বিশ্লেষণ

কূটনৈতিক সম্পর্কে জাপান-বাংলাদেশ

প্রকাশ : ১৫ মে ২০১৯, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহ্যের অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত। স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনালগ্নে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জাপান সফরকালে তাকে যে অবিস্মরণীয় সংবর্ধনা দেওয়া হয়, তা দুই দেশকে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ করে। বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের ভূমিকাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। সহযোগিতার এ ধারা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ সফররত জাপানের অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ-বিষয়ক মন্ত্রী তোশিমিৎসু মোটেগি। এমনকি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ টোকিওতে গঠিত প্রবাসী বাঙালিদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন-জাপান, যা ১৯৯২ সাল থেকে বাংলাদেশ সিটিজেনস ফোরাম-জাপান নামে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় জাপানি জনমত ও সমর্থন আদায়ে এবং পরবর্তীকালে জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে আর্থসামাজিক সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনে গঠনমূলক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

জাপানে বর্তমানে কমবেশি ১৫ হাজার বাংলাদেশি পড়াশোনা ও চাকরি সূত্রে অবস্থান করছেন। দুই দেশের মৈত্রীবন্ধনে এদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিগত ২০ বছরে প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স প্রেরণসহ প্রবাসীরা বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রসারে রেখেছেন কার্যকর ভূমিকা। প্রবাসীরা জাপানি ভাষা আয়ত্ত করে জাপানি পরিবার ও তাদের নিয়োগ কর্তৃপক্ষ জাপানি শিল্পোদ্যোক্তাদের কাছে বাংলাদেশে জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ-সুবিধার কথা সহজে তুলে ধরতে পারে। বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তারা। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, তারা জাপানে তাদের বাংলাদেশি কর্মচারীদের মাধ্যমে বাংলাদেশে আসতে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন।

বাংলাদেশ এবং এর জনগণের প্রতি জাপানিদের আগ্রহ বেশি হওয়ার যেসব কারণ অনুসন্ধানে জানা যায় তার মধ্যে প্রথমটি হলো নৃতাত্ত্বিক। বাংলাদেশের উপজাতীয় সম্প্রদায়ের মুখনিঃসৃত ভাষা এবং তাদের শারীরিক আকার-আকৃতির সঙ্গে জাপানিদের কিছু মিল লক্ষ করা যায়। মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড এমনকি চীনের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের জনজীবন ও সংস্কৃতির প্রভাব বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তবর্তী অঞ্চলে, বিশেষ করে উপজাতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে লক্ষ করা যায়। দ্বিতীয় কারণ ধর্মীয়। জাপানিদের একটি বড় অংশ বুদ্ধ ধর্মাবলম্বী। বুদ্ধধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধ নেপালের কপিলাবস্তুতে জন্মগ্রহণ করেন এবং পাল ও মৌর্য যুগে বাংলাদেশ অঞ্চলেই বুদ্ধধর্মের সর্বাধিক প্রচার ও প্রসার ঘটে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের পাহাড়পুর, মহাস্থানগড় ও ময়নামতিতে প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠা এবং এসব বিদ্যায়তন ও ধর্মশালাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার ঘটে। বিক্রমপুর অঞ্চলে শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্করের জ্ঞানসাধনার দীপ্তি এ কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একসময় বাংলা অঞ্চলই বৌদ্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞান বিস্তারের তীর্থক্ষেত্র ছিল। বাংলাদেশের প্রতি জাপানিদের আগ্রহ সেই নাড়ির টানেই। তৃতীয় কারণটি হলো ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। বাংলাদেশের গাঢ় সবুজ অরণ্যানীশোভিত পাহাড়ের পাদদেশে সমতল ভূমির সমন্বিত সমাহার, অবারিত নৌপথ আর কৃষিজমি, পাহাড় আর সমুদ্রমেখলা ও নদী-নালাবিধৌত অববাহিকা ও এর আবহাওয়া যেন জাপানেরই প্রতিচ্ছবি। সমপর্যায়ের ভৌগোলিক ও নৈসর্গিক অবস্থানে জীবনযাপনকারী বাংলাদেশ ও জাপানের জনগণের অন্যতম খাদ্য ভাত ও মাছ। দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ হলো চতুর্থ কারণ। প্রাচীনকাল থেকেই উভয় অঞ্চলের জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক সখ্য ও যোগাযোগ ছিল বোঝা যায়। যেমন জাপানে পরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত একটি রঙের নাম বেঙ্গারু। জাপানিরা বেঙ্গলকে বেঙ্গারু আর বাংলাদেশকে বাঙ্গুরা দেশ বলে। জাপানিরা ‘ল’-এর উচ্চারণ ‘র’ করে থাকে। বাংলা ভাষায় বৌদ্ধ প্রভাব সম্পর্কে বিদগ্ধ জাপানি গবেষক অধ্যাপক সুয়োশি নারা জানিয়েছেন, প্রায় ৪০০ বছর আগে জনৈক জাপানি শিল্পী বাংলা অঞ্চল থেকে যে বিশেষ রংটি নিয়ে যান এবং জাপানে যার বহুল ব্যবহার প্রচলিত হয়, তার নাম হয়ে যায় বেঙ্গারু। বাংলার চারু ও কারুশিল্প চর্চার সঙ্গে জাপানিদের আগ্রহ ও সম্পর্কেরও এটি একটি প্রাচীন নিদর্শন বলে তিনি মনে করেন।

বিশ শতকের শুরু থেকেই জাপানিদের সঙ্গে বাঙালিদের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন রচনা করেন রবীন্দ্রনাথ, চারু ও কারুশিল্প চর্চার বিনিময়ের মাধ্যমেই। সর্বোপরি দুই দেশের মধ্যে মেলবন্ধন ও সহমর্মিতার পরিবেশ সৃজিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাসবিহারী বসু, নেতাজি সুভাসচন্দ্র বসু, বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাকেশি হায়াকাওয়া প্রমুখের প্রচেষ্টায়। ১৯৭৩ সালের অক্টোবর মাসে জাপানে বাংলাদেশ থেকে শীর্ষ পর্যায়ের প্রথম সফরের সময় বাংলাদেশ-জাপান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রে যে সুযোগ সৃষ্টি হয়, তাকেশি হায়াকাওয়া ছিলেন তার অন্যতম রূপকার। ১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর হায়াকাওয়া সস্ত্রীক বাংলাদেশ সফরে এলে রাষ্ট্রাচার উপেক্ষা করে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রিসভার সিনিয়র সদস্যদের নিয়ে পদ্মা গেস্টহাউসে তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও সম্মান প্রদর্শনে আসার ঘটনাটি জাপান-বাংলাদেশের মধ্যে সুদূরপ্রসারী সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সোপান বলে হায়াকাওয়া তার আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন। ১৯৭৬ সালের ১৬ মার্চ বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে আট সদস্যের জাপানি প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফরে নেতৃত্ব দেন হায়াকাওয়া। ১৯৭৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় জাপান এয়ারলাইনসের বিমান ছিনতাই ঘটনার সফল নিষ্পত্তিতে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের সার্বিক সহযোগিতার প্রতি জাপানের সরকার ও জনগণের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে ২৭ অক্টোবর জাপান সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে হায়াকাওয়া চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশ সফর করেন এবং সে বছর ১৬ ডিসেম্বর জাপান বাংলাদেশকে একটি বোয়িং ৭৭৭ উপহার দেয়।

এ ছাড়া অর্থনৈতিক অবস্থানের দিক দিয়ে ব্যাপক ব্যবধান সত্ত্বেও এশিয়ার এ দুটি দেশের সরকার ও জনগণের মধ্যে বিদ্যমান সুসম্পর্ক সুদৃঢ়করণ ও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা সম্প্রসারণের ঐকান্তিক ইচ্ছা কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বার্ষিকী উদযাপনের নানা আগ্রহ-আয়োজনের মধ্যে প্রতিফলিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য স্বার্থ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের আধুনিক পর্যায়ে প্রাধান্য পেলেও বর্তমান সম্পর্কের ভিত্তি সুদীর্ঘ সময়ের গভীরে প্রোথিত। ওইসিডি সদস্য দেশগুলোর মধ্যে শিল্পোন্নত জাপানই সর্বপ্রথম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এশিয়ার সমৃদ্ধ দেশগুলোর অন্যতম জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের প্রেক্ষাপটে মিত্রশক্তির নেতৃত্বদানকারী যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার সময় জাপান তখনো মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির প্রভাববলয়েরই একটি দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা চুক্তির বদৌলতে জাপান ওকিনাওয়া দ্বীপের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় সে বছর। ১৯৭২ সালেই জাপানের সঙ্গে চীনের দীর্ঘদিনের বিরোধ প্রশমিত হয়ে সিনো জাপান কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপরীত অবস্থান গ্রহণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো চীনও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে পাকিস্তানের মিত্র দেশ হিসেবে বিপরীত অবস্থানে ছিল। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে জাপান সরকার ও জনগণের সমর্থন এবং বিজয়ের অব্যবহিত পরে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের সিদ্ধান্ত নিয়ে জাপান নিঃসন্দেহে তাৎপর্যবাহী ও সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়।

জাপানিদের ভৌগোলিক অভিজ্ঞানে বর্তমান বাংলাদেশ হচ্ছে তাদের নিজেদের নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অর্থনীতির বলয়ভুক্ত দেশগুলোর সীমান্ত। তাদের বিবেচনায় বার্মা বা অধুনা মিয়ানমারই হচ্ছে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পশ্চিম প্রান্ত। হিমালয়, আসাম, লালমাই পাহাড় পেরিয়ে সমতল ভূমিতে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আসা আরব বণিকদের প্রবেশ এবং মধ্য এশিয়া থেকে আসা মোগল আর ইউরোপ থেকে আসা ইংরেজ শাসনাধীনে দীর্ঘদিন থাকার কারণে এ অঞ্চলকে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় ভাবধারার অবগাহনে গড়ে ওঠা দেশগুলোর সদস্য ভাবা হয়। বাংলাদেশ এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এবং মধ্য এশীয়-ইউরোপীয় দেশগুলোর ঠিক মধ্যবর্তী দেশ। বাংলাদেশকে এ দুই ভিন্নধারার মধ্যে মেলবন্ধন সৃষ্টির দ্যোতক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এশীয় ঐকতান সৃষ্টিতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রয়াস এবং এর ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অবস্থানকে বিশেষ তাৎপর্যবহ বলে জাপান মনে করে। এ ছাড়া আইটি পার্কগুলোয় তথ্যপ্রযুক্তির প্রশিক্ষণ ও গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণে জাপানের সহযোগিতার প্রস্তাব করেন। বাংলাদেশ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেবিকা নেওয়ার আহ্বান জানালে জাপানের মন্ত্রীও এ ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া দেন। প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তার সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথা পুনরুল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশ সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের দুর্দিনে যেসব দেশ বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে এগিয়ে এসেছে জাপানের স্থান সবার ওপরে। বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দ্রুত উন্নয়নের পথ দেখাবেÑ আমরা এমনটিই আশা করতে চাই। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি ও সমুদ্রসম্পদ আহরণে জাপানি সহযোগিতা নিশ্চিত হলে তা হবে এক বড় অর্জন।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

raihan567@yahoo.com

 

"