মুক্তমত

তৃতীয় লিঙ্গকে কর্মমুখী করুন

প্রকাশ : ১৪ মে ২০১৯, ০০:০০

টি এইচ জায়িম

হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গ। এই শব্দটার সঙ্গে পরিচিত নয় এ রকম লোক খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। হিজড়া জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ হলেও এ জনগোষ্ঠীটি অবহেলিত ও অনগ্রসর। জন্মের পর থেকেই প্রায় সবখানেই অবহেলিত তারা। এমনকি পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল মায়ের কোলেও ঠাঁই হয় না অনেকের।

শিশুকাল থেকেই অবহেলা, তাচ্ছিল্য ও বিড়ম্বনার শিকার হয়ে তারা বিভিন্ন অনৈতিক কজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন আবেদনময়ী অঙ্গভঙ্গি করে চাঁদাবাজি আর চাঁদা না দিলে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল এবং লাঞ্ছিত করাই যেন তাদের সামাজিকতার মধ্যেই পড়ে। অনেক সময় আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে তারা। বর্তমানে এটি প্রকট আকার ধারণ করেছে। ফলে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। হিজড়াদের চাঁদাবাজি এখন যেন এক অনৈতিক ব্যবস্যায় পরিণত হয়েছে। তবে তাদের এ আচরণের জন্য তাদের অভিযুক্ত করা ঠিক হবে না। এর জন্য দায়ী আমাদের সমাজ ব্যবস্থাই।

সম্প্রতি বেসরকারি কয়েকটি টিভি চ্যানেলে হিজড়াদের নিয়ে তৈরিকৃত প্রতিবেদন দেখে চমকে উঠতে হয়। প্রতিবেদনে দেখা যায়, হিজড়াদের মধ্যে একটি বিরাট অংশ ছেলে কিংবা মেয়ে। পরে তারা স্ব-ইচ্ছায় হিজড়া হয়েছে। অবহেলিত এই সম্প্রদায়ের সার্বিক উন্নয়নে সম্পৃক্তকরণের লক্ষ্যে সরকার হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল। কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল স্কুলগামী হিজড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে চারস্তরে উপবৃত্তি প্রদান, ৫০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের অক্ষম ও অসচ্ছল হিজড়াদের বিশেষ ভাতা প্রদান ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মক্ষম হিজড়া জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আয়বর্ধনমূলক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করে তাদের সমাজের মূল স্রোতধারায় ফিরিয়ে আনা। এ লক্ষ্যে ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে ‘পাইলট কর্মসূচি’ হিসেবে সাত জেলায় এ কর্মসূচি শুরু হয়। ২০১২-১৩ অর্থবছরে এ কর্মসূচিতে বরাদ্দ ছিল ৭২,১৭,০০০ (বাহাত্তর লাখ সতের হাজার) টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে নতুন ১৪ জেলাসহ মোট ২১ জেলায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৪,০৭,৩১,৬০০ (চার কোটি সাত লাখ একত্রিশ হাজার ছয়শ টাকা)। ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের কর্মসূচির বরাদ্দ ৪,৫৮,৭২,০০০.০০ (চার কোটি আটান্ন লাখ বাহাত্তর হাজার) টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৬৪ জেলায় এ কর্মসূচি শুরু করা হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ কর্মসূচিতে ৬৪ জেলায় বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ ১১ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

কর্মসূচির অধীনে হিজড়া শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা ও ১৮ বছর বয়সের ঊর্ধ্বে কর্মক্ষম ব্যক্তিদের ট্রেডভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। প্রশিক্ষণার্থীদের প্রশিক্ষণোত্তর অফেরতযোগ্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। কিন্তু এ কর্মসূচির পরেও হিজড়াদের চাঁদাবাজি বন্ধ হচ্ছে না। ট্রেনে উঠলেই যেন তাদের হাতে জিম্মি হয়ে যায় সাধারণ মানুষ। তাদের এ বিষয়ে কিছু বললে তাদের উত্তর একটাই ‘আমাদের তো কেউ কাজ দেয় না, আমরা কী করে খাব?’ তা হলে লাখ লাখ টাকার এ কর্মসূচি দিয়ে কী হলো? আমরা কথায় কথায় লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণের কথা বললেও খুব বেশি কাজের সুযোগ তারা পায় না। তাই এ কর্মসূচির পাশাপাশি এদের কাজের সুযোগ করা দরকার। এতে একদিকে তারা যেমন চাঁদাবাজিসহ অনৈতিক কাজ থেকে দূরে আসবে; অন্যদিকে দেশের উন্নয়নে তারা অংশীদার হতে পারবে। ২০১৮ সালের ২১ মে বিবিসিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন মতে, হিজড়াদের পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। এ উদ্যোগকে সামনে রেখে বহুমুখী প্রকল্পের মধ্য দিয়ে হিজড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সমাজে তাদের সম্মান ও সামাজিক নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করতে পারলেই বিষয়টির নান্দনিক সমাধান সম্ভব।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

thjaeem@gmail.com

 

"