স্মরণ

দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প

প্রকাশ : ১৫ মে ২০১৯, ০০:০০

মো. কায়ছার আলী

আধুনিক নার্সিংয়ের প্রবর্তক ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। এক মুহূর্তের জন্যও তার স্বভাবের কোনো বিরক্তি, কোনো ব্যস্ততা, ব্যবহারে কোনো বিভ্রান্তি প্রকাশ করত না। খাদ্য, বিশ্রাম বা গরম তার মহান কাজে কখনো বাধার সৃষ্টি করতে পারত না। ১৮২০ সালের ১২ মে ধনী ব্রিটিশ বাবা-মায়ের কন্যা ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে ভ্রমণের সময় জন্মগ্রহণ করেন। জন্মস্থান ফ্লোরেন্স শহরের নামানুসারেই তার নাম রাখা হয়েছিল। ছোটবেলা থেকে পারিবারিক সচ্ছলতার কারণে কোনো কিছুর চাহিদা অপূর্ণ রাখেনি তার পরিবার। ১৭ বছর বয়সে তিনি যে অন্তর থেকে অনুভব করতে শুরু করলেন মহান সৃষ্টিকর্তা তাকে দিয়ে কিছু করাতে চান। কিন্তু কী বিষয় সেটা, উপলব্ধি করতে করতে পেরিয়ে গেল বেশ কয়েক বছর। তার ছোটবেলা ইংল্যান্ডের ডার্বিশায়ার অঞ্চলে তাদের পুরনো বাড়িতে কেটেছে। নাইট ক্লাবে যাওয়া বা কেতাদুরস্ত জীবন কখনো কোমল মনের অধিকারী ফ্লোর ভালো লাগত না, বরং গ্রাম্য পরিবেশ আর দুস্থ-অসহায় মানুষের পাশাপাশি হাঁস, মুরগি, ভেড়া অসুস্থ হলে সেবা করাটাই ছিল তার কাছে আনন্দদায়ক। তিনি মানুষের দুর্ভাগ্যকে নিজের দুর্ভাগ্য হিসেবে মনে করতেন। কিছু করার একটা তাগাদা অনুভব করতেন। নিজের মহল্লার মধ্যে কোনো আহত বা অসুস্থ মানুষের কথা শুনলে কালবিলম্ব না করে ছুটে যেতেন সেই ছোট্ট বয়সেই। চেষ্টা করতেন কীভাবে সেবা করা যায়। ফলে আশপাশের সামাজিক পরিবেশে তিনি সবার প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। বাল্যকালেই তার সামনে ঘটল এক ঘটনা। নির্দয় বালক একটি কুকুরকে পাথর ছুড়ে মেরে আহত করে। দেখলেন আহত কুকুরটি হাঁটতে পারছে না। তিনি কুকুরটিকে তুলে আনলেন এবং সেবা করে সুস্থ করে তুললেন। এ ঘটনাই তার মনকে সেবিকা হওয়ার পেছনে অনুপ্রেরণ জোগায়।

২০ বছর বয়সেই তিনি সংগীত, ছবি আঁকার পাশাপাশি গ্রিক, লাতিন, জার্মানি, ফ্রেঞ্চ ভাষা আয়ত্ত করেন। পিতার পাশাপাশি পড়াশোনা বিষয়ক প্রকৃত গাইড হিসেবে ছিলেন তার বোন প্যানথেনোপ। তাদের পিতা অভিজাত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন হওয়ায় বিভিন্ন মন্ত্রী, বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি তাদের বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। গতানুগতিক শিক্ষার প্রতি তিনি সামান্যতম আকর্ষণ অনুভব করতেন না। বরং তার ইচ্ছা ছিল কীভাবে সেবাকে জীবনের ব্রত হিসেবে পালন করা যায়। সে সময় সেবাকে কোনো পেশা হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হতো না। হাসপাতালগুলোর অবস্থা ছিল যেমনি ভয়াবহ, তেমনি করুণ। সেবিকা হওয়ার ইচ্ছার কথা শুনে তার পিতা-মাতা চমকে উঠলেন। আপত্তির ঝড় উঠল সামাজিক ও পরিবারিক পর্যায়ে। মেয়ের ইচ্ছার যেন পরিবর্তন হয়, তাই তাকে দেশ ভ্রমণে পাঠিয়ে দিলেন। ভ্রমণে গিয়ে তিনি রোমান ক্যাথলিক কনভেন্টে সন্ন্যাসিনীদের সেবামূলক কাজ দেখে উৎসাহিত হলেন। তিনি সেখানে (জার্মানে) তিন মাস প্রশিক্ষণ নিলেন এবং ভাবলেন ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়ে এ ধরনের একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করবেন। ২৮ বছর বয়সে ৩৮ বছরের সম্ভ্রান্ত, সুঠাম চেহারার সিডনি হার্বাটের সঙ্গে ইউরোপ ভ্রমণের সময় প্রগাঢ় বন্ধুত্ব হয়। তিনি জানতেন বিয়ে করলে সেটা সেবার কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। ইউরোপের হাসপাতালের কাজকর্ম, কাজের পদ্ধতি তিনি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করলেন। হাসপাতাল ছিল রীতিমতো আতঙ্কের জায়গা। সেখানে যেতে লোকেরা ভয় পেত। নোংরা, অস্বাস্থ্যকর, দূষিত পরিবেশ, বিভিন্ন রোগে আক্রান্তদের গাদাগাদি করে একসঙ্গে রাখা স্যাঁতসেঁতে ছাতা পরা মেঝে, ভ্যাপসা গন্ধÑ এগুলো ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরে এলে তার পিতামাতা মনে করলেন তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হবে। কিন্তু তিনি আবার বললেন, আমি সেবিকা হতে চাই। পুনরায় মেয়ের কথা শুনে বাবা-মা চমকে উঠলেন। বিভিন্নভাবে বাধা দিয়ে ব্যর্থ হলেন এবং পরিশেষে অশ্রুসিক্ত চোখে মেয়ের ইচ্ছার প্রতি সম্মতি দিলেন।

১৮৫৪ সাল। তখন ব্রিটিশ সেনাবাহিনী পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তারা কোনো যুদ্ধে হারতে জানে না। এটাই ছিল তাদের ধারণা। এমন একটা সময়ে ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং তুর্কি জোটের সফঙ্গ রাশিয়ার যুদ্ধ। ঝকমকে ইউনিফর্ম পরা সৈন্যরা জাহাজে উঠেছে, যে জাহাজ তাদের নিয়ে যাবে কৃষ্ণসাগরের এক উপদ্বীপ ক্রিমিয়ায়। রোদে ঝলমল করছে পতাকা, ব্যান্ড বাজছে, প্যারেডের পুরোভাগে গর্বিত ভঙ্গিত ড্রাম বাজছে। এই দৃশ্যটা ইতিহাসের সোনালি পাতায় আজও লেখা রয়েছে অবরুদ্ধ তুর্কিদের সাহায্য করতে উত্তরের দিকে জাহাজ নিয়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী অগ্রসর হলো। তখনও কেউ ভাবতে পারেনি তারা পর্যদুস্ত হবে রোগ, বিশৃঙ্খলা, ঠান্ডার প্রকোপ আর ক্ষুধার কাছে। যুদ্ধশিবিরে হঠাৎ কলেরা মহামারি রূপ নিল। ব্রিটিশ সেনারা শুনতে লাগল পানিতে মৃতদেহ ছুড়ে ফেলার ঝপাং ঝপাং শব্দ। মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই সমগ্র সেনাবাহিনী প্রায় অকেজো হয়ে পড়ল। ব্রিটিশ সেনাবাহিনী কৃষ্ণসাগর পেরিয়ে সেবাস্তোপোলের দিকে শুধু সৈন্যদের নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। মালবাহী পশু, তাঁবু, উনুন, ওষুধপত্র, হাসপাতাল, বিছানা অন্যান্য জিনিসপত্র সব পরে রইল খোলা মাঠে জন্তু-জানোয়ারের নাদিমাখা খড়ের ওপর। চিকিৎসা ব্যবস্থা তছনছ হয়ে গেল।

ঠিক এমন সময়ে সব বাধা উপেক্ষা করে ফ্লোরেন্স নাইপিঙ্গেল ৩৮ জন মহিলার একটি দল তৈরি করে যুদ্ধক্ষেত্রে চিকিৎসার জন্য রওনা হলেন। তিনি সেখানে পৌঁছে দেখলেন পরিকাঠামো ভেঙে পড়েছে, মূল্যবান খাদ্যসামগ্রী নষ্ট হয়ে পঁচ যাচ্ছে সংরক্ষণের অভাবে। নেই অপারেশন টেবিল, ওষুধপত্রের জোগান, আসবাবপত্র, নার্সদের ঘরে ছিল ইঁদুর আর নীল মাছির উৎপাত। কোনো সসপ্যান বা কেটলি নেই। যে পাত্রে মাংস ফোটানো হয়েছে। সেই পাত্রেই চা তৈরি হচ্ছে। প্রয়োজনীয় লণ্ঠন ও মোমবাতি নেই, রাতে শোনা যেত ইঁদুর চলাফেরার শব্দ। দুর্গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। প্রচন্ড শীত, গরম খাবারের অভাব, ঠান্ডায় জমে যাওয়া মাটি ছাড়া শোবার কোনো জায়গা নেই। চারদিকে অসুখ আর গ্যাংগ্রিনÑ সে এক নারকীয় অবস্থা। কুড়িটি বিষ্ঠা পাত্র থাকলেও অন্তত এক হাজার মানুষ ভুগছিল পেটের রোগে।

এর মাঝে ১৪ নভেম্বরের এলো এক প্রবল ঝড়। সৈন্য বাহিনীর সব তাঁবু উড়ে গেল। শুধু লোকগুলো পড়ে রইল একেবারে খোলা আকাশের নিচে। প্রতিটি জাহাজ ডুবে গেল। সদ্য জাহাজে আসা অতি প্রয়োজনীয় গরম কাপড় ও জিনিসপত্র বাদ রইল না। তিনি যেমনি দয়ার প্রতিমূর্তি, তেমনি কাজের ক্ষেত্রে ছিলেন কঠিন, কঠোর। সামান্যতম বিচ্যুতি সহ্য করতে পারতেন না। কখনো কখনো আট ঘণ্টা এক নাগাড়ে হাঁটুতে ভর দিয়ে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে আহতদের ব্যান্ডেজ বেঁধেছেন। কখনো তাদের পোশাক পরিয়ে দিয়েছেন। নিজ হাতে রোগীদের জন্য খাবার তৈরি করেছেন এবং সহকর্মীর হাতে হাত লাগিয়ে হাসপাতালের আঙিনা পরিষ্কার করেছেন। যখন কারো অস্ত্রোপচার করতেই হতো, তখন তিনি তার পাশে থাকতেন। তাদের মনে আশার সঞ্চার করতেন। দিনে সম্ভব না হলে তিনি রাতে তুর্কি প্রদীপ হাতে নিয়ে সেই চার মাইল লম্বা বিছানার সারি ধরে ঘুরে দেখতেন। যখন আলো হাতে নিয়ে ঘুরে দেখতেন, তখন রোগীরা মুগ্ধ বিস্ময় চোখে তাকে দেখত। মনে হতো, এক মূর্তিময়ী দেবী যেন তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। তারা সব দুঃখ যন্ত্রণা মুহূর্তে ভুলে যেতেন। একজন সৈনিক চিঠিতে লিখেছিলেন, যখন তিনি আমাদের পাশ দিয়ে হাঁটতেন, এক অনির্বাচনীয় আনন্দে আমাদের মনপ্রাণ ভরে উঠত, তিনি প্রতিটি বিছানা অতিক্রমের সময় তার ছায়া পড়ত আমাদের শয্যার ওপর। সৈনিকরা পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে সেই ছায়াকে চুম্বন করত।

এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালের দূরত্ব কম ছিল না। তথাপি কোনো দায়িত্বভার গ্রহণে তিনি অসম্মতি প্রকাশ করেননি কখনো। প্রবল তুষারপাত, বৃষ্টির মধ্যেই তিনি বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে বেড়াতেন। সেখানকার কাজের তত্ত্বাবধান করতেন। তার আন্তরিক চেষ্টায় মৃত্যুর হার হাজার থেকে ষাটে এসে দাঁড়াল। যুদ্ধের পরে তার কাজ শেষে ফিরে আসার সময় নিজ ডায়েরিতে লিখলেন, ‘হে আমার দুর্ভাগ্য সন্তানরা, আমি এক দুষ্টু মায়ের মতো তোমাদের ক্রিমিয়ার কবরে ফেলে রেখে ঘরে চললাম।’ ক্রিমীয় থেকে আসার জন্য ব্রিটিশ সরকার তার সম্মানে একটি আলাদা জাহাজ পাঠাতে চাইলেন। কিন্তু সে অনুরোধ তিনি প্রত্যাখ্যান করে সবার সঙ্গেই দেশে প্রত্যাবর্তন করলেন। সব দেশ তাকে সম্মান জানানোর জন্য প্রস্তুত। কিন্তু নাম নিয়ে হইচই করা তার অপছন্দ ছিল। শুধু মহারানি ভিক্টোরিয়ার দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি যোগ দিয়েছিলেন। এর পরের ইতিহাস খুবই ছোট। ধীরে ধীরে তার দৃষ্টিশক্তি কমতে কমতে একসময় তিনি অন্ধ হয়ে গেলেন। ১৯০৭ সালের নভেম্বরে ইংল্যান্ডের রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড ফ্লোরেন্স নাইটঙ্গেলকে ‘অর্ডার অব মেরিট’ সম্মানে ভূষিত করলেন। ১৯১০ সালের মে অনুষ্ঠিত হলো ‘নাইটিঙ্গেল ট্রেনিং স্কুল ফর নার্সেস’-এর সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব। ১৯১০ সালের ১৩ আগস্ট তিনি ৯০ বছর বয়সে ঘুমে ঢলে পড়লেন, যে ঘুম আর কখনো ভাঙল না। ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’-এর নিজস্ব ইচ্ছা অনুযায়ী অ্যাম্বলিতে তাদের আদি বাড়ির কাছাকাছি, অনাড়ম্বরভাবে তাকে সমাধিস্থ করা হয়। তবে ব্রিটিশরা তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে কার্পণ্য করেনি। শুধু একটি ছোট্ট ক্রুশ স্মৃতিফলক হয়ে আজও তার সমাধিকে আলোকিত করে রেখেছে। এর চেয়ে মহৎ কোনো স্মৃতিসৌধ চাননি মহীয়সী এই নারী।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

kaisardinajpur@yahoo.com

 

"