মুক্তমত

অভাবে নয় স্বভাবে

প্রকাশ : ১৭ মে ২০১৯, ০০:০০

অলোক আচার্য

একটা কৌতুক দিয়ে শুরু করি। বড় পদের কর্মকর্তা গিয়েছেন কোনো এক দাওয়াতে। সেখানে বহু পদের খাবার থাকা সত্ত্বেও তিনি কোনোটাই তৃপ্তি করে খেতে পারছেন না। কারণ ডায়াবেটিস, হাই ব্লাডপ্রেসারÑ এসব আভিজাতিক রোগে বেচারা ভারাক্রান্ত। তো অতিথিকে রুচিসম্পন্নভাবে খেতে না দেখে বাড়ির কর্তা জানতে চাইলেন তিনি তা হলে কী খান? বেচারা কোনো জবাব না দিলেও পাশ থেকে কেউ একজন বলে উঠেন, উনি তো কেবল ঘুষই খান! সত্য বাক্য উচ্চারণকারীর ভাগ্যে কি ঘটেছিল, তা জানা যায়নি। অনেকেই আছেন সত্যিকার অর্থেই তেমন কিছুই খেতে না পারলেও ঘুষ খান।

ঘুষ কী! ঘুষ হলো পরিশ্রমের প্রাপ্যর বাইরের সেই আয়; যা আমরা অনৈতিকভাবে উপার্জন করি। একজন ভিক্ষুক সরাসরি মানুষের কাছ থেকে হাত পেতে তার দয়া প্রার্থনা করে। আর ঘুষখোর তো রীতিমতো জিম্মি করে অতিরিক্ত টাকা আদায় করেন। ভিক্ষাবৃত্তি কেউ স্বাভাবিকভাবে নেয় না। এটিও অপরাধ এবং অসম্মানের মধ্যে পড়ে। তবে ঘুষ খাওয়া আরো বড় মাপের অপরাধ এবং বেশি অসম্মানের। ভিক্ষুকের ভেতরে হয়তো কোনো শিক্ষার আলো নেই, কিন্তু যে ঘুষ নেয়, তাদের অধিকাংশের শিক্ষা রয়েছে এবং তারা রীতিমতো দামি দামি চেয়ারে বসে সেই অনৈতিক টাকা গ্রহণ করেন।

ঘুষখোর শব্দটির চরিত্রের সঙ্গে নেশাখোর শব্দের বেশ মিল পাওয়া যায়। মাদকে যেমন নেশা হয়, ঘুষেও নেশা আছে। তবে মাদকের নেশার চেয়েও তা ভয়ংকর। মাদকের নেশা অনেক সময় মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে ছাড়িয়ে আনা যায়, কিন্তু ঘুষের নেশা কেউ ছাড়তে পেরেছে বলে যায়নি। চাকরির মাত্র কয়েক বছরেই একজন বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়েছেন। তিনি নাকি বেতনের বাইরে বেশ মোটা আয় করেন। এই আয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘উপঢৌকন’ পাই। এটা তার প্রাপ্য। ‘এই পেয়ে থাকি’ কথাটা আজকাল বেশ সস্তা হয়ে গেলেও এই পেয়ে থাকি কর্তাদের দৌরাত্ম্য অনেক। বেতন দ্বিগুণ করার পরেও ক্ষুধা কমেনি। বরং লাগামহীনভাবে বেড়েছে।

ঘুষ কি অভাবে খায়। অভাবে খায় না, খায় স্বভাবে। একবার লজ্জা ভেঙে গেলেই হলো। হাত পাততে আর লজ্জা লাগে না। তাই বেতন বাড়ার পরও অনৈতিক আয়ের চর্চা দেশ থেকে উঠে যায়নি। যারা দিন-রাত ঘুষের টাকার জন্য হাত পেতে থাকতেন, তারা তাদের হাত গুটিয়ে নেননি। বরং হাতটাকে আরো একটু লম্বা করেছেন। সেই রাশিয়ান গল্পের কথা মনে পড়ে। শয়তান মানুষের বেশে লোভী মানুষটিকে বলেছিল সূর্যাস্ত পর্যন্ত দৌড়ে আবার এখানে ফিরে আসতে পারলে যতটুকু পরিভ্রমণ করবে, সে জমি তোমার। শেষ পর্যন্ত লোভী মানুষটি বহুদূর দৌড়েছিল বটে! ফিরে আসতে পারেনি। ফিরে আসার আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল।

সকালে আজকাল অনেকেই দুই পিস রুটিই খান। কেউ কেউ আবার তেমন কিছুই খান না। কিন্তু অফিসে বসে ঘুষের টাকা ঠিকই হজম করেন। এ ক্ষেত্রে হজমের কোনো সমস্যা হয় না। এমনিতে অন্য টাকার সঙ্গে ঘুষের টাকার কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্য কেবল আয়ের মাধ্যমের ভিন্নতায়। ঘুষ মানেই দুর্নীতি। আর এই ঘুষ বাণিজ্য আজ একেবারে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করে আছে। ঘুষের টাকা না পাওয়ার জন্য দিনের পর দিন সব কাগজপত্র ঠিক থাকা সত্ত্বেও ফাইল আটকে থাকে। অপরদিকে ওপরি দেওয়ার জন্য অনেক কাগজপত্র ঠিক না থাকা ফাইল বুলেট ট্রেনের গতিতে টেবিল ছাড়া হয়ে যায়। ঘুষের কি ক্ষমতা! ক্ষমতা তো অবশ্যই। যার ক্ষমতা আছে, সেই তো ঘুষ খায়! ঘুষ খেতেও তো সাহসের দরকার হয়। তবে সেটা সৎ সাহস, না অসৎ সাহস, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের চোখের সামনেই আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাওয়া ঘুষখোর ব্যক্তির দেখা মেলে। আমরা বিষয়টা নিয়ে অন্যত্র সমালোচনা করলেও প্রকাশ্যে করি না। কারণ তার ক্ষমতার কাছে আমরা পরাজিত। সমাজে ঘুষখোররা আবার বেশ ক্ষমতাবানও বটে। ঘুষ তো একা খান না। ওপরের দিকেও চালান দিতে হয়। ঘুষ লেনদেনের বিষয়টা যেন আজ একটা সিস্টেমে পরিণত হয়েছে।

এটা পেতে পেতে এমন অবস্থা হয়ে গেছে যে, না পেলেই মনে হয় তার পাওনাটা কেউ দেয়নি। চাকরিপ্রার্থীকে চাকরি পেতে হলে যে মামার জোর থাকতে হয়ম তা আজ ওপেন সিক্রেট। অর্থ সক্ষমতা না থাকার জন্য কত মেধাবী তার যোগ্যতা দেখানোর সুযোগ পাননি তার হিসাব কে রাখে। অনেকেই বলে থাকেন, সোনার বাংলা গড়তে হলে, দেশের প্রান্তিক মানুষকে উন্নয়নের স্বাদ দিতে হলে এই ঘুষ বাণিজ্যের লাগাম টেনে ধরতে হবে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে এসব ঘুষ বাণিজ্য যারা করছেন সেসব রাঘববোয়ালকে প্রথমে ধরতে হবে। একজন দুজন নয় প্রতিটি সেক্টরের দুর্নীতিবাজদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তা হলে নিচের স্তরের ঘুষ বাণিজ্য থেমে যাবে। এ কাজ যে কেবল সরকারের তা ভেবে বসে থাকার উপায় নেই। নিজের জায়গা থেকে প্রতিবাদ করতে হবে। কিছুই যদি করতে না পারি অন্তত চিৎকার করে তো মানুষকে জানাতে পারি। আসুন; অন্তত এ কাজটি শুরু করা যাক।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sopnil.roy@gmail.com

 

"