পর্যবেক্ষণ

লক্ষ্য হতে হবে পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবন

প্রকাশ : ১৪ মে ২০১৯, ০০:০০

সাধন সরকার

বিশে^র বড় বড় শহরে দূষণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, বর্জ্যদূষণ, পলিথিন দূষণ, প্লাস্টিক দূষণ, নদীদূষণসহ বিভিন্ন দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব আজ বিশ^জুড়ে আলোচিত। বিভিন্ন দূষণের কারণে মানবস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি হচ্ছে। দূষণের প্রভাবে প্রকৃতি-পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। পৃথিবী যতই এগিয়ে যাচ্ছে দূষণও পাল্লা দিয়ে যেন এগিয়ে যাচ্ছে! তথ্যমতে, পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে তো বটেই বাংলাদেশেও প্রতি বছর বিভিন্ন দূষণের কারণে বহু লোক মারা যাচ্ছে। শিশুরাও বিভিন্ন দূষণের শিকার হচ্ছে। দূষণের কারণে শিশুর বিকাশ ও বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে দূষণ বাড়ছে বৈকি কমছে না! শহরগুলোতে জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে বিভিন্ন দূষণ সমস্যা। যেকোনো শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত না হলে সে শহরের পরিবেশও ভালো থাকে না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বায়ুদূষণসহ বিভিন্ন দূষণের সম্পর্ক রয়েছে। পরিবেশের শত্রু নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার চলছে দেদার। প্লাস্টিক-পলিথিনের কারণে শহরের ড্রেন-নালাগুলো আটকে গিয়ে বর্ষা মৌসুমে শহরগুলোতে তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। পলিথিন-প্লাস্টিক নদ-নদী ও সমুদ্রদূষণে প্রভাব ফেলছে। বিভিন্ন দূষণের কারণে শুধু শহরগুলোতে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে।

এটা মোটামুটি ধরে নেওয়া যায় যে, পরিবেশের বিভিন্ন দূষণ রোধে পরিবেশবান্ধব যথাযথ প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দূষণও বেড়ে যাবে। শুধু সচেতনতার ওপর জোর দিয়ে পরিবেশদূষণ রোধে কাক্সিক্ষত ফলাফল পাওয়া যাবে না, জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে পরিবেশবান্ধব ছোট ছোট উদ্ভাবনকেও কাজে লাগাতে হবে। জোর দিতে হবে বিজ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহারের ওপর। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বর্জ্য থেকে সার, বিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস ও আঠা উৎপাদন করা হয়। যদিও বাংলাদেশের কোনো কোনো জেলায় জেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষ থেকে সীমিত পরিসরে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আবার বাংলাদেশের কোনো কোনো স্থানে বর্জ্য থেকে জৈব সার ও বায়োগ্যাস উৎপাদন করা হচ্ছে। গৃহস্থালি বর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদন খুবই সহজ একটি পদ্ধতি। সরকারিভাবে তথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে গ্রাম-শহর পর্যায়ে কৃষকদের মাঝে এ ধারণা আরো সহজভাবে ছড়িয়ে দিতে পারলে বর্জ্যরে দূষণ কমবে এবং কৃষকরা লাভবান হবেন। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারিভাবে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাস তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করে তা শহরগুলোতে ছড়িয়ে দিতে হবে। ই-বর্জ্যও বিশ^জুড়ে আলোচিত একটি বিষয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ই-বর্জ্যরে দূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করছে। এখনই ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে আগামী বছরগুলোতে ই-বর্জ্যরে দূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এ ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, অনেক কোম্পানি পুরোনো বিক্রীত ইলেকট্রনিকস সামগ্রী ব্যবহার শেষে ফিরিয়ে নিয়ে আলোচনাসাপেক্ষে নতুন ইলেকট্রনিকস সামগ্রী দেওয়ার প্রক্রিয়া চালু করেছে।

জনসাধারণ পর্যায়ে যেকোনো ইলেকট্রনিকস সামগ্রী সামান্য ত্রুটি দেখা দিলে ওই ইলেকট্রনিকস সামগ্রী পুরোপুরি ফেলে না দিয়ে বারবার ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা, যত বেশি ইলেকট্রনিকস সামগ্রীর ব্যবহার পরিশেষে তত বেশি ই-বর্জ্য বৃদ্ধি! ইলেকট্রনিকস কোম্পানিগুলো যদি তাদের বিক্রীত সামগ্রী জনসাধারণ পর্যায়ে সর্বোচ্চ ব্যবহারের (ইলেকট্রনিকস সামগ্রীর কোনো অংশ নষ্ট হলে তা শর্তসাপেক্ষে কয়েকবার সারিয়ে দেওয়ার পর) পর জনসাধারণের কাছ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে সেসব ইলেকট্রনিকস রিসাইক্লিং করার ওপর গুরুত্ব দেয়; তা হলে ই-বর্জ্যরে দূষণ কমবে। প্রতিষ্ঠিত সব ইলেকট্রনিকস কোম্পানি যদি এ প্রক্রিয়ার ওপর নজর দেয় বা সরকারিভাবে যদি কোম্পানিগুলোকে এ ব্যাপারে চাপ দেওয়া হয়, তা হলে ই-বর্জ্যরে দূষণ অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করি। বড় বড় প্লাস্টিক কোম্পানিও যদি তাদের বিক্রীত সামগ্রী (সব ধরনের পানির বোতলসহ নিত্য ব্যবহৃত হাজারও রকম প্লাস্টিক পণ্য) ব্যবহারের পর গ্রাহক পর্যায়ে কিছু প্রণোদনার মাধ্যমে ফিরিয়ে নেওয়ার পর এসব সামগ্রী রিসাইক্লিংয়ের ব্যবস্থা করে তা হলে প্লাস্টিক দূষণ অনেকটাই কমে আসবে। প্লাস্টিক রিসাইক্লিং প্রক্রিয়া একটি বহুল ব্যবহৃত বিশ^ব্যাপী আলোচিত প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের শহরে-গ্রামের বহু স্থানে ক্ষুদ্রভাবে এ রিসাইক্লিং প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। আবার ফেলনা প্লাস্টিক কুচিকুচি করে তা দিয়ে অন্যান্য সামগ্রী বানিয়ে বিদেশেও রফতানি করা হচ্ছে। ফেলনা প্লাস্টিক দিয়ে বিভিন্ন সামগ্রীও তৈরি করা হচ্ছে। প্লাস্টিক কোম্পানিগুলোর রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ার জোর দেওয়ার পাশাপাশি প্লাস্টিক দূষণ রোধে দরকার সরকারের সহযোগিতা। প্লাস্টিক রিসাইক্লিং ছোট-বড় প্রতিষ্ঠানকে সরকারি সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে এ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে হবে। দিন দিন প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার বাড়ছে। তাই প্লাস্টিক রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ার ওপর আরো জোর দিতে না পারলে সামগ্রিক পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবসহ জনস্বাস্থ্যের ওপর ঝুঁকি তৈরি হবে।

সম্প্রতি জানা গেল, পাবনার ঈশ^রদীর এক যুবক কুড়িয়ে পাওয়া পুরোনো পলিথিন পুড়িয়ে তৈরি করছেন জ¦ালানি তেল, পেট্রল, ডিজেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস। প্রক্রিয়াটি এমনÑ একটি বড় ড্রামে পলিথিন ভর্তি করে তার নিচে আগুন জ¦ালিয়ে পলিথিন গলানো হচ্ছে। ড্রামের উপরিভাগে স্থাপিত পাইপলাইনের মাধ্যমে জমা করা হচ্ছে প্লাস্টিক পোড়ানো জলীয়বাষ্প। সেখান থেকে পাইপের মাধ্যমে একটি প্লাস্টিকের জারে জমা হচ্ছে পেট্রল, অন্য জারে ডিজেল এবং অন্য একটি মাধ্যম দিয়ে বের হচ্ছে গ্যাস। এ ছাড়া প্লাস্টিকের পোড়া বর্জ্য দিয়ে ফটোকপি মেশিনের কালিও পাওয়া যাচ্ছে। ব্যতিক্রমী এ উদ্যোগ ও উদ্ভাবনে অরক্ষিত বর্জ্যরে মাধ্যমে পরিবেশ বিনষ্টকারী পলিথিন যেমন ধ্বংস করা হচ্ছে; তেমনি ব্যক্তি নিজেও লাভবান হচ্ছেন। এমন সব ছোট ছোট পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিকে এগিয়ে নিতে দরকার শুধু প্রণোদনা। এ ছাড়া নদ-নদীতে প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণ ঠেকাতে নদীতে পানি যাওয়ার উৎসমুখে (নালা, ড্রেন মুখে) জাল দিয়ে ঘিরে দেওয়ার প্রযুক্তিও এখন দেখা যাচ্ছে। এর ফলে ড্রেন-নালা দিয়ে যাওয়া নদ-নদীতে প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণ ঠেকানো যাচ্ছে। এ ধরনের ছোট ছোট পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবনকে কাজে লাগাতে হবে। এ ধরনের উদ্ভাবনের সঙ্গে জড়িতদের পুরস্কার ও প্রণোদনা দিতে হবে। তা হলে অন্যরাও এমন সব পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবনে উৎসাহিত হবেন। পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবন যত বেশি কাজে লাগানো যাবে, পরিবেশদূষণ রোধ করা তত সহজ হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"