পর্যালোচনা

অপ্রাপ্তির আগুনে পুড়ছে কৃষক

প্রকাশ : ২৩ মে ২০১৯, ০০:০০

বিশ্বজিত রায়

ফলন ভালো হয়েছে। তাতে স্বাভাবিকভাবেই কৃষকের মন-মর্জি ভালো থাকার কথা। আর ভালো থাকবেই না বা কেন, এই সোনালি ফলন বিক্রি করেই তো সব স্বপ্ন পূরণ করবেন কৃষক। কেউবা বাঁধবেন ঘর, কেউবা দেবেন বিয়ে, কেউবা কিনবেন সম্পদ, কেউবা গড়বেন পুঁজি। কৃষকের এই ভাবনা ভরা স্বপ্ন আর আশা যে দুঃস্বপ্ন হতে চলেছে। সারা দিন কষ্ট করেও কেষ্ট মিলছে না কৃষকের ভাগ্যে। স্বপ্ন বাস্তবায়নে যে ধান গোলায় তুলেছেন কৃষক, সেই ধানই গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন খরচ থেকেও অনেক কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে কৃষকের সোনালি স্বপ্ন। এতে করে আজন্ম দুঃখসঙ্গী কৃষকের সুখ-স্বপ্ন অধরাই থেকে যাচ্ছে। এই ক্ষোভ সংবরণ করতে না পেরে ধান পাকা জমিনে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছেন কৃষক। এমন সংবাদ পত্রিকান্তরে ছাপা হয়েছে। আবার ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত কৃষকের হতাশার কথাও উঠে আসছে সংবাদ বিবরণীতে।

কৃষক কর্তৃক ধান পাকা জমিতে অগ্নিসংযোগের ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেছেন, ‘সরকারকে বিপর্যস্ত ও বিব্রত করতে একটি অশুভ চক্র কৃষকদের উসকানি দিয়ে সাবোটাজ করতে সম্প্রতি ধানে আগুন দিচ্ছে। চক্রটি গণমাধ্যম কর্মীদের সেখানে বিশেষ উদ্দেশে নিয়ে গিয়ে তা ফলাও করে প্রচার করেছে।’ [সূত্র : সমকাল, ১৫.০৫.১৯] আসলে কারো উসকানিতেই হোক আর স্ব-ইচ্ছায় হোক, যে অর্থেই কৃষক তার ধানিজমিতে আগুন লাগাক না কেন, কৃষক মনের প্রকৃত বাস্তবতাও তাই। কারণ প্রতিটি কৃষকের মনেই কষ্ট ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠছে। গায়ের ঘাম ঝরিয়ে অনেক অর্থ খরচ করে কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, তাতে কি তারা আনন্দ উদযাপন করবেন, না নীরব হয়ে ঘরে বসে থাকবেন? মন্ত্রী মহোদয়ের এই বক্তব্য কৃষক সম্প্রদায়কে আরো কষ্ট দিয়েছে।

ধানের কম দামে সর্বত্র সৃষ্টি হয়েছে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া। তা শুধু কৃষকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে এর ক্ষুব্ধ রেশ। ‘আমরা ছাত্র, কৃষকের সন্তান। কৃষকের খরচের চেয়ে ধানের দাম কম কেন’Ñ এ সেøাগান তুলে সোচ্চার হয়েছেন কৃষক সন্তানসহ বিশ্ববিদ্যালয়পড়–য়া উচ্চশিক্ষিতরাও। প্রতিবাদও উঠছে জোরেশোরে। এমন বক্তব্য এসেছে যে, ‘বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে হাঁটছে’-এই বক্তব্য আজ মিথ্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধানের দাম ১০ টাকা কেজি অথচ চাল ৬০ টাকা কেজি। তা হলে কৃষকের এই উৎপাদিত পণ্যের লাভ কারা নিচ্ছেন? দাম কম হওয়ায় গত ১৫ মে জয়পুরহাটে ধানে আগুন দিয়ে প্রতিবাদ করেছে ক্ষেতমজুর সমিতি। সারা দেশে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফরম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ দেশের ১৬টি স্থানে ধানের ন্যায্যমূল্যের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে। কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যেও মানববন্ধন করেছে তারা। প্রতিবাদ হয়েছে ভোলা, কুষ্টিয়া ও ময়মনসিংহে। নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরাও প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন। এই কষ্ট প্রতিক্রিয়া থামাতে হবে। সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, কৃষক যাতে ধানের ন্যায্যমূল্য পান।

হতাশাগ্রস্ত কৃষকের বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে পত্রিকান্তরে ঘন ঘন সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। সেখানে বঞ্চিত কৃষকের কথা লেখা হচ্ছে। খবরে প্রকাশ, ধান ঘরে তোলার আগেই ধাক্কা খেল কৃষক। এক মণ ধানের বিক্রয়মূল্য এখন ৫৫০ টাকা। আর এক মণ ধান কাটতে যে কৃষিশ্রমিক কাজ করবেন তার পারিশ্রমিক ৭০০ থেকে ৮৫০ টাকা। সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের মূল্য ১০৫০ টাকা নির্ধারণ করলেও এখনো তা সংগ্রহ অভিযান শুরু করতে পারেনি সরকারপক্ষ। বিভিন্ন জেলার কৃষকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৪৪০ থেকে ৬৫০ টাকা। কিন্তু জমিতে ধান রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, সার-কীটনাশক প্রয়োগ, ধান কাটা, মাড়াই ও ঘরে তোলায় প্রতি মণে খরচ হয়েছে অনেক বেশি। বাগেরহাটের এক কৃষক বলেন, ছয় বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছি। ৭০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। ৪৫০ টাকা করে ধান বিক্রি করলে আমার খরচের টাকা উঠে। কিন্তু ধান কাটা ও মাড়াইয়ের জন্য শ্রমিকদের টাকা বাড়ি থেকে এনে দিতে হবে। ধানের দাম এত কম থাকলে, ধান চাষ বন্ধ করে দিতে হবে। ১২ থেকে ১৫ টাকা কেজি ধান বিক্রি করে ৪৫ টাকায় চাল কিনে খেতে হয়। এমতাবস্থায় গত ১৩ মে বিকালে মনের প্রাপ্তিহীন কষ্ট মেটাতে টাঙ্গাইলের বাসাইলের কাশিল গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম খান তার বোরো ধানখেতে আগুন ধরিয়ে দেন। এর আগের দিন একই অঞ্চলের কালিহাতী উপজেলার বানকিনা গ্রামের আব্দুল মালেক তার পাকা ধানে আগুন দিয়ে ধানের দাম না পাওয়ার প্রতিবাদ জানান। এই প্রতিবাদের আগুন দেশের প্রায় প্রতিটি কৃষকের মনেই জ্বলে উঠছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না।

চলতি বোরো মৌসুমে ২৫ এপ্রিল থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত মোট ১২ লাখ ৫০ হাজার টন ধান-চাল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এর মধ্যে ১ লাখ ৫০ হাজার টন বোরো ধান (চালের আকারে ১ লাখ টন), ১০ লাখ টন সিদ্ধ চাল এবং ১ লাখ ৫০ হাজার টন আতপ চাল থাকবে। আর প্রতি কেজি বোরো ধানের সংগ্রহ মূল্য ২৬ টাকা অর্থাৎ মণপ্রতি দাম হয় ১ হাজার ৪০ টাকা, প্রতি কেজি সিদ্ধ চালের দাম ৩৬ টাকা এবং আতপ চালের দাম ৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু ২৫ এপ্রিল থেকে সংগ্রহ অভিযান শুরুর দিনক্ষণ চূড়ান্ত থাকলেও অনেক এলাকায় চালুই হয়নি সরকারি এ কার্যক্রম। কিছু কিছু এলাকায় সংগ্রহের কাজ শুরু হলেও গতি নেই তেমন। মাঠপর্যায়ে রয়েছে নানা অনিয়মের অভিযোগও। কোথাও কোথাও চলছে ছলচাতুরী আর টালবাহানা। অনেক চাষির রয়েছে ধারদেনা পরিশোধের তাড়া। তাই অভাবী চাষি কম দামে ফড়িয়া-দালালদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন কষ্টে ফলানো সোনার ধান।

ফলন ঘরে উঠেছে। বিআর-২৮ বাদ দিলে অন্য সব ধানে আশাজাগানিয়া উৎপাদন হয়েছে। প্রকৃতি অনুকূলে থাকায় অনেকটা স্বাচ্ছন্দ্যমতোই কৃষক ঘরে তুলেছেন সোনালি ফসল। তবে হাওরে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে শ্রমিক সংকট। ধান কাটাতে গিয়ে কৃষক শ্রমিকপ্রতি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা মায়না পরিশোধসহ মাড়াই ও ধান আনা বাবদ যে টাকা খরচ হয়েছে, তাতে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন কৃষক। এর মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে মূল্য সংকট। এত কষ্ট, অর্থ খরচ করেও ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাওরের অগণিত কৃষক। বর্তমান বাজারে ধানের যে মূল্য আছে, তাতে ধান কাটতে ও আনতে খরচ করা অর্থই উঠছে না। ঋণ পরিশোধসহ পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ জুগাতে অনেক কৃষকই অল্প দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

সরকার ধান-চাল সংগ্রহের দিনক্ষণ ও মূল্য নির্ধারণ করলেও তা কৃষকের কোনো উপকারে আসছে না। বরং উপকৃত হচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। একদিকে সরকার মূল্য ও সময় নির্ধারণ করে দায় সেরে নিচ্ছে; অন্যদিকে সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে ফঁড়িয়াবাজ গোষ্ঠীকে। মাঝপথে কৃষকের স্বার্থ হচ্ছে জলাঞ্জলি। খবরে বলা হয়, ধানের দাম কম হওয়ার পেছনে বিভিন্ন জায়গায় মজুদদার ও মিল মালিকদের কারসাজি দেখছেন কৃষক ও বিশেষজ্ঞরা। সেই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে ধান-চাল সংগ্রহের প্রক্রিয়াগত ত্রুটি দ্রুত সংস্কার করার দাবিও জানাচ্ছে তারা। বিশেষ করে চাল সংগ্রহের নামে মিলার-ডিলারদের মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীদের সুযোগ করে দেওয়ার পদ্ধতি বাদ দিয়ে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান-চাল কেনার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সেটি না হলে সরকারের এ কার্যক্রম সফল হবে না। চলতি বোরো মৌসুমে এখনো সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ হয়নি মোটেই। বরং কৃষক তাদের অসহায়ত্বের প্রকাশ ঘটিয়েছেন নানাভাবে। মাঠপর্যায়ে খাদ্য কর্মকর্তারাও ধান সংগ্রহে অনেকটা নির্লিপ্ত বলে অভিযোগ আছে। [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ১৫.০৫.১৯] বিভিন্নভাবে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এগুলো দেখার কেউ নেই। নির্মম নিয়তির কাছে কৃষক সর্বদাই পরাজিত হচ্ছেন।

কৃষিতে নির্ভরশীল অধিকাংশ কৃষক ফসল ঘরে তোলার পর সেই ধানে খাদ্য খোড়াক এবং তা বিক্রি করে পরিবারের খরচ মেটানোসহ আয়ের অনুষঙ্গ খোঁজে থাকে হাওর পারের মানুষ। এখানকার বেশির ভাগ কৃষক ধার-কর্জ করে কৃষিকাজ এগিয়ে নিয়ে পরবর্তীতে ফলন তুলে সেই ঋণ পরিশোধ এবং সঞ্চয়ের স্বপ্ন দেখলেও ধানের দরে ন্যায্যহীনতা লাখও কৃষক পরিবারকে পথে বসাবে। ধানের এই মূল্য অসন্তুষ্টি গোটা হাওরে কষ্টচাপা চরম বাস্তবতার জন্ম দিচ্ছে। প্রকৃতি ও দুর্নীতির করালগ্রাসে নতজানু কৃষক মূল্য সংকটের অমীমাংসিত যন্ত্রণায় ভুগছেন। হাওরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে মূল্য অপ্রাপ্তির রেশ। কৃষকের মাঝে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ। কৃষিবান্ধব তকমাধারী বর্তমান সরকারের কৃষকবৈরী আচরণ নানা প্রশ্নের উদ্রেক ঘটাচ্ছে। বলা হচ্ছে, শ্রমে ঘামে ও অঢেল অর্থ খরচায় ফলন ফলিয়ে কৃষককে কেন মূল্যহীনতার আগুনে পুড়তে হচ্ছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার অন্যতম কারিগর কৃষক সম্প্রদায়ের প্রতি এই খামখেয়ালিপনা প্রকৃতিবৈরিতার মতোই পাকা ধানে মই দেওয়া নয় কি!

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"