মুক্তমত

অপমৃত্যু রোধ : সময়ের দাবি

প্রকাশ | ০৯ জুন ২০১৯, ০০:০০

রোকসানা রক্তি

বর্তমানে বাংলাদেশে একটা সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন ও নিরাপদ মৃত্যু মানুষের আরাধ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। নিরাপদ খাদ্যের জন্য আন্দোলন করতে হচ্ছে; ভেজালের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা যাচ্ছে না। এখন সর্বত্র মৃত্যুছায়া দেখা যাচ্ছে। রাস্তায় চলার সময় গাড়িচাপার ভয়, গাড়িতে উঠলে অ্যাক্সিডেন্টের ভয়। কখন আবার ছিনতাইকারীর চাকু বুকে-পিঠে ঢুকে, তাও ঠিক নেই। শহরে, বাসাবাড়ি, অফিস কোথাও স্বস্তি নেই।

সংবাদমাধ্যমে চোখ বুলালেই কোনো না কোনো অপমৃত্যুর সংবাদ, সড়ক দুর্ঘটনার খবর শুনতে পাওয়া যায়। খবরের কাগজের প্রথম পাতাতে বড় শিরোনামে অপমৃত্যুর সংবাদ ছাপানো হয়; পাশে নিহতের স্বজনদের বুক ফাঁটা আর্তনাদের ফটো। এসব খবর পড়ে আমাদের মনে শুধু খানিক দুঃখবোধ জাগে; এটা স্বভাবে পরিণত হয়েছে। আর গতানুগতিক সহমর্মিতা ও সমবেদনা প্রকাশ করাও আমাদের নিত্য কাজের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। দুর্ঘটনাকবলিত মানুষটি যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা স্কুল, কলেজ পড়ুয়া কেউ হয়, তা হলে তাদের মৃত্যুর পর বন্ধুবান্ধব এবং তাদের কলেজ, স্কুল কর্তৃপক্ষ মিলে হয়তো দু-একটি মানববন্ধন করে, সমবেদনা জানিয়ে শোকা-ব্যানার ঝোলায়; কিন্তু পরক্ষণেই আবার নতুন কোনো মৃত্যু সংবাদ ও শোকবার্তা প্রকাশের জন্য প্রস্তুত হতে হয়। প্রশ্ন হচ্ছেÑ এসব অপমৃত্যুর দায় কি এখানেই শেষ? বন্ধ হবে না এমন অপমৃত্যুর লীলা? মিলবে না কি কোনো বিচার? এমন অপঘাতের মৃত্যু রোধের জন্য কি বাড়ানো হবে না প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা? হয়তো হবে এক দিন, ততদিনে লাশের মিছিল অনেক লম্বা হয়ে যাবে।

সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার মধ্যে চকবাজার ট্র্যাজেডি, বনানীতে আগুন বড় ধরনের ঘটনা। কিন্তু এসব ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের পর আমরা কতটা সচেতন হয়েছি? বা ভবিষ্যতে এমন ভয়াবহ অগ্নিকান্ড মোকাবিলা করার জন্য কতটা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে? উত্তর হবে আমরা কাজ করছি। হয়তো করে ফেলেছি এমন সংবাদ সহসাই আসবে না। আরো মানুষ পুড়বে-মরবে; আরো কিছু বিলাপ হবে, পরে এক দিন হয়তো দেখা যাবে আমরা বৃত্ত থেকে কিছুটা সরেছি। বাংলাদেশের তথা উপমহাদেশের ইতিহাসে বড় একটি ছাত্র আন্দোলন হয় গত বছর। ঢাকার শহীদ রমিজউদ্দিন কলেজের দুজন শিক্ষার্থী বাসচাপায় নিহত হওয়ার পর ২৯ জুলাই থেকে সারা ঢাকা এবং পরদিন থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে শিক্ষার্থীরা সড়কে নেমে আসে এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করতে থাকে। একপর্যায়ে কোমলমতী শিক্ষার্থীরা সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নেয়। নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে আন্দোলন শেষ হয়। সরকার পক্ষ থেকে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, কিন্তু পূর্বে যা ছিল অবস্থা তার চে বেশি একটা উন্নতি হয়নি। সম্প্রতি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহমিদা এবং বিইউপি শিক্ষার্থী আরাফাতের দুর্ঘটনা এমনটাই প্রমাণ করে। এত আন্দোলন, কঠোর আইনের হুমকির পরও গাড়িচালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানো, অতিরিক্ত যাত্রী ওঠানো, কার্যকর ট্রাফিক পুলিশ ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতার অভাবে দিনের পর দিন সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েই চলছে।

সড়ক দুর্ঘটনার জন্য যে চালকরাই দায়ী এমন নয়; এজন্য আমাদের সড়ক পরিস্থিতির সার্বিক ব্যবস্থাই দায়ী। অসচেতন জনগণ, ট্রাফিক আইনের শিথিলতা, সেকেলে আইনি ব্যবস্থাÑ এসবই সড়কের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির জন্য অন্যতম কারণ। সড়কে উৎসবকেন্দ্রিক যাত্রায় মৃত্যুর মিলিছ একটা স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে গেছে। গত ১০ বছরে আমাদের অর্থনীতি, মানব উন্নয়ন সূচক ও সাক্ষরতার হারে ব্যাপক এগিয়েছি। কিন্তু মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা কমে গেছে। এসব সুরাহা না করে আমরা কীভাবে উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারি? আমাদের দেশে যদি অপমৃত্যু ও সড়ক দুর্ঘটনার কোনো সুরাহা না পাওয়া যায়, তা হলে যে উন্নয়ন হয়েছে তা ১৬ কোটি লোকের দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় কোনো অবদান নেই। এ সমস্যার সমাধান না করতে পারলে আমরা যে উন্নয়ন করতে পেরেছি, এর সুফল ভোগ করতে পারব না।

আমাদের দেশে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা ও প্রশাসন আগের তুলনায় অনেক উন্নতি লাভ করছে। কিন্তু বিরাট জনগণের এই দেশে সুবিধা-অসুবিধা দেখভালের জন্য এখনো সেটা প্রতুল নয়। এই অপ্রতুল অবস্থা অনেক দিনের, কিন্তু এর কোনো সুরাহা করতে পারেনি। এটা ব্যর্থতা। আমাদের রাষ্ট্রিক কাঠামোর এই যে অসুবিধা, এটা সুরহা করা আহামরি কোনো বিষয় নয়। প্রয়োজন আন্তরিকতার সঙ্গে সৎভাবে কর্মতৎপরতা চালানো। কিন্তু কর্তৃপক্ষের অবহেলায় হোক বা দক্ষতার কারণে হোক, আমাদের এই অঢেল সুযোগ পুরোমাত্রায় কাজে লাগানো হচ্ছে না। যার ফলে কিছুদিন পরপর ভয়াবহ অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে আর সে ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোটা দেশে এক বিশৃঙ্খল পরিবেশ নেমে আসছে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন তেমনি একটি ঘটনা। সড়কে উৎসবকেন্দ্রিক যেসব দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়; সেগুলো বন্ধ করতে হলে লোকাল পরিবহনগুলোকে দূরপাল্লার জন্য নিষিদ্ধ করে বিআরটিসি কর্তৃক নিবন্ধনকৃত যানবাহনগুলো চলাচলের ব্যবস্থা করলে সড়কে উৎসবকেন্দ্রিক বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা বেশ কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

 

"