মতামত

জাকাত, ফিতরা ও দান

প্রকাশ : ২২ মে ২০১৯, ০০:০০

মো. আবু তালহা তারীফ

ইসলামের মৌলিক রোকন ও প্রধান আর্থিক ইবাদত হলো জাকাত। জাকাতের ওপরই ইসলামী রাষ্ট্রের অর্থব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে উঠেছে। জাকাত ধনী ও দরিদ্রের মাঝে অর্থনৈতিক সেতুবন্ধ রচনা করে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘জাকাত হলো ইসলামের (ধনী-গরিবের মধ্যকার) সেতুবন্ধ’। (তাবরানি)। জাকাত শব্দের অর্থ জবাই করা, প্রশংসা, প্রাচুর্য ও পবিত্রতা। সুফিয়ান সাওরী (রহ.) বলেন, স্বীয় মালিকানাধীন সম্পত্তি হতে প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট অংশ শরিয়তের নির্দেশানুপাতে বের করে দেওয়াকে জাকাত বলা হয়। মহান আল্লাহতায়ালা নিসাব পরিমাণ সম্পত্তি যার কাছে রয়েছে তাকে জাকাত দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা নামাজের সঙ্গে পবিত্র কোরআনে অসংখ্য জায়গায় জাকাত দেওয়ার কথা উল্লেথ করেছেন। মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা নামাজ প্রতিষ্ঠা কর, জাকাত প্রদান কর এবং রুকুকারীদের সঙ্গে রুকু করো’। (বাকারা-৪৩)।

ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে সবার ওপর জাকাত ফরজ করা হয়নি। জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য নয়টি শর্ত রয়েছে। সে গুলো হলোÑ ১. মুসলিম হওয়া ২. জ্ঞানবান হওয়া ৩. স্বাধীন হওয়া ৪. প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া ৫. ঋণমুক্ত হওয়া ৬. নেসাবের মালিক হওয়া ৭. মালিকানায় এক বছর থাকা ৮. সম্পদ মৌলিক প্রয়োজনীয় না হওয়া ৯. সম্পদ প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যভাবে বর্ধনশীল হওয়া, যেমন পশু, স্বর্ণ, রোপ্য ইত্যাদি। (আনওয়ারুল কোরআন)। আবার সব ধরনের সম্পদের ওপর জাকাত ফরজ নহে। জাকাত ৫ ধরনের সম্পদে ফরজ : যেমনÑ ১. গৃহপালিত পশু, ২. স্বর্ণ-রৌপ্য বা নগদ ক্যাশ, ৩. ব্যবসায়ের পণ্য, ৪. খনিজ সম্পদ, ৫. ফল ও ফসল।

যে পরিমাণ সম্পদ থাকলে যে পরিমাণ জাকাত দিতে হবেÑ ১. অর্থ সম্পদ ব্যবসায়িক সম্পদের জাকাত শতকরা আড়াই টাকা হারে। ২. জমিতে উৎপন্ন ফসলের জাকাত পানি সেচের প্রয়োজন না হলে ১০ ভাগের ১ ভাগ এবং পানি সেচের প্রয়োজন হলে ২০ ভাগের ১ ভাগ। ৩. স্বর্ণের নিসাব সাড়ে সাত ভরি এবং রৌপ্যের নিসাব সাড়ে বায়ান্ন ভরি। ৪. গরুর নিসাব ৩০টিতে ১টি বাছুর, ছাগলের নিসাব ৪০টিতে ১টি ছাগল এবং উটের নেসাব ৫টিতে ১টি উট ৫. মাটির তলদেশ থেকে খনিজ সম্পদে পাঁচ ভাগের ১ ভাগ।

জাকাত আদায় করলে সম্পদ পবিত্র হয় এবং সম্পদে বরকত হয়। জাকাত আদায় করলে সম্পদ বৃদ্ধি হয়ে থাকে, সম্পদ কখনো কমে যায় না। মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যাতে মানুষের ধন-সম্পদ বৃদ্ধি পায়, সেজন্য তোমরা যে সুদ দিয়ে থাক আল্লাহর দৃষ্টিতে তা ধনসম্পদ বৃদ্ধি করে না। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য তোমরা যে জাকাত দিয়ে থাক, তাই বর্ধিত হয়’। (সুরা রুম-৩৯)।

যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর জন্য তার নির্দিষ্ট সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ জাকাত দেবে তাহার জন্য মহান আল্লাহতায়ালা পুুরস্কারের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা ইমান আনে এবং সৎকর্ম করে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত দেয়, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট রয়েছে পুরস্কার। (বাকারা-২৭৭)।

যারা স্বর্ণ-রুপা টাকা-পয়সা সঞ্চয় করে রাখে, কিন্তু অল্লাহর রাস্তায় সংগ্রহ করে না, তাদের জন্য জাহান্নামে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা স্বর্ণ, রুপা, টাকা সঞ্চয় করে রাখে, আল্লাহর রাস্তায় সেটা ব্যয় করে না, তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও’। (সুরা তাওবা-৩৫)।

কৃপণ ও লোভী ব্যক্তি জাকাত প্রদান করতে পারে না। লোভ ও কৃপণতা মানুষের আন্তরাত্মাকে সংকীর্ণ সংকুচিত করে দেয়। পক্ষান্তরে জাকাত মানুষের সংকীর্ণতাকে ধুয়ে-মুছে পরিচ্ছন্ন করে দেয় আর তার অন্তরকে করে দেয় মুক্ত মহান। আর যারা কৃপণতা ও সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হতে পারবে, তারাই সফলকাম মানুষ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা মনের সংকীর্ণতা হতে মুক্ত হতে পারবে তারাই কল্যাণ লাভ করবে’। (সুরা হাশর-৯)। এখানে মনে করে দেওয়া জরুরি যে, ‘জাকাত ধনী পক্ষ থেকে দান বা অনুগ্রহ নয়। বরং জাকাত পরিশোধ করা বিত্তবানদের অপরিহার্য কর্তব্য বা ফরজ। আল্লাহতায়ালা নিজেই জাকাতকে ধনীদের সম্পদে অসহায় ও বঞ্চিতদের অধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, আর তার ধনদৌলতে বঞ্চিত ও প্রার্থীদের অধিকার রয়েছে’। (সুরা জারিয়াত-১৯)

ফিতরা আরবি শব্দ। জাকাতুল ফিতর বলা হয় ঈদুল ফিতর উপলক্ষে গরিব দুস্থদের মাঝে রোজাদারকে বিতরণ করা দানকে। নারী-পুরুষ স্বাধীন-পরাধীন শিশু-বৃদ্ধ সব মুসলমানের জন্য ফিতরা প্রদান করা ওয়াজিব। ইবনে উমর (রা.), রাসুল (সা.) প্রত্যেক স্বাধীন ক্রীতদাস নারী-পুরুষ ছোট-বড় মুসলমানদের জাকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন। তিনি লোকদের ঈদের নামাজে বের হওয়ার আগেই তা আদায় করার আদেশ দিয়েছেন। (বুখারি ও মুসলিম)।

ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক আটা, খেজুর, কিশমিশ, পনির ও যব ইত্যাদি পণ্যের যেকোনো একটি দ্বারা ফিতরা প্রদান করা যায়। আটা দ্বারা ফিতরা আদায় করলে অর্ধ সা বা ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম বা এর বর্তমান সর্বোচ্চ বাজারমূল্য ৭০ টাকা প্রদান করতে হবে। যব দ্বারা আদায় করলে এক সা বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বর্তমান সর্বোচ্চ বাজারমূল্য ৫০০ টাকা, কিশমিশ দ্বারা আদায় করলে এক সা বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বর্তমান সর্বোচ্চ বাজারমূল্য ১৩২০ টাকা, খেজুর দ্বারা আদায় করলে এক সা বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর সর্বোচ্চ বাজারমূল্য ১৯৮০ টাকা, পনির দ্বারা আদায় করলে এক সা বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বর্তমান সর্বোচ্চ বাজারমূল্য ২৩১০ টাকা ফিতরা প্রদান করতে হবে। দেশের সব বিভাগ থেকে সংগৃহীত আটা, যব, খেজুর, কিশমিশ ও পনির সর্বোচ্চ বাজারমূল্যের ভিত্তিতে উপযুক্ত নির্ধারণ করা যাবে। ইসলামে যাদের জাকাত দেওয়া যাবে, তাদের ফিতরাও দেওয়া যাবে। পবিত্র কোরআনে জাকাত বণ্টনের আটটি খাতের বর্ণনা করা হয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘সদকা (জাকাত) কেবল ফকির, মিসকিন, জাকাত আদায়ের কর্মচারী যাদের চিত্তাকর্ষণ করা প্রয়োজন তাদের জন্য এবং দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে সংগ্রামকারী ও মুশাফিরদের জন্য। এটা মহান আল্লাহতায়ালার নির্ধারিত বিধান। আর আল্লাহতায়ালা সর্বজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা তাওবা-৬০)।

ঈদুল ফিতরের নামাজের আগে যেহেতু ফিতরা আদায় করতে হয়, তাই উচিত মাহে রমজানুল মোবারকে তা আদায় করে অশেষ সাওয়াব হাসিল করা। কেননা এই মাসে একটি নফল ইবাদতের মূল্য অন্য মাসের একটি ফরজ ইবাদতের সমান। একটি ফরজ ইবাদত পালন করলে সত্তরটি ফরজ ইবাদতের সমান। রাসুল (সা.) বলেন, ‘রমজান মাসের একটি ফরজ ইবাদতের ফজিলত অন্য মাসের সত্তরটি ফরজের সমতুল্য। আর এ মাসের একটি নফল ইবাদতের মূল্য অন্য মাসের একটি ফরজ ইবাদতের সমান।’ (বায়হাকি শরিফ)।

জাকাত, ফিতরা বা দান প্রকাশ্য দেওয়ার চেয়ে গোপনে দেওয়া উত্তম। গোপনে জাকাত, ফিতরা বা দান আদায় করলে কখনো নিজের মধ্যে অহংকার তৈরি হয় না আর ফিতরা বা দানগ্রহীতা ব্যক্তির মনমানসিকতা নিচু হয় না। পবিত্র কোরআনে প্রকাশ্য ও গোপনে উভয়ই দান করার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু পবিত্র কোরআনে অধিকাংশ জায়গায় গোপনে দান করার কথা বলা হয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমরা যদি প্রকাশ্য দান কর তা হলে তা ভালো আর যদি গোপনে কর এবং অভাবীকে দাও, তা হলে তোমাদের জন্য আরো ভালো এজন্য তিনি আল্লাহ তোমাদের কিছু পাপ মোচন করবেন। (সুরা বাকারা-২৭০-২৭১)।

বর্তমানে দেখা যায়, ধনী ব্যক্তি মাইকিং করে সবাইকে একত্র করে কাপড়ের ওপর নিজের নাম লিখে কাপড় গরিবদের দান-সদকা দিয়ে থাকে। সেই ধনী ব্যক্তির দান-সদকা নেওয়ার জন্য জাকাত আনার জন্য অনেক গরিব-অসহায় মানুষ দীর্ঘ লাইনের মধ্যে দাঁড়িয়ে অনেক কষ্ট-ক্লেশ করে মাত্র একটি কাপড় নিয়ে আসে, অনেকে আবার না পেয়ে শূন্য হাতে ফিরে আসে। দান-সদকা এভাবে দেওয়া ঠিক নহে। নিজের দান নিজে গরিব-আসহায় ব্যক্তির কাছে গিয়ে দেওয়া উত্তম। জাকাত-ফিতরা দান করা হলো, যার কিছু নাই তাকেই তো স্বাবলম্বী করা। জাকাত গরিবের অধিকার। জাকাত গরিবকে যতটুকু দেবে, ততটুকু আল্লাহর কাছে নেকি পাবে। জাকাত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর রেজামন্দি হাসিল করা যায়। মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা নামাজ প্রতিষ্ঠা করো এবং জাকাত দাও। তোমরা নিজের জন্য পূর্বে যে সৎকর্ম প্রেরণ করবে, তা আল্লাহর কাছে পাবে। তোমরা যা কিছু করো নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যক্ষকারী’। (বাকারা-১১০)।

লেখক : খতিব, রোহিতপুর বোডিং মার্কেট

জামে মসজিদ, ঢাকা

 

"