মতামত

জামায়াত ত্যাগীরা নতুন মুখোশে

প্রকাশ : ১৪ মে ২০১৯, ০০:০০

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

সম্প্রতি জামায়াতের কিছু নেতাকর্মী ও বুদ্ধিজীবী নতুন একটি দল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। তারা কিছুদিন আগে জামায়াত ছেড়েছেন বলে দাবি করেছেন। শিগগিরই তারা নতুন দল গঠন করবেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন। দলের নামকরণ ‘জন-আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ’ বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর অন্যতম উদ্যোক্তার নাম হচ্ছে মজিবুর রহমান (মঞ্জু)। তিনি জামায়াত থেকে সম্প্রতি বহিষ্কৃত হয়েছেন। এককালে তিনি জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরের সভাপতি ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরার সদস্য ছিলেন। জামায়াতের অপর প্রভাবশালী নেতা ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক জামায়াত থেকে পদত্যাগ করেছেন। তিনি লন্ডনে অবস্থান করছেন। একসময় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মামলা পরিচালনার মূল দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন। পরে দেশত্যাগ করেছেন। নতুন এ দল গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে তিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত আছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে লন্ডন থেকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, তিনি নাগরিক সমাজের একজন হয়ে দেশে থাকতে চান। এই দুজন ছাড়াও বেশ কিছু জামায়াতের নেতাকর্মী সেদিনের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তৃতায় জাতীয় মুক্তি ও জন-আকাক্সক্ষার নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে উজ্জীবিত একদল আশাবাদী মানুষের উদ্যোগ বলে তিনি দাবি করেন। স্বাধীন সত্তার বিকাশে অধিকার ও কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনীতির লক্ষ্যে এ সংগঠন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হতে যাচ্ছে বলে সাবেক এই জামায়াত নেতা সবাইকে জানান দিলেন। একই সঙ্গে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে সাবেক জামায়াত নেতা বলার চেষ্টা করেছেন যে, মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেটি বাংলাদেশে তার মতে এখন অনুপস্থিত তাই তার নবগঠিত দল মুক্তিযুদ্ধের ওই তিন আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করবে বলে তিনি দাবি করেন। অবশ্য সাংবাদিকরা যখন তাকে বাংলাদেশের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত চার মূলনীতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন এবং সে সম্পর্কে তার দলের অবস্থান কী হবে, সেদিকে মজিবুর রহমান (মঞ্জু) কথা বলতে চাননি। একই সঙ্গে সাংবাদিক যখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর অবস্থান সম্পর্কে জানতে চান; তখন মজিবুর রহমান সে ব্যাপারেও কোনো কথা বলতে চাননি। বোঝাই গেছে মজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বলতে তিনটি লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিকে নিজের মতো করে বোঝাতে চেয়েছেন। মজিবুর রহমানের সেদিনের কথাবার্তার মধ্যেই যথেষ্ট অস্পষ্টতা এবং বিভ্রান্তি লক্ষ করা গেছে। এসব বিষয়ে শুরুতেই যখন এমন চাতুর্যের আশ্রয় নিয়ে কথা বলার চেষ্টা হয়েছে; তখন বোঝাই গেল যে, মজিবুর রহমানরা বা তাদের পূর্বসূরিরা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে ১৯৭১ সালে যেভাবে প্রতিহত করতে চেয়েছিলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে গত সাড়ে চার দশকের বেশি সময় ধরে যেভাবে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী আদর্শ, বিকৃতি ও বিভ্রান্তিকে ছাত্রশিবির ও জামায়াতের মধ্যে লালন করেছেন, মনোজগতে সেটির যে ভিত্তি স্থাপন করেছেন তা থেকে বের হওয়া তাদের পক্ষে মোটেও সম্ভব নয় যে সেটি তার কথাবার্তার মধ্যেই পাওয়া গেছে।

বস্তুত অতি ডান বা অতি বাম রাজনৈতিক আদর্শে যারা দীর্ঘদিন লালিত-পালিত হন, তারা মূল দল থেকে বের হলেও উদারবাদী রাজনীতিতে কখনো নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার মতো ধ্যান-ধারণা বিশ্বাসের জায়গা রাখেন না। এ রাজনীতিগুলো চরম হঠকারী, বিকৃত মানসিকতার জন্ম দেয়। কেননা তারা রাজনীতিকে সমাজ, জনগণ, রাষ্ট্র, রাজনীতি ইত্যাদির বাস্তবতায় খুব বেশি চর্চায় বোঝার চেষ্টা করেন না। তাদের সংগঠকরা তাদের যেসব রাজনৈতিক শিক্ষাদীক্ষা দিয়ে ‘মানুষ’ করার চেষ্টা করেন তারা আর স্বাভাবিক ৮-১০টা যুক্তিবাদী, উদারবাদী মানুষের মতো চিন্তা করতে পারেন না। তাদের এক ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়; যেখানে উদারবাদী, গণতন্ত্রের ধারণাকে অত্যন্ত কঠোর সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখা হয়। যারা ওই আদর্শের পক্ষের রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রচিন্তা করেন তাদের উগ্র হঠকারী ডান-বাম সংগঠনের তাত্ত্বিকরা হয় শ্রেণিশত্রু কিংবা ধর্মশত্রু অথবা তাদের নিজেদের সংগঠনের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। সেভাবেই সমাজের বৃহত্তর উদারবাদী জনগোষ্ঠীকে তারা তাদের আদর্শের শত্রু দেখতে অভ্যস্ত হয়। এটি আমরা এ অঞ্চলে যারা একসময় উগ্র হঠকারী বাম রাজনীতির নামে নানা ধরনের সংগঠন করেছেন তাদের দীর্ঘ ইতিহাসে লক্ষ করেছি। ওইসব উগ্র বামরা শ্রেণিশত্রু খতম করতে গিয়ে রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে যে নৈরাজ্যের সৃষ্টি করেছিল তার শেষ পরিণতিতে তারা নিজেরাই টিকতে পারেনি। স্মরণ করলে দেখা যায়, বেশির ভাগ উগ্র বাম দলের নেতারা দল ভেঙেছেন, নতুন দল গঠন করেছেন, সেই দলও টিকিয়ে রাখতে পারেননি, দেশ এবং জাতির কোনো কল্যাণে তাদের দল, নেতাকর্মীরা কাজ করেছেনÑ এমন কোনো প্রমাণ নেই। এমনকি তারা মহান মুক্তিযুদ্ধের মতো দেশ ও জাতির মুক্তির পক্ষেও কোনো আন্দোলন করেননি, মুক্তিযুদ্ধেও অনেকেই অবদান রাখেননি, বিরোধিতা করেছেন, যুদ্ধের পর সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে নিজেরা যুক্ত থেকেছেন, দলের নেতাকর্মীদের দেশ ও জনগণের পক্ষে কাজ করতে চাইলে শাসক দলের বিরুদ্ধে গোপনে অস্ত্র ধারণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ইতিহাসের পরিহাস হচ্ছে এসব বিপ্লবী শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের প্রতি এতটাই অন্ধ ছিল যে, তারা পূর্ববাংলার জনগণের অধিকার আন্দোলনে কখনো যুক্ত হয়নি। পাকিস্তান রক্ষার নামে পাকিস্তানের স্বৈরাচারী, নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে অন্ধভাবে দাঁড়িয়েছিল। প্রতিবেশী ভারতকে এর রাষ্ট্র চরিত্রে না দেখে হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে চিত্রায়িত করেছে। ভারত পাকিস্তানের স্বার্থ ও দ্বন্দ্বকে ধর্মীয় চরিত্রদান করেছে। জামায়াতের প্রতিটি নেতাকর্মী সেই দীক্ষায় এতটাই অন্ধ হয়েছিল যে, পূর্ববাংলার জনগণের স্বাধিকার আন্দোলনকে তারা দেখতে পায়নি, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচন এবং ১৯৭১-এর মার্চ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং বিবর্তনকে যুক্তি দিয়ে দেখেনি, অন্ধত্ব দিয়ে অস্বীকার করার চেষ্টা করেছেন। ২৫ মার্চের গণহত্যা থেকে ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় পর্যন্ত পূর্ববাংলার জনগণের স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য জীবন-মরণ যুদ্ধকে অস্বীকার করেছে, এর বিরুদ্ধে তাদের প্রতিটি নেতাকর্মী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর চাইতেও ভয়ংকরভাবে বাঙালিবিরোধী হত্যাকারী হিসেবে অংশ নিয়েছে। বলা চলে জামায়াতের রাজনীতি দলের নেতাকর্মীদের এতটা অন্ধ কানা হিসেবে গড়ে তুলেছে। সে কারণে তারা এতটাই দেশবিরোধী অবস্থানে দলগতভাবে যুক্ত থেকেছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, উগ্র ডানপন্থার রাজনীতি শিক্ষা ও দীক্ষা লাভ করা।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জামায়াত নিষিদ্ধ ছিল। সেই নিষিদ্ধ হওয়াটি তাদের যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণেই ঘটেছে। নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ কোনোভাবেই শত্রুভাবাপন্ন হয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেয়নি। কারণ বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার দল এবং আরো কিছু উদারবাদী, যুক্তিবাদী রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে, কোটি কোটি মানুষের অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে। একটি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেই এ দেশটি স্বাধীন হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী এর কিছুই স্বীকার করেনি। তারা বঙ্গবন্ধুকে এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল নেতা হিসেবে কখনোই স্বীকার করেনি। তাদের আপত্তি বাংলাদেশের ব্যাপারে, এখানে তারা বঙ্গবন্ধুকে স্বীকার করে না। জাতির পিতা বলতে তারা ভিন্ন কিছু বোঝাতে চায়। আওয়ামী লীগ বলতেও তারা এমন কিছু ইঙ্গিত দিতে চায়, যা হিন্দুত্বের নামান্তর বলা যেতে পারে! এর কারণ হচ্ছে, তাদের রাজনৈতিক শিক্ষা-দীক্ষাই হচ্ছে বিকৃত, তত্ত্ব, তথ্য এবং পরচর্চা, পরনিন্দায় ভরপুর। জিয়াউর রহমানের কল্যাণে তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরে আসে। অচিরেই তারা বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ভাবাদর্শে ফিরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে রাজনীতিতে ডালপালা বিস্তার করতে শুরু করেছিল। ৮০-৯০ দশকে দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে দখলের তান্ডব চলেছিল; সেখানে উদার চিন্তাবাদী শিক্ষকদের তারা ধর্মবিরোধী হিসেবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সম্মুখে তুলে ধরার চেষ্টা করত। সে সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে বিষয়টি আমাকে খুবই হতবাক করত। অসংখ্য শিক্ষার্থী আমাদের ক্লাসে বেশ মনোযোগী ছাত্র হিসেবে ছিল। কিন্তু তাদের অনেকেই আমাদের ভিন্ন চোখে দেখত। যা আমাদের বেশ পীড়িত করত। কারণটি এই যে, এই শিক্ষার্থীদের মনোজগতে প্রকৃত জ্ঞানের চর্চার চাইতে রাজনীতির মিথ্যাচার, বিকৃত প্রচার-প্রচারণা, ধর্মের নাম ব্যবহার ইত্যাদি করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করা হতো। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে সহশিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ছিল, তাদের তারা একইভাবে শুধু পরিহারই নয়, রগকাটাসহ নানা ধরনের হত্যাচার নির্যাতনও করত। একসময়ের ছাত্রশিবিরের ক্যাডার বাহিনীর নগ্ন তান্ডবের কথা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কাছে বিভীষিকাময় ছিল। সেই ছাত্রশিবিরের নেতাই তো মজিবুর রহমান (মঞ্জু) ছিলেন। এত বছর জামায়াতের শূরার নেতা ছিলেন। অন্যদের সঙ্গে তার বা তাদের এমন কোনো আদর্শিক বিরোধ ঘটেনি; যা দেশ ও জাতির কাছে জানা ছিল। নিশ্চয় তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। হঠাৎ করে এখন তিনি বা তারা জামায়াত ছেড়ে ‘জন-আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ’ গড়ে তুলবেন এবং সেই ‘জন-আকাক্সক্ষার বাংলাদেশের’ মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের মূল নেতৃত্ব, জাতির পিতা, প্রথম সংবিধানের চার মূলনীতি ইত্যাদি তিনি গ্রহণ করবেনÑ এমনটি বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। কারণ জামায়াতের প্রতিটি নেতাকর্মীর মধ্যেই চাতুর্য ভরপুর থাকত বা আছে, এটি সহজে সংশোধনযোগ্য নয়। জামায়াত যারা এখন ছাড়ছেন কিংবা বহিষ্কৃত হচ্ছেন অথবা নতুন দল গঠনের কথা বলছে;Ñ এটিও মনে হয় চতুর মানুষদেরই আরেক চাতুর্যের খেলা।

লেখক : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক

 

"