পর্যালোচনা

সর্বাত্মকবাদী শাসন ও গণতন্ত্র

প্রকাশ : ২৭ মে ২০১৯, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

বিশ্বের যেকোনো গণতন্ত্রকামী দেশে যদি গণতন্ত্রের ভিত শক্ত না হয় এবং ধারাবাহিক চর্চা না থাকে, তবে সে দেশে সুষম উন্নয়ন ও অগ্রগতি হয় না। একবার গণতন্ত্র, একবার স্বৈরতন্ত্র বা কর্তৃত্ববাদ নিয়ে দেশ পরিচালনা করলে তা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। আবার একই সরকার যদি পরপর ক্ষমতায় থাকে এবং একবার গণতান্ত্রিক মনোভাব নিয়ে দেশ শাসন করার পর পরেরবার কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে, তবে সে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া দুষ্কর। গণতন্ত্র সম্পর্কে জনগণ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। বুঝতে পারে না, তারা কোন তন্ত্রের মধ্যে আছে। গণতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র, কর্তৃত্ববাদÑ এই তিন ধারার মধ্য দিয়ে শাসনব্যবস্থা চলমান থাকায় জনমানসে বিভ্রান্তি দৃঢ় ভিত্তি লাভ করাই স্বাভাবিক। জনগণকে এ বিভ্রান্তি থেকে বের করে আনার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর। বিশেষ করে ক্ষমতায় যারা থাকে, তাদের দায়িত্ব বেশি। গণতন্ত্রের নামে কর্তৃত্ববাদ বা হাইব্রিড গণতন্ত্র কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। গণতন্ত্রের বিশ্বব্যাপী অধোগমনের জন্য ইউরোপের কতিপয় দেশে পপুলিস্ট বা লোকরঞ্জনবাদী আন্দোলনের উদ্ভব, অভিবাসন বিরোধী আন্দোলন, উগ্র শেতাঙ্গবাদী জাতীয়তার উদ্ভব ও বিকাশকে দায়ী করেছেন অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। অন্যদিকে, আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান, জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও বৈষম্যমূলক আবহ সৃষ্টি করা, রেসিয়াল বৈষম্য বৃদ্ধি, গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিগুলোর প্রতি ট্রাম্পের অনীহা প্রকাশ, বিশেষ করে ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি অস্বীকৃতি।

এমনকি স্বৈরতান্ত্রিক নীতির প্রতি ট্রাম্পের আগ্রহী হয়ে ওঠা অর্থাৎ রাশিয়ার পুতিন বা ফিলিপাইনসের দুতার্তের ন্যায় সব ক্ষমতা নিজের একক হাতে কেন্দ্রীভূত করণের ইচ্ছা থেকে আমেরিকান গণতন্ত্রের সৌন্দর্য, সব প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবজ্ঞা ও উপেক্ষা করার মানসিকতা, রাজনৈতিক বিদ্যমান সিস্টেম অবজ্ঞা করা, বিচার বিভাগ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা অস্বীকার করা এবং গণমাধ্যমকে জনগণের শত্রু হিসেবে অভিহিত করা ইত্যাদি বিষয় ট্রাম্পের গণতন্ত্রের প্রতি অনীহার প্রকাশ এবং এসব অবশ্যই আমেরিকার শত শত বছরের চলা অবাধ-মুক্ত সমাজের ধারণার পরিপন্থি। তার এসব পদক্ষেপ আমেরিকায় বিদ্যমান গণতন্ত্রের অপমৃত্যু ডেকে আনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর আমেরিকান নীতি-কৌশলগুলো বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করে থাকে। এসব দিক পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করে চিন্তাশীল সংগঠন ফ্রিডম হাউস মনে করে, সারা বিশ্বেই গণতন্ত্রের পতন বা মৃত্যু ঘটছে এবং অনেক রাষ্ট্রের স্বৈরতান্ত্রিক বা সর্বাত্মক বাদী শাসনব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছে। সমগ্র বিশ্বব্যবস্থায় গণতন্ত্র বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে। ১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী প্রায় তিন দশক ছিল গণতান্ত্রিক শাসনের জয়যাত্রা। গোটা কয়েক একনায়ক শাসিত রাষ্ট্র ব্যতীত ১৬৭ রাষ্ট্রেই গণতন্ত্রকে শাসন ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিলো। আর ২০১৮ সালের ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ডেমোক্রেসি ইনডেক্সে প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী সমগ্র বিশ্বব্যবস্থায় মাত্র ২০টি রাষ্ট্রে প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে বলে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, সুইডেনের গুতেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. আন্না লুহারমানের নেতৃত্বে ২ শতাধিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিশ্বের ১৭৮টি রাষ্ট্রের ওপর গবেষণা জরিপ পরিচালনা করে দেখেছেন গোটা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ বা ২.৬ বিলিয়ন মানুষ এমন দেশগুলোতে বসবাস করছেন; যেখানে গণতন্ত্র হুমকির মধ্যে আছে। অর্থাৎ এসব দেশে ক্রমান্বয়ে একনায়কতান্ত্রিক বা স্বৈরতান্ত্রিক শাসন জেঁকে বসেছে এবং গণতন্ত্র ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। ওই জরিপে আরো বলা হয়েছে, চল্লিশ বছরের রাজনীতির ইতিহাসে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের যে জয়জয়কার ছিল পশ্চিম ইউরোপ ও নর্থ আমেরিকায়, গত ছয় বছরে সেসব অঞ্চলে গণতন্ত্রের ধস নামতে শুরু করেছে এবং এমনকি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও গণতন্ত্র হুমকির মধ্যে পড়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শাসনে। এই জরিপে আরো তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ এমন সব দেশে বাস করছে যেখানে মহিলা, নি¤œ আয়ের মানুষ ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মানুষরা ক্ষমতা কাঠামোতে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়ে থাকে। অর্থাৎ জেন্ডার বৈষম্যের কারণে মহিলা, নৃতাত্ত্বিক সামাজিক গ্রুপ ও দরিদ্র মানুষরা অন্য বিত্তবানদের ন্যায় সমানভাবে রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদারত্ব ভোগ করার সুযোগ পায় না। মূলত ধনিক সম্প্রদায়ের লোকেরাই গোটা বিশ্বের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ভোগ ও নিয়ন্ত্রণ করে, যার সংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১.৯ বিলিয়ন বা কোয়ার্টার ভাগ।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি চারজনের একজন বা দুই বিলিয়ন মানুষ এমন সব রাষ্ট্রে বাস করে, যেগুলো অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ এবং ১০ বছর ধরে ওইসব রাষ্ট্রেই মূলত রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এ ব্যাপারে ড. লুহারমান বলেন, ওইসব দেশে দশক ধরে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মানুষের বাক স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন ক্রমবর্ধমানভাবে হুমকির মধ্যে পড়েছে। ফ্রি এবং ফেয়ার ইলেকশন শাসকদের নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়ছে বিধায় নির্বাচন ব্যবস্থা তাৎপর্যহীন হয়ে পড়েছে। পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাই অস্বচ্ছ এবং জনগণের কাছে অগ্রহণযোগ্য প্রতিপন্ন হচ্ছে। নির্বাচিত স্বৈরশাসকরা যেকোনোভাবে ক্ষমতা চিরস্থায়ীকরণের জন্য রাষ্ট্রীয় সব ক্ষমতা নিজ হাতে কেন্দ্রীভূতকরণ, বিচার ও আইন বিভাগের ওপর শাসন বিভাগের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সব ধরনের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অস্বীকার করে। নানাভাবে মিডিয়ার ওপর হস্তক্ষেপ করে। রাষ্ট্রীয় সক অফিসকে অন্যায্যভাবে ব্যবহার করে নিজেদের স্বৈরক্ষমতাকে স্থায়ী এবং নিরঙ্কুশ করার জন্য। নির্বাচনের মাধ্যমে পুনরায় যাতে সহজেই ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারে, সেজন্য নির্বাচন ব্যবস্থাটাকেই অস্বচ্ছ, অকেজো এবং গুরুত্বহীন করে ফেলে। ফলে ভোটার একটা পর্যায়ে ভোটাধিকার প্রয়োগে অনীহা প্রকাশ করেন। জনগণকে ভোটবিমুখ করাটা স্বৈরশাসকদের জন্য জরুরি এ কারণে যে, ফলে নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়ায় ভোট কারচুপি করা সহজসাধ্য হয়ে যায়, যা স্বৈরশাসকের বিজয় নিশ্চিত করে। ভোটার জনগণ ভোটকেন্দ্রে আসবে না, আবার একটা নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছে, সেটাও প্রচার করতে পারবেÑ এমন কৌশল গ্রহণ করে চলেছে বর্তমান যুগের নির্বাচিত স্বৈরশাসকরা। গণতন্ত্রের এই ক্রম অবনমন এবং দেশে দেশে নব্য স্বৈরতান্ত্রিক শাসকদের উত্থানের জন্য বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করা হয়।

উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক দুরবস্থা, অভিবাসন সংকট, বেকারত্বের হার বৃদ্ধি ইত্যাদি নানা অভ্যন্তরীণ সংকট এবং এসব জনজরুরি সংকট সমাধানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা, দুর্বলতা; যা জনগণের মধ্যে গণতন্ত্র সম্পর্কে বিরক্তিবোধের সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে কতিপয় স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শাসকদের মধ্যে প্রবল আত্মবিশ্বাস এবং এর প্রতি জনতুষ্টি সৃষ্টি করে জাতীয় অগ্রগতির মোহ তৈরি করা, যথাসম্ভব জনজীবনের সংকট মোচনে সাময়িকভাবে সফল হওয়া বা অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে, এই প্রচারণার দ্বারা জনগণকে তৃপ্তি দেওয়ার সক্ষমতার মধ্যেই স্বৈরশাসকরা গণতন্ত্রকে পরাস্ত করে প্রায় সফলতার সঙ্গে দেশ শাসন করে চলেছে এবং এসব শাসকের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে অন্যান্য দেশের নেতৃত্ব। ফলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চেয়ে অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। আর তৃতীয় হলো, ভূ-রাজনীতির পরিবর্তন, উন্নত গণতন্ত্র এবং তাদের বৈরী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভারসাম্যমূলক অবস্থান সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়ে থাকে। গণতন্ত্রের এই অধোযাত্রা এবং স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর ব্যাপক হারে উত্থানের সূচনা হয়েছিল ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দা থেকে। বিশেষ করে পশ্চিম ইউরোপের অর্থনৈতিক মন্দা তাদের দেশের জনগণকে অসন্তুষ্ট করে তুলেছিল গণতান্ত্রিক শাসনের প্রতি। কেননা, এসব উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও শাসকরা জনগণের অর্থনৈতিক সংকট, জীবনযাত্রায় সংকট, বেকারত্ব দূরীকরণ ইত্যাদি বিষয়ে দক্ষতার সঙ্গে সমাধান দিতে না পারায় জনজীবনে দুর্দশা নেমে আসে।

উদাহরণ হিসেবে রাশিয়ার পুতিন, ফিলিপাইনসের দুতার্তে, তুরস্কের এরদোয়ান, ভেনিজুয়েলা, ইকুয়েডর, হাঙ্গেরি, নিকারাগুয়া ইত্যাদি রাষ্ট্রের শাসকদের কথা বলা হয়েছে; যারা নির্বাচনে জিতে এসে স্বৈরশাসন কায়েম করেছেন, এসব দেশে গণতন্ত্র এখন মৃত। অর্থাৎ এরা ভোটের বাক্স ব্যবহার করে গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘটাচ্ছে। আরো উদাহরণ হিসেবে এ ক্ষেত্রে হাঙ্গেরির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। অর্থনৈতিক সংকটে থাকা দেশটিতে হঠাৎ করেই অভিবাসী আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া হলো। অথচ সিরীয় শরণার্থীরা হাঙ্গেরিকে শুধু জার্মানিতে পৌঁছানোর একটি রুট হিসেবেই নিয়েছিল। কিন্তু সেখানকার সেই সময়ের বিরোধী দল এই আতঙ্কটিকেই গ্রহণ করল সুযোগ হিসেবে। তুরস্কের ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা উদারবাদী অভিজাতদের নিয়ে শঙ্কিত ছিল। আর এ শঙ্কার পথ ধরেই উত্থান ঘটল এরদোয়ানের মতো কর্তৃত্ববাদী শাসকের।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"