মুক্তমত

যিনি সর্বংসহা তিনিই ‘মা’

প্রকাশ : ১২ মে ২০১৯, ০০:০০

আলী মো. কায়ছার

‘মা’! একটি অক্ষর, একটি শব্দ, একটি ধ্বনি, একটি বাক্য, একটি গল্প, একটি উপন্যাস। কখনো কখনো পুরো পৃথিবীটাই যেন হয়ে ওঠেন ‘মা’। যিনি সর্বংসহা তিনিই মা। ত্যাগের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে যার বসবাস তিনি হচ্ছেন মা। একজন মানুষ ৪৫ ইউনিট ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা রাখে। এর বেশি সহ্য করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু একজন মা! প্রসবকালে ৫৭ ইউনিটের বেশি ব্যথা সহ্য করেন। বিজ্ঞান বলছে, এই ব্যথার যন্ত্রণা ১০টি হাড় একসঙ্গে ভেঙে যাওয়ার চেয়েও বেশি। পৃথিবীতে এই কষ্ট বা ব্যথা শুধু মা-ই সহ্য করতে পারেন, অন্য কেউ নন। মাতৃত্বেই সব মায়া-মমতার শুরু এবং শেষ।

গর্ভে ধারণ করা মাত্রই মায়ের জীবন মৃত্যুর ঝুঁকির মুখে পড়ে যায়। দিন যত বাড়তে থাকে ঝুঁকিও তত বাড়ে। একজন মানুষের ভেতরে আরেকজন মানুষ (কখনো দুই বা তিনজন) কী অসম্ভব ঘটনা। ভবিষ্যৎ সব সময়ের জন্য মানুষের জানা থাকে না। ছেলে বা মেয়ে, বোবা বা অন্ধ যাই হোক না কেন, সব সন্তানই তার মায়ের কাছে সাত রাজার ধন। শ্রেষ্ঠ সম্পদ বা মানিক রতন। সন্তান গর্ভে ধারণ করার পর যদি ওই সন্তানের বাবা মারা যান কিংবা দূরে কোথাও চলে যান তবুও সন্তান জন্মাবে। পৃথিবীর আলোর মুখ দেখবে। কিন্তু মা সন্তান গর্ভে ধারণ, নিরাপদে প্রসব এবং দুই বা আড়াই বছর পর্যন্ত মাকে ছাড়া সন্তান পরিপূর্ণ হবে না। মায়ের দুধই শিশুর জন্য পুষ্টির একমাত্র অবলম্বন। মায়ের খাবারই সন্তানের খাবার। এ প্রসঙ্গে মার্কিন দার্শনিক ও লেখক ড. ওয়েন ডায়ার বিশ্বাসী-অবিশ্বাসীদের নিয়ে চমৎকার একটি আধ্যাত্মিক গল্প লিখেছেন। মায়ের গর্ভে দুই শিশু-একজন অন্যকে প্রশ্ন করছে, তুমি কি ডেলিভারির পরের জীবনে বিশ্বাস কর? অন্য শিশুটি বলল, অবশ্যই, সেখানে নিশ্চয়ই ভালো কিছু অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। হয়তো আমরা এখান থেকে পরে যা হব তারই প্রস্তুতি নিচ্ছি। ননসেন্স, প্রথমজন বলল। ডেলিভারির পরের কোনো জীবন নেই। কোন ধরনের জীবন হবে তা তুমি জান কিছু? ‘দ্বিতীয় জন বলল, আমি ঠিক জানি না তবে হয়তো এখানের চেয়ে নিশ্চয়ই আলোকিত হবে সেই জায়গাটি। সম্ভবত সেখানে আমরা দুই পায়ে হাঁটতে পারব, মুখ দিয়ে খেতে পারব। হয়তো আমাদের অনেক ইন্দ্রীয় থাকবে যা এখন বুঝতে পারছি না। প্রথমজন বলল, পাগল নাকি? হাঁটা অসম্ভব আর মুখ দিয়ে খাওয়া হাস্যকর। অ্যাম্বিলিকাল কর্ড যা প্রয়োজন সে অনুযায়ী আমাদের পুষ্টি দিচ্ছে। কিন্তু অ্যাম্বিলিকাল কর্ড এত ছোট তাই ডেলিভারির পরের জীবন যৌক্তিকভাবে অযৌক্তিক। দ্বিতীয়জন জোর দিয়ে বলে, আমার মনে হয় সেখানে নিশ্চয়ই এমন কিছু আছে যা এখানকার চেয়ে ভিন্ন। হয়তো এই অ্যাম্বিলিকাল কর্ডের সেখানে আর প্রয়োজন হবে না। প্রথম শিশু, ননসেন্স- যদি সেখানে জীবন থেকেই থাকে তবে সেখান থেকে আজ পর্যন্ত এখানে ফিরে এল না কেউ। ডেলিভারি মানে জীবন শেষ। ডেলিভারির পরে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নেই। শুধুই অন্ধকার আর নিস্তব্ধতা। দ্বিতীয় শিশু, ঠিক আছে, আমি জানি না, কিন্তু আমার বিশ্বাস নিশ্চিতভাবে আমি আমার মাকে দেখতে পাব। তিনি আমাদের ভালোবাসবেন, যতœ নেবেন। প্রথম শিশু বলে উঠে, আরে তুমি কি সত্যিকারে বিশ্বাস করো, মা বলে কেউ আছেন? হাস্যকর। তিনি যদি থাকেন, তবে এখন কোথায়? দ্বিতীয় শিশু, তিনি সর্বত্র আছেন। আমাদের চারপাশে আছেন। আমরা তার ভেতরে। তার অস্তিত্বের মধ্যেই আছি। তিনি ছাড়া এ পৃথিবীতে আমি আসতাম না। থাকতেও পারতাম না। প্রথমজনের উত্তর, কিন্তু আমি তো তাকে দেখতে পাই না। তাই এটাই যৌক্তিক যে, তিনি নেই। দ্বিতীয় শিশু বলে উঠে, যখন তুমি নিস্তব্ধতার মাঝে থাকো, একটু চিন্তা করে বোঝার চেষ্টা করো, দেখবে তুমি তার মাঝে থাক, একটু চিন্তা করে বোঝার চেষ্টা কর, দেখবে তুমি তার উপস্থিতি টের পাবে। শুনবে তার ভালোবাসার কণ্ঠস্বর, বুঝবে তার অস্তিত্ব।

বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের কথা নয়। কোনো সন্তান কৃতজ্ঞ আর অকৃতজ্ঞ পাঠকরা বিবেচনা করবেন? দুটি সন্তানেরই একজন মা। বিশ্বে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে মা দিবস। মে মাসের দ্বিতীয় রোববার দিবসটি পালিত হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময় মা দিবস পালিত হলেও মা দিবস হিসেবে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ও বহুল প্রচলিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ইতালি, তুরস্ক, বেলজিয়াম এবং অস্ট্রেলিয়াসহ আরো অনেক দেশে প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার মা দিবস পালিত হচ্ছে। ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম মা দিবস পালন আলোচনায় আসে। জুলিয়া ওয়ার্ড হো শান্তির প্রতি মানুষের বিবেককে জাগ্রত করার লক্ষ্যে জুন মাসের দুই তারিখ মা দিবস পালনের আহ্বান জানান। তিনি বোস্টনে মা দিবসের আয়োজন করেন। আনা জারভিস ফিলাডেলফিয়া থেকে জাতীয়ভাবে মা দিবস অনুষ্ঠানের প্রচার শুরু করেন। জারভিস তার মায়ের দ্বিতীয় মৃত্যুবর্ষের দিনকে মা দিবস হিসেবে পালনের জন্য গির্জার অনুমতি আদায় করেন। জারভিসের মায়ের দ্বিতীয় মৃত্যুবর্ষ ছিল মে মাসের দ্বিতীয় রোববার। তখন থেকে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার মা দিবস প্রতিষ্ঠা পায়। দিবস তৈরি হলেও মানুষ তার মায়ের মূল্যায়নে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষত সন্তানেরা।

মহানগর ঢাকার শেরেবাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়। হাসপাতালের চতুর্থতলায় অর্থোপেডিক বিভাগের ৪০৩ নম্বর কক্ষে বি-১৩ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন ছিলেন ৭০ বছরের বৃদ্ধা মা মনোয়ারা বেগম। তিন ছেলে পুলিশ অফিসার ও শিক্ষিকা মেয়ের অবহেলায় ভিক্ষার পথ বেছে নিয়েছিলেন তিনি। তাদের পরিবারে পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ ছিল। বিরোধ থাকতেই পারে। ওই বিরোধের জন্যই সন্তানেরা তাদের মাকে অবহেলা করেছেন। পত্রিকায় খবরটি প্রকাশিত হলে সারা দেশে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। ভিক্ষা করতে গিয়ে মা মনোয়ারা বেগম পা পিছলে কোমরের হাড় ভেঙে ফেলেন। তখন থেকেই তিনি বিনা চিকিৎসায় শয্যাশায়ী ছিলেন। সন্তানেরা ভুল করলেও মা তাদের ক্ষমার চোখে দেখেছেন। কর্তৃপক্ষ বা গণ্যমাণ্য ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি সোজা সাপটা জানিয়ে দেন। তার সব সন্তানই ভালো। কোনো সন্তানের প্রতি তার কোনো অভিযোগ নেই।

ছেলের সামান্য আঘাতে মা আঁতকে ওঠেন, উঠেছেন এবং উঠবেন। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মাকে লাঠির আঘাতে যখন তার সন্তান আহত করেন তখন! ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার ডাঙ্গীপাড়া ইউনিয়নের ডাঙ্গীপাড়া এলাকায় ভাত খেতে চাওয়ায় বৃদ্ধা মাকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেয় ছেলে বদিরউদ্দীন। ছেলের লাঠির আঘাতে মায়ের বাম চোখ থেঁতলে যায়। পরে খবর পেয়ে জেলা প্রশাসক ওই বৃদ্ধা মাকে একটি পরিত্যক্ত ঝুপড়ি ঘর থেকে উদ্ধার করে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। মাকে নির্যাতনের অভিযোগ ছেলে বদিরউদ্দীনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আঘাতপ্রাপ্ত হলেও তখন পর্যন্ত মায়ের ছায়াতলে ছেলেকে আগলে রাখার এক অপরিসীম ভালোবাসা সবাইকে অবাক করে দেয়। কেননা বৃদ্ধা মা তার সন্তানের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ জানাননি বরং ছেলেকে দেখার আকুতি ব্যক্ত করেন। এই হচ্ছে মা।

ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। অন্যান্য ধর্মেও মায়ের স্থান পার্থিব সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তবু অনেক সময় বৃদ্ধ বা অসহায় মায়ের প্রতি সন্তান-সন্ততির দুর্ব্যবহার করতে দেখা যায়। এমনটি শুধু অপরাধ নয়, সন্তান হিসেবে কলঙ্কের চাইতেও নিকৃষ্ট। মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যমে সন্তান-সন্ততির শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পায়। কেননা আমাদের অস্তিত্বে¡র সবটুকুর মাঝে মিশে আছে মায়ের অবদান। মাকে বাদ দিয়ে আমাদের অস্তিত্ব কল্পনা করা সম্ভব নয়। পরিশেষে এক মায়ের উক্তি উল্লেখ করা যাক। নোবেল পুরস্কারের খবর পেয়ে অমর্ত্য সেন তার মাকে সুখবরটি দেওয়ার জন্য ফোন করলে তার মা তাকে বলেন, বাবা তুমি খেয়েছ?

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

[email protected]

"