মুক্তমত

সামাজিকভাবে বয়কটই সমাধান

প্রকাশ : ১৬ মে ২০১৯, ০০:০০

এস এম নাজের হোসাইন

রমজান, ঈদ, পূজা পার্বণকে সামনে রেখে মুনাফাখোর, মজুদদারি, সিন্ডিকেট, খাদ্যে ভেজালকারী ও অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে আজ নাগরিক জীবন অতিষ্ঠ। একশ্রেণির অতি মুনাফালোভী অসাধু ব্যবসায়ীদের কোটিপতি হওয়ার বাসনায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট তৈরি করে এবং মূল্যবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা অচল করে দিয়েছে। যার ফলে সাধারণ মানুষের জন্য জীবন-জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দাম বাড়ালেও ওই পণ্যের আন্তর্জাতিক দাম কমলেও তারা আর কমায় না। গুটিকয়েক অসৎ ব্যবসায়ীর স্বার্থ সংরক্ষণে যাবতীয় রীতিনীতি প্রণয়ন করার কারণে সাধারণ মানুষের স্বার্থ বারবার উপেক্ষিত হয়েছে এবং হচ্ছে। ফলে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম, ইচ্ছামতো বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের কাছে জনগণ জিম্মি হয়ে পড়ে। সিএনজি, বাস ভাড়া থেকে শুরু করে নগরীর সেলুন, ফটোস্ট্যাট, ফার্মেসি, রিকশাওয়ালাসহ সবাই নিজেরাই তাদের ইচ্ছামতো মূল্য নির্ধারণ করছেন, সেখানে সরকারি কোনো সমন্বয় সাধন তো দূরের কথা সরকার সংশ্লিষ্ট লোকজন কোনো এক অজ্ঞাত কারণে এর খবরই রাখেন না। উপরন্তু তাদের এ কর্মকান্ডকে বৈধতা দেওয়া, সরকারের ভর্তুকি লাভের আশা ও কর ফাঁকির কুমতলবে এসব ব্যবসায়ী রমজানে সুদৃশ্য মোড়কে ন্যায্যমূল্যের দোকান খুলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণায় নেমেছে। কিন্তু পাইকারি ও খুচরা বাজারের মাঝে সমন্বয় করলে, মজুদদারি ও একচেটিয়া আমদানির দৌরাত্ম্য কমাতে পারলে দ্রব্যমূল্য অনেকাংশে কমত।

রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে যখনই আলোচনা হবে, পাইকারিকারকরা খুচরাকে দোষারোপ করবে আর খুচরা বিক্রেতারা পাইকারিদের। পবিত্র রমজান, ঈদ ও পূজা সামনে রেখে একশ্রেণির মুজদদারি, সিন্ডিকেট চক্র প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনের নাকের ডগায় তাদেরকে বৃদ্ধাঙুলি প্রদর্শন করে চিনি, সয়াবিন, পেঁয়াজ, ছোলা সংকট করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ চক্রটি আবার নতুন করে চাল সংকটের পাঁয়তারা করছে। এসব মজুদদারি, অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটকারীদের সঙ্গে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারীর সংস্থার কিছু লোকের অবৈধ আঁতাতের কারণে তারা জনগণের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, তাদের অনেকেই আবার সাধু সাজার জন্য পবিত্র ওমরাহ পালন করে হাজি, বিভিন্ন সভা-সেমিনারে মোটা অঙ্গের দান-খয়রাত করে সাদা মনের মানুষসহ নানা গুণীজনের বেশ ধারণ করে।

এদিকে হাইকোর্ট এক রিট আবেদনে গত ১২ মে ২০১৯ইং বলেছেন, খাদ্যে ভেজালের কারণে দেশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্স অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের মান পরীক্ষায় নিম্নমান প্রমাণিত হওয়ায় ৫২টি প্রতিষ্ঠানের খাদ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। হাইকোর্ট আরো পর্যবেক্ষণ দেন খাদ্যে ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্য ও খাবারের কারণে এ দেশ বসবাসের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীকে যুদ্ধ ঘোষণা আহ্বান জানিয়েছেন। এটা খুবই আশাব্যঞ্জক সংবাদ। কারণ খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে খোদ হাইকোর্টও সরব হয়েছেন। তবে এখানে ভোক্তা হিসাবে আমাদের করণীয় অনেক বেশি। যে ৫২টি প্রতিষ্ঠানের পণ্যের বিষয়ে হাইকোর্ট নির্দেশনা প্রদান করেছেন, আমাদের উচিত হবে এসব প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি বর্জন করা। তা হলে কোনো উৎপাদক আর এ ধরনের নিম্নমানের খাদ্য উৎপাদনে এগিয়ে আসবেন না। দেশে খাদ্যে ভেজালে এত সয়লাব কেন? এ প্রশ্নের উত্তর সরাসরি এখানে ভেজাল খাদ্যের বাজার আছে তাই। ভেজাল খাদ্যের গ্রাহকরা যদি সচেতন হয়, এগুলো বয়কট করে, তা হলে এ অবস্থার পরিত্রাণ হবে। তাই একতরফাভাবে ব্যবসায়ীদের দোষ চাপানোর সঙ্গে সঙ্গে ভোক্তা হিসাবে আমাকে আমার দায়িত্ব পালন করতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএসটিআই ও হাইকোর্ট নিম্নমানের পণ্য উৎপাদনকারীদের বিষয়ে তথ্য দিয়েছে। এখন দায়িত্ব ভোক্তা হিসাবে আমারও।

এরা একদিকে যেমন পণ্যদ্রব্যের মূল্য বেশি নিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে, অন্যদিকে দুধ, মাছে ফরমালিন, ইউরিয়া, ফলমুলে কার্বাইডসহ বিভিন্ন কেমিক্যাল মিশিয়ে কৃত্রিমভাবে পাকিয়ে এবং এগুলো তাজা রাখার জন্য সালফার নামে অন্য একটি কেমিক্যাল দিচ্ছে। শাকসবজি তাজা রাখার জন্য ব্যবহার করছে হরেক রকমের কেমিক্যাল। নষ্ট ছোলা, ভালো ছোলার সঙ্গে ও পচা চাল ভালো চালের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করছে। বিভিন্ন গুঁড়া মসলায় ইটের গুঁড়াসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর দ্রব্য মিশ্রণ করে বিক্রি করছে, সরিষার তেলে মিশাচ্ছে সাইট্রিক এসিড। একই সঙ্গে সিঙারা-চমুচা তৈরিতে সয়াবিনের সঙ্গে পোড়া মবিল ব্যবহারের খরব আমরা সবাই জানি। এদিকে এত খাদ্যে ভেজালের মাঝে বিভিন্ন দেশ থেকে নি¤œমানের গুঁড়া দুধ এনে অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি বলে মিথ্যা প্রতারণা করে বাজারজাত করছে। যদিও দেশ দুগ্ধ উৎপাদনে অনেক অগ্রগতি সাধন করেছে। তার পরও বিদেশ থেকে গুঁড়া দুধ আমদানি করতে একটি মহল সব সময় সক্রিয়। সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউশনের অধীন ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির (এনএফএসএল) ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত জাতীয় নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগারের উদ্যোগে গরুর দুধ, গরুর খাবার, দুগ্ধজাত দই ও প্যাকেটজাত দুধের ওপর জরিপ চালানো হয়। আর বাজারে প্রচলিত সব ব্র্যান্ডের স্থানীয় ও আমদানিকৃত প্যাকেটজাত দুধের নমুনা সংগ্রহ করা হয় বিভিন্ন সুপার স্টোর থেকে। যা সংগ্রহ থেকে শুরু করে গবেষণাগারে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিয়ম মানা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, বাজারে প্রচলিত সব ব্র্যান্ডের স্থানীয় ও আমদানিকৃত প্যাকেটজাত দুধের নমুনা সংগ্রহ করা হয় বিভিন্ন সুপার স্টোর থেকে সংগ্রহ করে বিভিন্ন অণুজীব বিশেষ করে দইে সিসা ও অ্যান্টিবায়োটিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। আবার অনেকে বিদেশ থেকে নি¤œমানের ও মেয়াদোত্তীর্ণ গুঁড়া দুধের আমদানি ও বাজারজাত করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ছে, দেশকে পরিণত করেছে ভেজালের স্বর্গরাজ্যে।

আর এসব খাদ্যদস্যুদের ভিত এতই শক্ত যে, সরকারি প্রশাসনযন্ত্র মনে হয় তাদের কাছে অসহায়, এরা টাকার জোরে সরকারি আমলা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিভিন্ন মিডিয়াকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেন। বিজ্ঞাপনের ও আর্থিক সুবিধার কারণে এদের অপকর্মের খবর মিডিয়াতে আসে না। কোনো কারণে ধরা পড়লেও আইনের ফাঁকফোকরে ঠিকই রেরিয়ে আসেন। বরং এ রকম জলজ্যান্ত মানুষ মেরে কোটিপতি হওয়ার লোকের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। ইতিপূর্বে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে একই কায়দায় গুঁড়া দুধে ময়দা মিশ্রিত করার হোতাসহ চিনি, সয়াবিন, চাল কেলেঙ্কারি হোতাদের কোনো শাস্তি হয়নি। পর্দার আডালে তারা আবার রেহাই পেয়ে যায়। আর সাধারণ ভোক্তা হিসেবে জনগণ অসচেতন ও অসংগঠিত এবং ভেজাল, নিম্নমানের গুঁড়ো দুধ, জাঙ্কফুড, শিশুখাদ্যসহ নীরবে হজম করতে হচ্ছে, প্রকারান্তরে বাংলাদেশকে ভেজাল ও নি¤œমানের খাদ্যের বাজার ও পরীক্ষাগারে পরিণত করে কোটি কোটি টাকা লোপাট করছে। নি¤œ মধ্যবিত্তরা যা আয়-রোজগার করছে তার সিংহভাগই ওষুধ ও চিকিৎসার খরচ জোগাতে চলে যাচ্ছে।

তাই আসুন অবিলম্বে মুনাফাখোর, মজুদকারী, সিন্ডিকেট, খাদ্যে ভেজাল, নি¤œমানের ও মেয়াদোত্তীর্ণ গুঁড়ো দুধ, শিশুখাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী আমদানি, গুদামজাত করে ও বাজারজাতকরণে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিতে জড়িত অসৎ ব্যবসায়ী ও এ ধরনের মানববিধ্বংসী কাজে জড়িতদের সহযোগী সরকারি প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকদের ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হই এবং মিথ্যা ঘোষণা, তথ্য বিকৃতি, নি¤œমানের গুঁড়ো দুধ আমদানিকারক, প্রতারক, ভেজাল মিশ্রণকারী, মজুদদারি, সিন্ডিকেট ও অসাধু ব্যবসায়ী ও তাদের দোসরদের বাজারজাতকৃত পণ্য ও তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করে, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। এ কাজে সরকার নিশ্চয়ই ভোক্তাদের পাশে থাকবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

লেখক :

ভাইস প্রেসিডেন্ট

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

cabbd.nazer@gmail.com

 

 

"