স্মরণ

অনুভূতির অবিনশ্বর মূর্ছনা

প্রকাশ : ১৭ মে ২০১৯, ০০:০০

বিশ্বজিত রায়

‘ও আমার উড়াল পঙ্খী রে, যা যা তুই উড়াল দিয়া যা...।’ এ যেন বিদায়ী আবেদন। অনুভূতির অবিনশ্বর মূর্ছনা। শিল্পী উড়নচন্ডী এ মনকে অবনম্র উচ্চৈস্বরে দিয়েছিলেন উড়ে যাওয়ার উপদেশ। যে গানে জীবন বোধের অতৃপ্ত ব্যঞ্জনা কিংবা পরম সুখের সংগীতীয় অভিব্যক্তি অনুমান করা যায়। তবে শ্রুতিমধুর জনপ্রিয় এ গান যে অর্থই বহন করুক না কেন, তা মৃত্যুর চিরন্তন রীতি অনুসরণ করেছে বলে প্রতীয়মান হয়। একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দীর চিরতরে চলে যাওয়া তার নিজের গাওয়া গানের মতোই উড়াল দিয়েছে। গানের সত্যতা সুনিশ্চিতে জীবন গহিনে লুকায়িত শিল্পীর মূল্যবান প্রাণপাখিটা হার মেনেছে মৃত্যুর কঠিন নিয়মের কাছে। জীবন জয়ের সফল পথচলা রুদ্ধ করে দিয়ে মৃত্যু নামক অপ্রিয় বাস্তবতা ভক্তদের উপহার দিয়েছে সুবীর নন্দীর নিথর দেহখানি। এ মৃত্যু মেনে নেওয়া কঠিন। তার মৃত্যুতে শোকাহত পুরো সংগীতাঙ্গন ও বাংলাদেশ।

জীবন মৃত্যুর কাছেই পরাজিত হয়। এর সঙ্গে কোনো দাম্ভিকতা চলে না। যত বড় কীর্তিগাথা জীবনই হোক, সে জীবনটাই যেন মৃত্যুর জন্য তৈরি হয়েছে। কীর্তিগাথা জগৎজয়ী জীবনের অধিকারী হলেও মৃত্যু অবশ্যাম্ভাবী। অপ্রিয় অমোঘ অবিনশ্বর এই রীতির কাছে সবাইকে পরাভূত হতে হয়। মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠে অবস্থান করা জন্ম-মৃত্যুর ভাঙাগড়া খেলায় কেউ কেউ মরেও অমরত্বের পালক নিয়ে বেঁচে থাকেন মানুষের হৃদয়ে। কর্মকীর্তির বিশালতাই বাঁচিয়ে রাখে মৃত্যুর শাশ্বত সাধ পাওয়া মানুষটিকে। কর্ম ক্ষমতাধর দেহধারী জীবনের ইতি ঘটাতে সক্ষম মৃত্যু কেবলমাত্র শ্রেষ্ঠত্বের অদৃশ্য শক্তির কাছে মাথা নত করতে বাধ্য হয়। পৃথিবীতে অনেক মহামনীষী আছেন, যারা মৃত্যু মুমূর্ষুতায় পরকালের যাত্রী হয়েছেন ঠিকই, তবে স্মরণযোগ্য নন্দিত গুণ তাদের বাঁচিয়ে রেখেছে অনন্তকাল। সেই স্মরণীয় জায়গাতেই বেঁচে থাকবেন সুবীর নন্দী।

জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দী অগণিত ভক্তকে কাঁদিয়ে চলে গেছেন পরপারে। বাংলাদেশ সময় ৭ মে মঙ্গলবার ভোর ৪টা ২৬ মিনিটে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে জনপ্রিয়শিল্পী সুবীর নন্দীর মৃত্যু হয়। গত ১৪ এপ্রিল রাতে অসুস্থ হয়ে পড়লে এই সংগীতশিল্পীকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়। ১৮ দিন সিএমএইচে থাকার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৩০ এপ্রিল তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় শিল্পী সুবীর নন্দীর।

জন্ম ১৯৫৩ সালের ১৯ নভেম্বর। হবিগঞ্জের বানিয়াচং নন্দীপাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত সংগীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা সুধাংশু নন্দী ছিলেন একজন চিকিৎসক ও সংগীতপ্রেমী। মা পুতুল রানী চমৎকার গান গাইতেন। ছোটবেলা থেকেই সুবীর নন্দী ভাই-বোনদের সঙ্গে শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নিতে শুরু করেন ওস্তাদ বাবর আলী খানের কাছে। তবে সংগীতে তার হাতেখড়ি মায়ের কাছেই। বাবার চাকরি সূত্রে তার শৈশবকাল চা বাগানেই কেটেছে। চা বাগানে খ্রিস্টান মিশনারিদের একটি স্কুলে পড়াশোনা করেন। তবে পড়াশোনার অধিকাংশ সময়ই তার কেটেছে হবিগঞ্জ শহরে। হবিগঞ্জ শহরে তাদের একটি বাড়ি ছিল, সেখানে ছিলেন। পড়েছেন হবিগঞ্জ গভঃ হাইস্কুল ও হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজে। তৃতীয় শ্রেণীতে পড়া অবস্থায়ই তিনি গান করতেন। এরপর ১৯৬৭ সালে তিনি সিলেট বেতারে গান করেন। ১৯৭০ সালে ঢাকা রেডিওতে প্রথম রেকর্ডিংয়ের মধ্য দিয়ে সুবীর নন্দী গানের জগতে আসেন। প্রথম গান ‘যদি কেউ ধূপ জ্বেলে দেয়’। ৪০ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে গেয়েছেন আড়াই হাজারেরও বেশি গান। বেতার থেকে টেলিভিশন, তারপর চলচ্চিত্রে গেয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। ১৯৭৬ সালে আব্দুস সামাদ পরিচালিত সূর্যগ্রহণ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি প্রথম চলচ্চিত্রে গানের সুযোগ পান। ১৯৭৮ সালে অশিক্ষিত চলচ্চিত্রে রাজ্জাকের ঠোঁটে তার গাওয়া ‘মাস্টার সাব আমি নাম দস্তখত শিখতে চাই’ গানটি জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯৮১ সালে তার একক অ্যালবাম সুবীর নন্দীর গান ডিসকো রেকর্ডিংয়ের ব্যানারে বাজারে আসে। তিনি গানের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ব্যাংকে চাকরি করেছেন। এ ছাড়া তার প্রেম বলে কিছু নেই, ভালোবাসা কখনো মরে না, সুরের ভুবনে, গানের সুরে আমায় পাবে প্রকাশিত হয় এবং প্রণামাঞ্জলি নামে একটি ভক্তিমূলক গানের অ্যালবামে। ৬৬ বছরের সংগীত জীবনে সুবীর নন্দী গেয়েছেন অনেক জনপ্রিয় গান। তিনি মূলত চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়ে খ্যাতি অর্জন করেন। চলচ্চিত্রের সংগীতে তার অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান করেন। তিনি মহানায়ক (১৯৮৪), শুভদা (১৯৮৬), শ্রাবণ মেঘের দিন (১৯৯৯), মেঘের পরে মেঘ (২০০৪) ও মহুয়া সুন্দরী (২০১৫) চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়ে পাঁচবার এ পুরস্কার লাভ করেন। সংগীতে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করে। চলচ্চিত্রে নন্দীর গাওয়া উল্লেখযোগ্য গান হলোÑ ‘ও আমার উড়াল পঙ্খীরে’, ‘দিন যায় কথা থাকে’, ‘আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়’, ‘পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই’, ‘আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি’, ‘হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে’, ‘তুমি এমনই জাল পেতেছ’, ‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার’, ‘কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো’, ‘পাহাড়ের কান্না দেখে’, ‘কেন ভালোবাসা হারিয়ে যায়’, ‘একটা ছিল সোনার কইন্যা’। [সূত্র : উইকিপিডিয়া]

পরলৌকিক পীড়িত পথের মহারাজা মৃত্যুদূত অত্যন্ত নির্দয় নিষ্ঠুর। এ জগৎসংসারে সে হাজির হয় শুধু নিতে আর কষ্ট দিতে। এই দেওয়া-নেওয়ার মাঝখানে দাঁড়িয়ে সুবীর নন্দীর ভক্তরা। তার মৃত্যুর খবরে আজ ব্যথিত ভক্ত হৃদয়। প্রিয় শিল্পীর থেমে যাওয়া কণ্ঠ আর শুনতে পারবেন না কেউ। টেলিভিশন লাইভে আর ভাসবে না ভদ্র-বিনয়ী ও মার্জিত মানুষটির সুশ্রী অবয়ব। সুবীর নন্দীর মৃত্যু খবর এবং সিঙ্গাপুরে অবস্থানরত সুবীর নন্দীর মেয়ে ফালগুনী নন্দী নিজের ফেসবুকে ‘আমার বাবা নেই’ স্ট্যাটাসের মাধ্যমে ভক্তদের শূন্যতায় ভাসিয়েছেন। এই শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। সুবীর নন্দীর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক শোক বার্তায় জানিয়েছেন, ‘সুবীর নন্দীর মৃত্যু বাংলাদেশের সংগীতজগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি’। সত্যিই সুবীর নন্দীর মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের মৃত্যু নেই। তিনি বেঁচে থাকবেন ভক্ত হৃদয়ে। গানে গানে বেজে উঠবে তার জীবন্ত সুর।

বর্তমান সংগীতচর্চার বিকৃত যুগে আধুনিক গানের মুকুটহীন সম্রাট’ তুমুল জনপ্রিয় শিল্পী সুবীর নন্দীর খুব প্রয়োজন ছিল। গুরু-ওস্তাদহীন বর্তমান গানওয়ালাদের গান শুনলে মনে শুধু অতৃপ্ততাই বাসা বাধে না, সুর সংগীতের প্রতি একটা অনীহা চলে আসে। তুমুল জনপ্রিয় একটি গানকে তারা এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যেখানে গানের আসল সুর ও অর্থবহ কথাগুলো হারিয়ে ফেলে তার নিজস্বতা। বর্তমান কোনো শিল্পীকে যদি বলা হয় সুবীর নন্দীর একটা গান গাইতে, তখন তারা তাদের মতন করে গেয়ে শুধু গানের বারোটাই বাজায় না, টেলিভিশন স্ক্রিনের সামন থেকে চলে যেতে বাধ্য করে। গানের গহিনে সৃষ্ট অদৃশ্য ব্যথা সারাতে যেমন সুবীর নন্দীর শুদ্ধ সংগীত জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য ছিল; তেমনি এ যুগের তথাকথিত শিল্পীদের ক্ষেত্রে সুবীর নন্দীর সঙ্গ পাওয়াটা অত্যন্ত জরুরি ছিল। সংগীতে অসামান্য অবদান রাখা সুবীর নন্দীসহ সম্প্রতি কয়েকজন সুর সংগীতজ্ঞ শ্রেষ্ঠজনদের চলে যাওয়া সুরের ভুবনে মারাত্মক শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। এ সংকট কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব। সুবীর নন্দী, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, শাহনাজ রহমতুল্লাহর মতো কিংবদন্তিদের শূন্য জায়গা কখনো পূরণ হওয়ার নয়।

জানি মৃত্যু ম্রিয়মাণতা সবাইকে কাঁদায়। এটা চরম অপ্রিয় সত্য কথা। তবে সেটা স্বল্পক্ষণের দুঃখভারাক্রান্ত অন্তিম অনুভূতি। এই মৃত্যু যন্ত্রণা কেবল আপনজনকেই বেশি তাড়িত করে। জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা অসহনীয় দুঃখ যাতনা পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজন ব্যতীত অন্য কাউকে কাঁদাতে পারে না। কিন্তু কিছু কিছু মৃত্যু সমাজ সীমানা পেরিয়ে দেশ ও জাতির হৃদয় স্পর্শ করে। এমন মহৎ মৃত্যু দুমড়েমুষড়ে দেয় মমত্বমাখা পাঁজর। শাশ্বত শক্তিধর এই মৃত্যু হয়তো সুবীর নন্দীর দৈহিক সতেজ মহামূল্যবান নিঃশ্বাসটুকু কেড়ে নিয়ে পরলৌকিক পিঞ্জরে আবদ্ধ করতে পেরেছে। কিন্তু কীর্তি মোড়কে বাঁধাইকৃত সুবীর নন্দীর চিরায়ু চাকচিক্য বস্তুটিকে সরানোর সামর্থ্য অন্তত নির্দয় মৃত্যুমালিকের নেই। সুবীর নন্দী দেহগত দূর অচিনপুরে চলে গেলেও বেঁচে থাকবেন কীর্তিকায়ার অন্তরালে শুদ্ধ সংগীত চর্চার অদৃশ্য অঙ্গনে। কিংবদন্তিতুল্য সংগীতজ্ঞের কাতারে থেকে যাবে তার নাম। যা কোনো দিন মুছে যাবে না। পরপারে ভালো থেকো, হে প্রিয় শিল্পী।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

bishwa85@gmail.com

 

"