বিশ্লেষণ

প্রত্যেক নাগরিকই হোক সম্পদ

প্রকাশ : ০৯ জুন ২০১৯, ০০:০০

আল-মাহমুদ

যেকোনো রাষ্ট্রের প্রাথমিক উপাদান ও পূর্বশর্ত হচ্ছে জনসমষ্টি। জনসমষ্টি ছাড়া কোনো রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। রাষ্ট্র গঠনের জন্য জনসমষ্টি একান্ত অপরিহার্য। সাধারণত রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। কেননা রাষ্ট্রের নাগরিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য জ্ঞানের ওপর রাষ্ট্রের কার্যক্রমের সফলতা ও ব্যর্থতা নির্ভর করে। নাগরিকের দেশপ্রেম, দেশের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃঢ়প্রত্যয় দেশকে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে দেয়। আবার অন্যদিকে আমাদের মতো আয়তনে ছোট্ট রাষ্ট্রের জন্য অতিরিক্ত জনসংখ্যা প্রধান ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিনিয়ত লাগামহীনভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি যেন দেশের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সরকারের সুপরিকল্পিতভাবে এগিয়ে চলা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার ফলে বেকারত্বের হার দিন দিন বাড়ছে। এর কারণে তরুণদের মধ্যে হতাশা-নিরাশার মেঘ স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। যেটা রাষ্ট্রের জন্য বড়ই উদ্বেগের বিষয়। এর পাশাপাশি শিশু মৃত্যুহার বৃদ্ধি, খাদ্যের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ, উপযুক্ত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতে না পারাটা রাষ্ট্রের জন্য বড়ই চিন্তার বিষয়। যে কারণে অনেকে এই বর্ধিত জনসংখ্যাকে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে অভিশাপ হিসেবে চিহ্নিত করছে। দেশের মোট আয়তনের তুলনাই অতিরিক্ত জনসংখ্যা হওয়ায় ঘনত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে প্রতি কিলোমিটারে হাজারেরও বেশি মানুষ বসবাস করে। সঙ্গে এই বর্ধিত জনসংখ্যার প্রয়োজনে নতুন আবাসস্থল তৈরির জন্য ফসলের জমিকে ব্যবহার করাই চাষযোগ্য জমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। শিক্ষা গ্রহণ না করায় নিরক্ষরতা ও মূর্খতা বাড়ছে। তরুণ ও যুবকসমাজ শিক্ষা নিলেও সীমিত কর্মসংস্থানের বিপরীতে বিরাটসংখ্যক চাকরিপ্রার্থী হওয়ায় অধিকাংশ তরুণ নিয়োগে ব্যর্থ হয়ে বেকারত্বের হার বাড়াচ্ছে। সম্প্রতি সময়ে কয়েকটি নিয়োগ পরীক্ষার দিকে দৃষ্টি দিলেই তা অনুধাবন করা যায়। বিসিএস, প্রাইমারি নিয়োগ পরীক্ষা কিংবা নিবন্ধন পরীক্ষা যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। চার লাখ চাকরিপ্রার্থী হতে চাকরি পাবেন মাত্র দুই হাজার অথবা চব্বিশ লাখ থেকে মাত্র কুড়ি হাজার। এ যেন সোনার হরিণ শিকার! শিকারে ব্যর্থ হওয়ার ফলে এসব শিক্ষিত তরুণ দেশের সম্পদের বিপরীতে অভিশাপে পরিণত হচ্ছে। হতাশায় নিমজ্জিত মানুষের সংখ্যা বেড়ে চলা যেন স্বাভাবিক ব্যাপার। ফলস্বরূপ সামাজিক অসমতা, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, সমাজে অন্যায়-অপকর্মের সীমা ছাড়িয়ে চলছে।

এসব সমস্যার সৃষ্টি যেন রাষ্ট্রের জন্য হুমকির বার্তা। সমস্যা সৃষ্টির জন্য দায়ী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও নিরক্ষরতা। আমাদের দেশের সাধারণ নিরক্ষর মানুষ সুপরিকল্পিতভাবে সন্তান নিতে অক্ষম। সুচিন্তিত পরিবার-পরিকল্পনা না থাকায় তারা সন্তানের ভবিষ্যৎ, সঙ্গে দেশের অবস্থা নিরূপণ না করেই কয়েকটি সন্তান নিতে দ্বিধা করেন না। বেঁচে থাকা ও খাদ্যের চিন্তা তারা সৃষ্টিকর্তার ওপর ছেড়ে দেয়। এভাবেই বর্তমান সময়ে বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বেড়ে চলা জনসংখ্যা।

কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ জনসমষ্টি। প্রতিটি সুনাগরিক রাষ্ট্রের বিরাট অংশ। বর্তমানে আদৌ কি সুনাগরিক তৈরি হচ্ছে? নাকি নাগরিক দেশের জন্য অভিশাপের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, এটাই চিন্তার বিষয়! এসব জনবল হতাশা ও নিরাশার চাদরে আয়ত্ত হয়ে ব্যক্তিজীবনে মাদকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পরিবার ও রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধন করছে। নিয়মিত খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ করে সমাজ ও রাষ্ট্রকে জিম্মি করছে। কিন্তু এই জনসমষ্টি তখনই রাষ্ট্রের জন্য সম্পদে পরিণত হবে, যখন এই বিশাল জনবলকে সুষ্ঠু ব্যবহার করা সম্ভব হবে। তাদের মধ্যে নতুনত্বের ধারণা প্রদান করা গেলে সমস্যা প্রশমিত করা সম্ভব হবে। তার জন্য প্রয়োজন ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা। তবে ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় সতর্কতা এসব সমস্যা সমাধানে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।

একজন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের প্রতি যেসব দায়িত্ব ও কর্তব্য থাকে, তা যথাযথ পালন করলে হতে পারে বড় পরিবর্তন। রাষ্ট্র যেমন নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার দিয়ে থাকে; তেমনি রাষ্ট্রের প্রতিও নাগরিকদের কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হয়। রাষ্ট্রের প্রতি শ্রদ্ধা, আনুগত্য প্রকাশের পাশাপাশি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণœ রাখা প্রত্যেকের দায়িত্ব। রাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব উদ্যোগে নানামুখী কর্মের সৃষ্টি করা সুনাগরিকের কর্তব্য এবং প্রত্যেকে কীভাবে একজন সফল নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের সম্পদে পরিণত হওয়া যায়; সে সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায় হতে কীভাবে রাষ্ট্রের এগিয়ে চলায় অবদান রাখা যায়; সে বিষয়েও অবহিত হতে হবে।

একজন নাগরিককে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত করতে সামাজিক কিছু দায়িত্ব আছে আমাদের প্রত্যেকেরই। জীবনমুখী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রেরণা জোগানো। যেখানে নিজের পাশাপাশি অন্যের কর্মসংস্থান সৃষ্টিও যেন সম্ভব হয়। চাপ প্রয়োগ না করে বাস্তবজীবনে প্রযুক্তির ব্যবহার করার মাধ্যমে নাগরিককে তার সৃজনশীল ক্ষমতার প্রকাশে সর্বাত্মক সাহায্য করতে হবে। এসব সামাজিক কাজ করার মাধ্যমে সুনাগরিক গড়া সম্ভব।

জনসমষ্টিকে কাজে লাগাতে রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। সুনাগরিক তৈরি কার্যক্রমের বহিঃপ্রকাশ কয়েকটি মাধ্যমে সম্ভব। যার মধ্যে শিক্ষা সুনাগরিক তৈরির সব থেকে বড় পদ্ধতি। শিক্ষাপ্রাপ্তির মাধ্যমে একজন নাগরিক সুনাগরিকে রূপান্তরিত হয়। এজন্য শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারকে সুপরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। আমাদের দেশে সাধারণত প্রাথমিক শিক্ষার গন্ডি থেকেই শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে সব থেকে বেশি, সে ক্ষেত্রে কারণ চিহ্নিত করে এর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষাকে আনন্দময় করে তোলা হলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষা অতীব প্রয়োজন। যেটা প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই বলবৎ করা যায়। শিক্ষিত জনবলের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে নিয়োগ দেওয়াও রাষ্ট্রের কার্যাবলির অন্তর্গত। সঙ্গে জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চার উপকরণ হিসেবে পর্যাপ্ত গবেষণাগার বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। যাতে নাগরিকরা তাদের সুপ্ত সৃজনশীল ক্ষমতা প্রকাশ করে রাষ্ট্রের অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

নাগরিকদের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারে উদ্বুদ্ধকরণ। সঙ্গে সঙ্গে যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও প্রয়োজন। যার ফলে তারা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে আউটসোর্সিং ও বিভিন্ন খাতে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রেরণা পায় এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে দেশের উন্নয়নে গর্বের অংশীদার হতে পারে। শিক্ষার পাশাপাশি নাগরিকদের রাজনৈতিক অধিকার প্রদানের মাধ্যমে সুষ্ঠু গণতন্ত্রচর্চার সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত। মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা, নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিভা প্রকাশের মাধ্যমেও একজন নাগরিককে অমূল্য সম্পদে পরিণত করা সম্ভব। যার ফলে দেশকে নেতৃত্ব প্রদানের মতো বিরাট স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছুক হয়।

পুরুষের পাশাপাশি নারীদের জন্যও ভাবতে হবে। দেশে নাগরিকের অর্ধেকাংশ যেহেতু নারী; সেহেতু তাদের নিয়ে পরিকল্পনা করাও আবশ্যক। নারীদের অবহেলার চোখে দেখলে জাতীয় অগ্রগতি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও যেন জাতীয় অগ্রগতিতে অবদান রাখতে পারে, সে সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ও সরকারের সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। সুন্দর হবে আমাদের ভবিষ্যৎ। সঙ্গে সঙ্গে শান্তিময় পরিবেশ দান করতে সক্ষম হব আমাদের নতুন প্রজন্মকে।

লেখক : কলামিস্ট

 

 

"