পর্যবেক্ষণ

হারিয়ে যাচ্ছে খাল

প্রকাশ : ১৩ মে ২০১৯, ০০:০০

নজরুল ইসলাম

খালের ওপর ছোট্ট নাও, ছোট্ট নাওয়ে পাড়ি দাও। খালের ওপর এখন আর নাও বা নৌকা থাকে না। থাকবেইবা কোথা থেকে? খালই তো নেই। ভরাট, দখল আর দূষণে নিঃস্ব হয়ে গেছে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা আবহমান গ্রামবাংলার সেচকাজে ব্যবহৃত খালগুলো। রাজধানীজুড়ে প্রবহমান খালগুলোর করুণ মৃত্যুর গল্প এখন পুরোনো মানুষের মুখে মুখে। যেখানে এখন আর খালের কোনো অস্তিত্ব নেই, কিন্তু মন থেকে সরে যায়নি সেই স্মৃতিচিহ্ন। যদিও বারবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন ও ঢাকা জেলা প্রশাসনসহ ওয়াসা কর্তৃপক্ষ এসব খাল উদ্ধারের আশ্বাস দিয়েছে। গত ১০ বছরের বেশি সময় খাল উদ্ধারে ইতিবাচক কোনো পদক্ষেপ নজরে আসেনি।

প্রকৃতপক্ষে রাজধানীতে খালের সংখ্যা কতÑ এ নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। ওয়াসা, সিটি করপোরেশন, ঢাকা জেলা প্রশাসন ও মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান একেক রকম। রাজধানীর খাল সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ঢাকা ওয়াসা বলছে, নগরীতে খালের সংখ্যা ২৬। অন্যদিকে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খালের সংখ্যা ৫০। ঢাকা ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) ঢাকায় মোট খালের সংখ্যা ৪৩ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওয়াসার হিসাবে ১২ এবং জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের প্রতিবেদনে ২৪ খাল আংশিক প্রবহমান বলা হয়েছে। বাকি খালগুলোর বেশির ভাগ অবৈধ দখলে বিলুপ্ত, কিছু আবার আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়ে বিলুপ্তির পথে। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্প্রতি তৈরি করা ম্যাপটি অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য।

ওয়াসা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজধানীর ২৬ খাল ঢাকা ওয়াসাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১২টির সংস্কার চলছে। সারা দেশেই যখন দখলের খেলা চলছে, তখন একশ্রেণির দুষ্কৃতকারীরা প্রকৃতির ওপরও দখল নিচ্ছে। জাতীয় পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারলাম কিছু প্রভাবশালী লোক খাল দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। যে যেভাবে পারছে খাল দখল করে নিচ্ছে। দেখে মনে হবে দখলের মহোৎসব চলছে। রাজধানীর মুগদা থানার একটু সামনেই মান্ডা ব্রিজ। রাস্তার দুই পাশে সরু ড্রেন। আছে কালো বিবর্ণ পানির কমবেশি প্রবাহ। দুর্গন্ধে নাকে রুমাল চেপে চলেন পথচারীরা। এটি মান্ডা খাল নামে পরিচিত। সত্যিই বিস্মিত হওয়ার মতো খবর। একসময় এর পরিধি নাকি অনেক বড় ছিল। যুগের পর যুগ দখলের প্রতিযোগিতা, ময়লা-আবর্জনায় খালটি এখন ড্রেনে পরিণত হয়েছে। একসময় এ খাল দিয়ে চলত ছোট-বড় নৌযান। পণ্য পরিবহনেও এ খালের গুরুত্ব ছিল বেশ। এখন খালের জমিতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য স্থাপনা। সবার চোখের সামনে নির্বিচারে খালটি বেহাত হয়েছে। অথচ কেউ বাধা দেয়নি। তাইতো স্থানীয় বাসিন্দাদের দুঃখ এটিকে আর খাল বলা যায় না। রাজধানীর ড্রেনগুলোও অনেক বড়। এত গেল একটি খালের করুণ গল্প।

রাজধানীর খিলগাঁও রেলগেট ফ্লাইওভারসংলগ্ন ফার্নিচার দোকানগুলোর সামনে ‘খিলগাঁও-বাসাবো’ খালের নাম সংবলিত ঢাকা ওয়াসার একটি ফলক রয়েছে। এতে খাল দখলমুক্ত রাখতে সচেতনতামূলক বিভিন্ন কথা লেখা রয়েছে। তবে ফলকটির আশপাশের কোথাও খালের কোনো অস্তিত্ব নেই। রূপগঞ্জে সেচ প্রকল্পভুক্ত খালগুলোর দখল চলছেই। যার যেভাবে মন চাইছে, সে সেভাবেই খালগুলো দখল করে নিজের করে নিচ্ছে। সবাই যেন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। কেউ এর বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করছে না। উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাজারসহ পুরো এলাকাতেই এ রকম দখলের চিত্র দেখা যাচ্ছে। খালগুলো দখলের প্রক্রিয়ার সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীসহ স্থানীয় প্রভাবশালীরা জড়িত রয়েছে। রাজধানী ঢাকার অতি সন্নিকটে বালু নদের কোলঘেঁষে ত্রিমোহিনী খালের বাঁচার চেষ্টা। খালপাড়ঘেঁষে সারি সারি স্থাপনা। কাঁচা-পাকা দোকানঘর নির্মাণ করা হয়েছে খালের ওপর। রয়েছে আবাসিক ভবনও। বলতে গেলে ইচ্ছামতো স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে খালের বুকে। ফেলা হচ্ছে ময়লা-আবর্জনা। রাজধানীর খিলগাঁওয়ের ত্রিমোহনীর গুদারাঘাটের এই চিত্রই বলে দেয় কতটা লাগামহীনভাবে চলছে খাল দখলের মহোৎসব।

সরকারি জমি দখল করে অবাধে চলছে ব্যবসা-বাণিজ্য। পুরো খাল দখলে মরিয়া স্থানীয় ভূমিদস্যুরাও। ঐতিহ্যবাহী শত শত বছরের পুরোনো খাল শিল্প-কারখানার ও প্রভাবশালীদের অবৈধ দখলে চলে গেছে। হতকুচ্ছিত দানবের দল খালগুলোকে গিলে খাচ্ছে। নব্বইয়ের দশকের পর থেকে দখলের রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলছে। অবৈধ দখলদাররা পাকা ভবন, মার্কেট এমনকি শিল্প-কারখানা নির্মাণ করে দখলে নিচ্ছে। নির্মাণের প্রতিযোগিতায় ভরাট হয়ে যাচ্ছে দেশের খালগুলো। এ ছাড়া ব্রিটিশ আমলের পুরোনো খালও এখন প্রভাবশালীদের দখলে। এমন খালও রয়েছে যার চিহ্ন পর্যন্ত নেই। খালের অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আজ অবধি প্রশাসন কোনো প্রকার ব্যবস্থা নেয়নি। জানা গেছে, রাজধানীতে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ৫০ খালের অস্তিত্ব ছিল। এর আগে ছিল ৬৫। গত ২৯ বছরে ৩৬টির বেশি বিলীন হয়ে গেছে। বাদবাকি ২৬টির অস্তিত্ব খুুঁজে পাওয়া গেলেও দখল ও দূষণের হুমকির মধ্যে রয়েছে এসব জলাশয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলমান অবস্থার উন্নতি না হলে বা জলাশয় রক্ষায় কঠিন পদক্ষেপ না নেওয়া হলে আগামী ২০ বছরের মধ্যে রাজধানীতে আর খালের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। দখলে যাওয়া ৪৩ খাল উচ্ছেদ অভিযানে নামার কথা ছিল দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের। সিদ্ধান্ত হয়, খাল উচ্ছেদের পর সীমানা চিহ্নিত করা হবে। এরপর নির্মাণ করা হবে ওয়াকওয়ে। খালের দুই পাড়ে লাগানো হবে ফুলসহ নানা প্রজাতির গাছ। এখনো সবকিছু পরিকল্পনাতেই রয়েছে। ২০১৭ সালের ২২ জানুয়ারি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল, বক্স কালভার্ট অবৈধ দখলমুক্ত করার জন্য ঘোষণা দেন। প্রাথমিকভাবে নন্দীপাড়া-ত্রিমোহনী খাল ও হাজারীবাগ বেড়িবাঁধ এলাকার রাস্তা অবৈধ দখলমুক্ত করার অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছিলেন তিনি। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাজধানীর দখল হয়ে যাওয়া খালগুলো উদ্ধারে অভিযান চালিয়েছিল সেনাবাহিনী। অভিযানে সফলতাও এসেছিল। কিন্তু দখলমুক্ত রাখার ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়নি। তাই সব খাল এখন ফের দখল হয়েছে।

ঢাকার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ধোলাই খাল, নন্দীপাড়া খাল, ত্রিমোহিনী খাল ও ডিএনডি বাঁধ বন্যানিয়ন্ত্রণ খালে বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এসব অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করলে খালগুলো আবারও আগের মতো সচল হবে। তা ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন খালের মালিকানা ব্যক্তির নামেও রেকর্ড হয়ে গেছে। এসব জটিলতাও নিরসন জরুরি হয়ে পড়েছে। গোটা বাংলাদেশেই এ রকম অসংখ্য খাল আজ দূষণ ও দখলের কারণে বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে।

রাজধানীর জলাবদ্ধতার মূল কারণ নিয়ে সম্প্রতি ঢাকার খালগুলো নিয়ে একটি সচিত্র প্রতিবেদন তৈরি করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। এতে দেখা গেছে, ঢাকা মহানগরীতে খালের সংখ্যা ৪৩। এর মধ্যে ঢাকা ওয়াসা রক্ষণাবেক্ষণ করে ২৬। নয়টি খাল রাস্তা, বক্স-কালভার্ট ও ব্রিক স্যুয়ারেজ লাইনে পরিবর্তন করা হয়েছে। বাকি আটটি খাল রয়েছে জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে। ২০১৭ সালের ১৬ জুলাই নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ডিএনসিসির আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয় সভায় ‘ঢাকায় জলাবদ্ধতার কারণ এবং রাজধানীর খালগুলোর বর্তমান অবস্থা’ নিয়ে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। এসব খালের অধিকাংশ স্থানে প্রভাবশালীরা দখল করে বহুতল ভবন, দোকানপাট ও ময়লা আবর্জনায় ভরাট করে রেখেছে। ফলে খালে পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় বিলীন হয়ে গেছে অস্তিত্ব। সিটি করপোরেশনের প্রতিবেদনে জলাবদ্ধতা দূর করতে কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য খালের ওপর নির্মিত অবৈধ স্থাপনা অপসারণ, প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ, বিলীন হওয়া খাল উদ্ধার, পুনর্খনন ও বর্ষা মৌসুমের আগে খাল পরিষ্কার করতে হবে। ফের খাল দখলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত খালগুলোর প্রবাহ ধরে রাখার জন্য আগামী দুই মাসের মধ্যে দখলমুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন ডিএনসিসির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম। ওয়াসার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এ কাজ করা হবে বলে জানান তিনি। খালগুলো ওয়াসার অধীন। খালের পাড় ঢাকা জেলা প্রশাসনের অধীন। জেলা প্রশাসককে তিনি পর্যবেক্ষণ করতে আহ্বান জানিয়েছেন। খালের দুই পাশে যেসব অবৈধ স্থাপনা আছে, এগুলো ভেঙে ফেলা উচিত। আমরা মনে করি, কোনো খাল দখলে থাকবে না। আমরা দেখতে পেয়েছি নদীর পাড়ের অবৈধ স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে। একইভাবে খাল পাড়ের অবৈধ স্থাপনাগুলোও ভেঙে ফেলতে হবে। বাইশটেকি খালের কোথাও কোথাও এক-দুই ফুট জায়গা অবৈধ দখলে রয়েছে। এগুলো উদ্ধার করতে হবে। প্রশাসনের কাজ হবে এ মুহূর্তে এগুলো পরিষ্কার করা। গোটা দেশবাসীও চায় দ্রুত খালগুলো উদ্ধার হোক।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

 

"