মুক্তমত

প্রয়োজন দলিত উন্নয়ন বোর্ড

প্রকাশ : ২৩ মে ২০১৯, ০০:০০

প্রকৌশলী রিপন কুমার দাস

ভারতসহ অনেক দেশের দলিত ও অনগ্রসর (প্রান্তিক) জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য পৃথক দফতর রয়েছে। আমাদের দেশের দলিত ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য দলিত উন্নয়ন বোর্ড গঠন করা হয়নি। ফলে দেশের ৮০টিরও বেশি দলিত ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের সঠিক উন্নয়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লিখিত অনগ্রসর ও অনুন্নত ক্ষ ুদ্র নৃগোষ্ঠী, দলিত ও চা-বাগান শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে বিশেষ কোটা এবং সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখার জন্য দলিত উন্নয়ন বোর্ড গঠন করা প্রযোজন।

দেশে বর্তমানে ফেয়ার বাংলাদেশে জরিপ অনুযায়ী ৫৫ লাখ দলিত, ১৫ লাখ হরিজন ও অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ-এর জরিপ অনুযায়ী ৮ লাখ বেদে ও ১০ হাজার হিজড়া (রূপান্তরকামী) রয়েছে। প্রস্তাবিত দলিত উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ সব দলিত সম্প্রদায় অন্তর্ভুক্ত হবে। সব মিলিয়ে প্রায় ৭৮ লাখ জনগোষ্ঠী। প্রস্তাবিত ফাউন্ডেশনের মূল কাজ হলো সব সরকারি চাকরিতে কোটা সংরক্ষণ করা ও কোটা অনুযায়ী নিয়োগ প্রদান করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা। প্রায় ৯০ ভাগ দলিত শিশু স্কুলে ভর্তি হলেও দারিদ্র্য ও অস্পৃশতার কারণে প্রাথমিক স্তর থেকে ঝরে পড়ে, তাই দলিত ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের পৈতৃক পেশার ওপর আধুনিক কর্মমুখী শিক্ষার জন্য আবাসিক ভোকেশনাল স্কুল ও কলেজ স্থাপন করা প্রয়োজন। এ ছাড়া সব আবাসিক ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠানে একটি বিদেশি ভাষা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে এবং বোর্ড পরিচালিত আবাসিক ভোকেশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে তারা কারিগরি শিক্ষা, ধর্মীয় শিক্ষা ও বিদেশি ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে বোর্ডের আর্থিক ঋণের মাধ্যমে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যম দলিত ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা তাদের মেধা অনুযায়ী বৃত্তিমূলক শিক্ষায় প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর স্তর পর্যন্ত অধ্যয়নের সুযোগ পাবে। এ ছাড়া দলিত উন্নয়ন বোর্ড কর্মজীবী পুরুষ হোস্টেল, কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল, ছাত্রাবাস, চাকরির উপযুক্ত কোচিং (প্রমোশন) সেন্টার, পেশাগত ও উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির কোচিং (প্রমোশন) সেন্টার স্থাপন ও পরিচালনা করবে। যেহেতু দলিত ও শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে ইচ্ছুক নয়, কারণ তারা অল্প বয়সেই পৈতৃক পেশায় যুক্ত হয়, তাই উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশিপ প্রদান করবে ও আর্থিক দিক থেকে দুর্বল বিধায় দেশে-বিদেশে পেশাগত উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষাঋণ প্রদান করবে। দলিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য পৈতৃক পেশার আধুনিক অনুকরণে প্রজেক্ট ঋণের ব্যবস্থা করবে অর্থাৎ চর্মকারের সন্তানদের জন্য জুতার কারখানা স্থাপনের প্রজেক্ট ঋণ। দলিত ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯০ ভাগই ভূমিহীন। তাদের আবাসনের ব্যবস্থা করাও রাষ্ট্রের একটা জরুরি কাজ।

এ ক্ষেত্রে দলিত উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে দলিত জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারি খাসজমি বন্দোবস্তকরণ ও সরকারিভাবে আবাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া যেসব ভূমিতে দলিত জনগোষ্ঠী বসবাস করছে, তাহাদের বিকল্প স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ না করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও পেশাগত কারণে সব সময়ই ৩৬ ভাগ দলিত জ্বরসহ বিভিন্ন রোগব্যাধিতে ভোগে। কিন্তু সরকারি বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা ও কমিউনিটি ক্লিনিক থাকা সত্ত্বেও ২২ ভাগ মানুষ শুধু তাদের দলিত পরিচয়ের কারণে স্বাস্থ্যসেবায় অস্পৃশতার শিকার হয়ে থাকে। দলিত ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে যদি যথাযথ প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশের মূল স্রোতের সঙ্গে সংযুক্ত করা যায়, তা হলেই সম্ভব দেশকে উন্নয়নশীল থেকে উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে উল্লম্ফন ঘটানো।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

 

"