অনুভূতি

পলিথিন ব্যবহার বন্ধ হোক

প্রকাশ : ১২ মে ২০১৯, ০০:০০

রহিমা আক্তার মৌ

বান্ধবী সাহানার সঙ্গে দেখা আর্ট একাডেমিতে, বললÑ চলো একটু কারওয়ান বাজারে যাই।...কেন?...কিছু পলিথিন কিনব, ছেলের খাবার দিতে হয়। বক্সে দিলে বক্সে হলুদের রং লেগে যায়, তেল পড়ে ব্যাগে।...পথিলিনে দিবি?...না, পলিথিনে দিয়ে রাবার দিয়ে মুখ বন্ধ করে তারপর বক্সে দেব। ঘটনাটি ২০১৮ সালের শেষদিকে।

ওর সঙ্গে গেলাম, দোকানে গিয়ে আমি অবাক। কী নেই দোকানে, ছোট-বড় মাঝারি ভিন্ন সাইজের পলিথিন। কেজি দরেই বিক্রি হয় সেগুলো। সেখান থেকেই জানা, পলিথিন ব্যাগের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী ২৬০ থেকে ২৮০ টাকা কেজি দরে তৈরি হচ্ছে হাতল ছাড়া পলিথিনের ব্যাগ। আর হাতলওয়ালা ব্যাগ বিক্রি হচ্ছে প্রতি হাজার তিন থেকে চার হাজার টাকা। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ঢাকা শহরে একেকটি পরিবার গড়ে প্রতিদিন চারটি পলিথিন ব্যবহার করে। ২ কোটি মানুষের বিপরীতে ৫০ লাখ পরিবার হলে ঢাকায় প্রতিদিন পলিথিন ব্যবহারের পরিমাণ ২ কোটি।

২০০২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে রাজধানীতে এবং পরে ১ মার্চ থেকে সারা দেশে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। এজন্য পরিবেশ আইন ১৯৯৫ সংসদে সংশোধনও করা হয়। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ সংশোধন করে, পলিথিন উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, বিক্রয়, বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শন, মজুদ, বিতরণ ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ৬-এর ক ধারা সংযোজনের মাধ্যমে এ-সংক্রান্ত ঘোষণা বাস্তবায়ন করা হয়। একই বছরের ৮ নভেম্বর সরকার কর্তৃক একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সাময়িকভাবে বিস্কুট, চানাচুরের মোড়ক হিসেবে পলিথিনের ব্যবহার করা যাবে বলে জানানো হয়। এই আইনের ১৫ ধারায় বলা হয়, ‘কেউ যদি পলিথিন সামগ্রী উৎপাদন, আমদানি বা বাজারজাত করে, তবে তার শাস্তি হবে ১০ বছরের কারাদ- বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দ-। আর কোনো ব্যক্তি যদি নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন সামগ্রী বিক্রি বা বিক্রির উদ্দেশ্যে প্রদর্শন, গুদামজাত, বিতরণ ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন বা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে, তবে সে ক্ষেত্রে তার শাস্তি ছয় মাসের কারাদ- বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দ-ই প্রযোজ্য হতে পারে।

অথচ পলিথিন নিষিদ্ধ করার কাজে নিয়োজিত কয়েক প্রচারেই বলা হয়, রাজধানীতে উৎপাদিত পলিথিন ব্যাগ বুড়িগঙ্গা নদী দিয়ে এবং সোয়ারীঘাট ও ইমামগঞ্জ এলাকার ট্রান্সপোর্ট এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে সড়কপথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। পাইকারি হারে পলিব্যাগ কিনে তা রাজধানীর বাইরে পাঠানোর সময় থানা-পুলিশ সংশ্লিষ্ট পাইকারকে বিশেষ টোকেন দিয়ে থাকে। টোকেন ছাড়া পলিথিন পরিবহন করলে বিভিন্ন চেকপোস্টে পুলিশকে বিপুল পরিমাণ ঘুষ দিতে হয়। আইন আছে সব জায়গায় কিন্তু নেই আইনের ব্যবহার। যে পুরান ঢাকাকে কেমিক্যালের আখড়া বলা হয়, সেই পুরান ঢাকার অলিগলিতে রয়েছে প্রায় ৩০০টি প্লাস্টিক কারখানা। যাত্রাবাড়ী থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার পাড়ঘেঁষে গড়ে উঠেছে শতাধিক কারখানা।

পরিবেশ অধিদফতরের মতে, দেশের সিংহভাগ নাগরিক পলিথিন শপিং ব্যাগের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন। ৯০ ভাগেরও বেশি নাগরিকের উৎপাদন বন্ধের পক্ষে হলেও সহজলভ্য হওয়ায় তারা এর ব্যবহার করেন। এছাড়া স্বল্পমূল্য, স্থায়িত্ব এবং পানিরোধক সুবিধাও পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারের অন্যতম কারণ। সবাই জানে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ ফিরে এসেছে আবার, কখনো হাতল ছাড়া কখনো হাতলওয়ালা হয়ে। ঢাকাসহ সারা দেশে প্রকাশ্যে এখন এর ব্যবহার চলছে। ডিপার্টমেন্টাল চেইনশপ থেকে শুরু করে কাঁচাবাজারে মাছ-মাংস, শাকসবজিÑ সবকিছুই দেওয়া হচ্ছে পলিব্যাগে। আইনের কার্যকর প্রয়োগ না থাকায় দেদার চলছে নিষিদ্ধ পলিথিনের উৎপাদন, বাজারজাত, বিক্রি ও ব্যবহার। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নাকের ডগায় প্রকাশ্যেই চলছে নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ‘পলিথিন ক্যানসারের মতোই একটি নীরব ঘাতক। এই পণ্যটি শত শত বছর পড়ে থাকলেও পচে না কিংবা মাটির সঙ্গে মিশে যায় না। পরিবেশদূষণ রোধ করতেই আইনের মাধ্যমে পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। আইনের মাধ্যমে পলিথিন নিষিদ্ধ থাকলেও আবার তার ব্যবহার বাড়তে শুরু করেছে। ঢাকায় পলিথিন ব্যবহারের একটি ক্ষতিকর দিক হলো এটি স্যুয়ারেজ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যেখানে-সেখানে পলিথিন রাখলে তা পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটায়। পলিথিনের কারণে ঢাকায় অল্প বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।’

২০১২ সালে গবেষণার মাধ্যমে জানানো হয়, সমগ্র বিশ্বের সমুদ্রে আনুমানিক ১৬৫ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য আছে। শুধু আমেরিকায় প্রতি বছর পাঁচ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহৃত হয়। এগুলোর মধ্যে মাত্র ২৪ শতাংশ পুনঃচক্রায়ন হয়ে থাকে। অন্য ৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য আকারে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়। পরিবেশ অধিদফতরের তথ্য মতে, ‘আধুনিক জীবনযাত্রায় পলিথিন অতি প্রয়োজনীয় পণ্য হওয়ায় পলিথিন উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। গত পাঁচ বছরে ৬৪টি অবৈধ পলিথিন উৎপাদন কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে ২৩৩ দশমিক ৫৮ টন অবৈধ পলিথিন জব্দ এবং ১৮৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।’ তারপরও তথৈবচ! উৎপাদন এবং ব্যবহার দুটিই বেড়ে গেল। পলিথিন ব্যবহারে এখন আর কোনো লুকোচুরি নেই। সম্ভবত প্রশাসনকে হিপ-পকেটে তুলে নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ইচ্ছামতো মানিব্যাগ খোলেন আর পে করেন। পে করার মধ্যে যেন আইনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা এবং ভোগবাদী সমাজের সবকিছুই নির্ভর করে। আর সে কারণেই আদালতের নির্দেশনা প্রত্যাখ্যাত হলেও সমাজের কোথাও বিন্দুমাত্র রেখাপাত করে না। সম্ভবত রেখাপাত করার এলাকা থেকে সব নান্দনিক কোষের অপমৃত্যু হয়েছে। নির্বাসনে আজ মানুষের বোধের সেই নির্মল আকাশ। যে আকাশের সঙ্গে কবে দেখা হবে, তা আমাদের জানা নেই। তবে প্রত্যাশাই আমাদের বাঁচিয়ে রাখবে।

লেখক : সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

rbabygolpo710@gmail.com

"