গণপরিবহন

ভোগান্তির শেষ কোথায়

প্রকাশ : ১৬ মে ২০১৯, ০০:০০

আবু আফজাল সালেহ

গণপরিবহনে বেড়ে গেছে ভোগান্তি। ট্রেনে বেড়ে গেছে পাথর নিক্ষেপ। বাসে নারীর প্রতি সহিংসতা জাতি হিসেবে লজ্জাই দিচ্ছে! টিকিট কালোবাজারি তো আছেই। ঈদ উপলক্ষে গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা নাগালের বাইরে যায়। দালালির চক্করে টিকিট পাওয়া যায় না; বেশি টাকায় কিনতে হয়। অনেক সময়ে নি¤œমানের বাসে উন্নত বাসের ভাড়া নেওয়া হয়। রাস্তায় দীর্ঘ যানজট লেগেই থাকে। ফেরিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় যাত্রী ভোগান্তি চরমে পৌঁছায়।

বেশ কিছুদিন থেকে রেলে ‘পাথর ছোড়া’ বেড়ে গেছে। আরামদায়ক ও জনপ্রিয় রেলসেবাকে বিঘিœত করার অপচেষ্টা কি না, দেখা দরকার। আরো দেখা দরকার অন্য বেসরকারি গণপরিবহনের ব্যক্তিরা জড়িত কি না! পাথর নিক্ষেপের হার ঈদের সামনে বেড়ে যাওয়া কিন্তু সন্দেহের চিন্তা মাথায় আসে। আবার রেলের কালোবাজারির দৃষ্টি অন্যত্র সরানোর কৌশল কি না, সেটাও দেখা দরকার। এ ব্যাপারে সত্যতা বের করার জন্য আন্তরিক ও নিবিড় তদন্ত করা দরকার।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের হিসাবে, গত পাঁচ বছরে ট্রেনে পাথর ছুড়ে ২ হাজারেরও বেশি জানালা-দরজা ভাঙার ঘটনা ঘটেছে। রেলপথে নিরাপত্তাহীনতা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাথর ছোড়ার ঝুঁকিপ্রবণ হিসেবে রেলের পূর্বাঞ্চলে পাঁচটি এবং পশ্চিমাঞ্চলে ১৫টি জেলার ৬৫টি স্থান চিহ্নিত করেছিল রেল বিভাগ। এই সূত্রে এসব স্থানে রেলে পাথর ছোড়ার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে দু-চারজনকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা কোনো অসম্ভব কঠিন কাজ নয়। ট্রেনে ছোড়া পাথরে রক্তাক্ত হয়ে গত কয়েক বছরে প্রীতি দাশ, রেলের পরিদর্শক বায়েজিদ শিকদারসহ বেশকিছু মানুষ মারা গেলেও নির্মম হত্যকান্ডে জড়িতরা শাস্তির বাইরেই রয়ে গেছে। ট্রেনে পাথর ছোড়ার মতো কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার।

চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেশ আলোচিত হলেও তা বন্ধ না হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। এ কাজ করছে মূলত রাতে নেশাগ্রস্ত কেউ আর দিনে শিশু-কিশোররা। শিশু-কিশোররা মূলত খেলার ছলেই এ নির্মম কাজে অংশ নিচ্ছে। রেললাইনের দুপাশে কিছু অংশে যে রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা ১৪৪ ধারা জারি থাকে, তা সবাইকে জানাতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ছাড়া চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ফলে অপরাধীকে কী শাস্তি ভোগ করতে হবে, তাও জনগণকে বিস্তারিত জানাতে পদক্ষেপ নিতে হবে। অভিভাবক, শিক্ষকসহ এলাকার গণ্যমান্য সবাইকে এ কাজে ভূমিকা রাখতে হবে। শিশু-কিশোরদের জানাতে হবে তাদের কৃত অপকর্মের কারণে মুহূর্তের মধ্যে একজন ব্যক্তি চিরদিনের জন্য অন্ধ হয়ে যেতে পারে অথবা আরো বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। ট্রেনে ইটপাথর নিক্ষেপ রোধে কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়া আজ জরুরি হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের সূত্র জানিয়েছে, সারা দেশে ২ হাজার ৯০০ কিলোমিটার রেলপথ রয়েছে। এর মধ্যে ২০ জেলার ওপর দিয়ে চলার সময় ট্রেন লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ার ঘটনা বেশি ঘটছে। পূর্বাঞ্চলের পাঁচটি ও পশ্চিমাঞ্চলে ১৫টি জেলায়। পাথর ছোড়ার বেশি ঘটনা ঘটছে গাজীপুরের টঙ্গী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া থেকে গঙ্গাসাগর, কুমিল্লার ময়নামতি ও চট্টগ্রামের পাহাড়তলি থেকে সীতাকুন্ড অংশে। শ্রীমঙ্গল, কাউনিয়া, বামনডাঙ্গা এলাকায়। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, চলন্ত ট্রেনে পাথর ছুড়ে মানুষকে হত্যা ও আহত করার বিষয়টি অমানবিক। বছরের পর বছর থেকে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। কারণ প্রতিটি রেলওয়ে স্টেশনের আশপাশে অপরাধীরা ওঁৎ পেতে থাকে। স্টেশন থেকেই নানা অপরাধের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া নিরাপদ সড়ক ভেবে রেলপথকে অনেক অপরাধী নির্বিঘেœ ব্যবহার করছে। এদের মধ্যে রেলওয়ের কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জড়িত রয়েছেন বলেও শোনা যায়। ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য নিরাপদে ট্রেন ভ্রমণে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। ঢিল ছোড়া দুষ্কৃতকারীদের এমন দৌরাত্ম্যের পরও রেলওয়ের পক্ষ থেকে এ অপরাধ বন্ধে জোরালো কোনো উদ্যোগ নেই। একের পর এক দুর্বৃত্তদের ছোড়া ঢিলের আঘাতে ট্রেনের যাত্রী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আহত হওয়ার পরও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মামলা পর্যন্ত হয় না। কিছু ক্ষেত্রে রেলওয়ে পুলিশ সাধারণ ডায়েরি করেই দায়িত্ব শেষ করে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে আইনের ১২৭-১২৮ এবং ১৩০ ধারায় চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় শুধুমাত্র সামান্য আর্থিক জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ১২৭ ধারা অনুযায়ী, ট্রেনে পাথর ছোড়া হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদন্ডসহ ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে এই আইনে পাথর নিক্ষেপে অভিযুক্তের অভিভাবককেই জরিমানা শোধ করতে হবে। তবে পাথর নিক্ষেপে কারো মৃত্যু হলে ৩০২ ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদন্ডের বিধান রয়েছে। তবে আইন প্রয়োগ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে বলে জানা নেই! এটাও ভাবনার খোরাক প্রসারিত করে! ভেবে দেখতে হবে; গভীরে যেতে হবে। আইনে যা আছে সেটার মাধ্যমে মামলাও হয় কম। কার্যকর হয় আরো কম। সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি থাকে কি না এবং থাকলে থাকে কেন? স্বার্থের দ্বন্দ্ব কি না? মানে সমস্যা জিইয়ে রাখার প্রবণতা কি না, সেটাও দেখতে হবে। আসলে আমাদের কোনো কিছুর ওপর বিশ্বাস কম, আস্থাও কম। নৈতিক অবক্ষয়ের শেষপ্রান্তে আমরা দাঁড়িয়ে।

বেশ কিছু কারণে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। অনেক সময় ভবঘুরে ও রেললাইনের আশপাশে মাদকাসক্তরা ট্রেনে পাথর ছুড়ে মারে। স্টপেজ ছাড়া গাড়ি থামানোর জন্যও দুর্বৃত্তরা এই কাজ করে থাকে। এর বাইরে সরকারি মালামাল নষ্ট করার মনমানসিকতা ও মাদক বা চোরাচালান পণ্য কিছু চিহ্নিত স্থানে নামাতে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটতে পারে। রেল পাথর নিক্ষেপে শিশু-কিশোররা জড়িত বলে জানা যায়। বস্তি এলাকায় এ ঘটনা বেশি ঘটছে। কারণ বস্তি এলাকায় রেললাইন ঘেঁষে বসতঘর। ঘটনাপ্রবণ এলাকা শনাক্ত করতে হবে। প্রচারণা করতে হবে। জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। যেসব স্থান দিয়ে ট্রেন চলাচল করে, সেখানকার জনপ্রতিনিধি এবং বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়ে এর বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করছেন রেল কর্মকর্তারা।

আরো একটা জিনিস ভাবিয়ে তুলছে। সেটা হচ্ছে, বাসে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ। ক্ষেত্রমতে, খুন পর্যন্ত গড়াচ্ছে। নৈতিক অবক্ষয়ের নিম্নপর্যায়ে আমরা! ড্রাইভার আর স্টাফদের দ্বারা বা তাদের সহযোগিতায় বেশির ভাগ এমন ঘটনা ঘটছে বলে মিডিয়া মাধ্যম হতে জানা যায়। বাংলাদেশে নারীযাত্রীদের অনেকেই বলছেন, রাতে চলাচলের ক্ষেত্রে পরিবহন সংশ্লিষ্ট লোকজন কিংবা পুরুষ যাত্রীদের দ্বারা শারীরিক কিংবা মানসিক নির্যাতনের শিকার হন তারা। একদিকে নিরাপত্তা নিয়ে আস্থাহীনতা; অন্যদিকে সামাজিক অসচেতনতার কারণে দিন দিন নির্যাতন ও নিগ্রহের ঘটনা বাড়ছে। নারী অধিকার কর্মীরা বলছেন, নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান তৎপরতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নারীদের প্রতি সংবেদনশীল হতে হবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই।

বাসে খোদ পরিবহন সংশ্লিষ্টরাই অনেক সময় ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ান। বেসরকারি সংগঠন অ্যাকশন এইডের একটি জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে দিনের বেলাতেই যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে নানা রকম হেনস্তার শিকার হন নারীযাত্রীদের একটা বড় অংশ। তাদের জরিপে, বাসে পুরুষযাত্রীদের মাধ্যমে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন ৪২ শতাংশ নারীযাত্রী। এ ছাড়া পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ৫৩ শতাংশ নারীযাত্রী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাতে নারীযাত্রীদের হয়রানি, ধর্ষণ এমনকি হত্যার ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে ভীতি বাড়ছে। ফলে দিনের বেলা নারীদের স্বাভাবিক চলাচল দেখা গেলেও রাতে ভ্রমণ অনেকটাই কমিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছেন।

ভারতের দিল্লিতে নির্ভয়া হত্যাকান্ড ও ধর্ষণের ঘটনার পর সেখানে নারীরা যে কতটা অনিরাপদ, তা আলোচিত হয়েছিল বিশ্বজুড়ে। বাংলাদেশে রূপা ও সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের শাহীনুর আক্তার তানিয়াদের ঘটনাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, এখানেও নির্জন রাস্তায় একাকী নারী সমানভাবে অনিরাপদ। প্রতিদিনই ঘটছে অমানবিক ঘটনা। খুনের ঘটনা একেবারে কম না হলেও তানিয়া আর রূপাদের মতো পরিণতি হচ্ছে অনেককে। প্রকাশ হচ্ছে কম। সমাজে আরো নিগ্রহ হওয়ার ভয়ে অনেক নারী অভিযোগ করেন না! কারণ অভিযোগ করলেও প্রতিকার পান না! পরে নিজ বলয়েই অপমানিত হন নিজেই। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় পাশের পুরুষদেরও সহযোগিতা পাওয়া যায় না।

ঈদের আগে-পরে নির্বিঘœ হোক পথযাত্রা। কারণ এ সময়ে নানা রকম সংকট বেশি সৃষ্টি হয় পরিবহন সেক্টরে। রেল ঠিকমতো কাজ করুক। কাজ না করার পেছনে সিন্ডিকেটের ভয় না আসুক। পাথর ছোড়া শূন্যে নামুক। মহিলাসহ বাসের সব যাত্রী নিরাপদে চলাচল করুকÑ এটাই প্রত্যাশা।

লেখক : কবি ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"