারেননি। ইরান চুক্তি মেনে চলছেÑ এমনটাই দাবি করছে রাশিয়া, চীন, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি এবং জাতিসংঘ। কাজেই এটা স্পষ্ট যে, ইরান সম্পর্কে ট্রাম্পের অভিযোগ সম্পূর্ণ বানোয়াট, অসত্য এবং উদ্দেশ্যমূলক। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো ইরান। এ দেশটিকে মোকাবিলা করার লক্ষ্যে তিনি ইরাকের আমেরিকান দূতাবাসে থাকা অপ্রয়োজনীয় কূটনীতিকদের নিজ দেশে তলব করেছেন। এটা যুদ্ধ প্রস্তুতির একটা অংশ।

অন্যদিকে, যুদ্ধ উত্তেজনার কারণে ডাচ ও জার্মানি ইরাকে তাদের সৈনিকদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাতিল করে দিয়েছে। যুদ্ধ ভীতিই এর কারণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। আমেরিকা এতসব প্রস্তুতি গ্রহণের পাশাপাশি ইরানকে উত্তেজিত করে যুদ্ধে জড়ানোর জন্যও নানা কৌশল গ্রহণ করে চলেছে। এসব কৌশলের অংশ হিসেবে আমেরিকা ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ‘ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি’কে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে। একটি বহিঃরাষ্ট্রের সরকারি সংস্থাকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা এই প্রথম। আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের ফরেন টেররিস্ট অর্গানাইজেশন তালিকায় অপর ৬৭ সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে আইআরজিসিও সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত হলো; যা ইরানের জন্য অবমাননাকর। ইরানের প্রতি আমেরিকার গৃহীত নানা পদক্ষেপই বিদ্বেষপূর্ণ এবং আক্রমণাত্মক, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ ধরনের আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ বা উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় তখন তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে আমেরিকা যুদ্ধ চায় না। এর জবাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও বলেছেন, আমরা যুদ্ধের অনুসন্ধান করছি না। দুপক্ষই যখন যুদ্ধের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন, তথাপি উত্তেজনা কমে আসেনি উপসাগরীয় অঞ্চলে এবং দেশ দুটির মধ্যে। একপক্ষ অন্যপক্ষকে হুমকি দিয়ে চলেছে। এ পাল্টাপাল্টি হুমকি সামরিক সংঘাতকে ত্বরান্বিত করছে। ইরান-আমেরিকা যুদ্ধে জড়িয়ে গেলে আমেরিকান বন্ধুরাষ্ট্র সৌদি আরব, ইসরায়েল আমেরিকার সমর্থনে এগিয়ে আসবে, তা প্রায় নিশ্চিত।

অন্যদিকে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী, ইরাকের শিয়া জঙ্গি, সিরিয়া প্রভৃতি ইরানের বন্ধুরাষ্ট্র ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইরানের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে যুুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে। অন্যদিকে রাশিয়া, চীন প্রভৃতি বন্ধুরাষ্ট্রও ইরানের পক্ষ সমর্থন জুগিয়ে যাবে। মোট কথা, যুদ্ধ যদি শুরু হয়ে যায় তবে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে এমনকি বিশ্বব্যবস্থাকে অস্থির, অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। যুদ্ধটি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং এতে পারমাণবিক অস্ত্রও ব্যবহার হতে পারে। কারণ ট্রাম্প বার কয়েক বলেছেন ইরানের অস্তিত্ব মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির জন্য বিপজ্জনক হুমকি। উত্তেজনাকর এ অবস্থায় গত সপ্তাহে ঘটে গেছে বিপর্যয়কর আরো একটি ঘটনা। চারটা তেলবাহী জাহাজ যার দুটি সৌদিয়ান, একটা নওয়েজিয়ান এবং একটা আমিরাতি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাতে অবস্থান করছিল; সেগুলোর ওপর সশস্ত্র আক্রমণ পরিচালনা করে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজের একটা তেল নিয়ে আমেরিকায় যাচ্ছিল। এই আক্রমণ কে বা কারা করেছিল, তা প্রথম জানা না গেলেও পরবর্তীতে সৌদি আরব দাবি করেছে ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ড্রোন আক্রমণেই জাহাজগুলো বিধ্বস্ত হয়েছে এবং এই ড্রোনগুলো সরবরাহ করেছে ইরান। কাজেই এই আক্রমণের জন্য ইরান দায়ী। কাজেই বাস্তবতা হলো, ইরান-আমেরিকা এখন যুদ্ধের মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে এবং যেকোনো সময় দেশ দুটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন বিশেষজ্ঞজনরা।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

raihan567@yahoo.com

 

"