মুক্তমত

যানজট নিরসনে উদ্যোগ

প্রকাশ : ১১ মে ২০১৯, ০০:০০

মোতাহার হোসেন

রাজধানী ঢাকা বিশ্বের অন্যতম জনবহুল শহর। ফলে এখানে যানজট বেশি। নগরবাসীকে এ দুর্ভোগে স্বস্তি দিতে বৃহত্তর ঢাকা ঘিরে নেওয়া হয়েছে মহাপরিকল্পনা। এ মহাপরিকল্পনার আওতায় গ্রহণ করা হয়েছে ৪৬টি মেগা প্রকল্প। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। ২০২৪ সাল নাগাদ প্রকল্পগুলোর ফলাফল ভোগ করতে পারবে নগরবাসী। কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার (আরএসটিপি) আলোকে নির্মিত হবে দুটি পাতাল রেল, তিনটি এলিভেটেড রেল ও বৃত্তাকার জলপথ। এসব মেগা প্রকল্পের মধ্যে ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-৬ বা মেট্রোরেল বাস্তবায়নের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।

প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে রাজধানীবাসী যানজটের ভোগান্তি থেকে রক্ষা পাবে আশা করা যায়। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদীর সাড়ে ৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে সৃষ্ট যানজট নিরসনে ৫টি ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি), দুটি বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি), তিনটি রিং রোড, ৮টি রেডিয়াল সড়ক, ৬টি এক্সপ্রেসওয়ে, ২১টি ট্রান্সপোর্টেশন হাব এবং ঢাকার চারপাশের বৃত্তাকার নৌপথ উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করা যায়, এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে যানজট অনেকাংশে কমে আসবে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ঢাকা ও এর আশপাশের যানজট নিরসনে আরএসটিপিতে যৌক্তিক দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যানজট নিরসনে মেগা প্রকল্প এমআরটি লাইন-১ এ মেট্রোরেলের দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ২৭ কিলোমিটার। এটি হবে দেশের প্রথম পাতাল রেল। বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত প্রায় ১৭ কিলোমিটার পথ যাবে মাটির নিচ দিয়ে। আর বসুন্ধরা থেকে পূর্বাচল টার্মিনাল পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার এলিভেটেড মেট্রোরেল হবে। এতে জাপান সরকার সহযোগিতা করছে। বর্তমানে এর সম্ভাব্যতা যাচাই হচ্ছে। এর নির্ধারিত রুট হচ্ছে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে খিলক্ষেত-কুড়িল-যমুনা ফিউচার পার্ক এবং বাড্ডা-রামপুরা-মালিবাগ-রাজারবাগ-কমলাপুর। প্রস্তাবিত মেট্রোরেল স্টেশনগুলো হচ্ছেÑ বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, কুড়িল, যমুনা ফিউচার পার্ক, নতুন বাজার, বাড্ডা, হাতিরঝিল, রামপুরা, মালিবাগ, রাজারবাগ, কমলাপুর। অন্যদিকে কুড়িল থেকে কাঞ্চন সেতুর পশ্চিম দিক পর্যন্ত কুড়িল, বসুন্ধরা, পূর্বাচল পশ্চিম, পূর্বাচল সেন্টার এবং পূর্বাচল টার্মিনাল।

এমআরটি লাইন-২ আশুলিয়া থেকে শুরু হয়ে নবীনগর সাভার হয়ে গাবতলী-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-ডিএসসিসি-কমলাপুর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এ মেট্রোরেলের কাজ চলছে। কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে এমআরটি লাইন-৪। এটা পাতাল রেল হওয়ার কথা। এমআরটি লাইন-৫ হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত এ মেট্রোরেলের দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ২০ কিলোমিটার। এর নির্ধারিত রুট হেমায়েতপুর, গাবতলী, টেকনিক্যাল, মিরপুর-১, মিরপুর-১০, মিরপুর-১৪, কচুক্ষেত, বনানী, গুলশান-২, নতুন বাজার ও ভাটারা। এর মধ্যে হেমায়েতপুর-আমিনবাজার পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার এবং নতুন বাজার থেকে ভাটারা পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার দুই অংশে ১২ কিলোমিটার মাটির ওপর দিয়ে নির্মিত হবে। আর বাকি আট কিলোমিটার আমিনবাজার থেকে তুরাগ নদের তলদেশ দিয়ে নতুন বাজার পর্যন্ত যাবে। এর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে। আর এমআরটি লাইন-৫-এর অন্য অংশের রুট হচ্ছেÑ গাবতলী থেকে ধানমন্ডি হয়ে পান্থপথ-হাতিরঝিল-লিংক রোড পর্যন্ত।

প্রস্তাবিত স্টেশনগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ হেমায়েতপুর, বালিয়ারপুর, মধুমতি, আমিনবাজার, গাবতলী, দারুসসালাম, মিরপুর-১, মিরপুর-১০, মিরপুর-১৪, কচুক্ষেত, বনানী, গুলশান-২, নতুন বাজার এবং ভাটারা। এমআরটি লাইন-৬ উত্তরা আবাসিক এলাকার তৃতীয় প্রকল্প থেকে শুরু হয়ে মতিঝিলে গিয়ে শেষ হবে। এ মেট্রোরেলের দৈর্ঘ্য ২০ কিলোমিটারের কিছু বেশি। এটি দেশের প্রথম মেট্রোরেল। এমআরটি লাইন-৬ মোট ৮টি প্যাকেজে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ মেট্রোরেলের মোট ১৬টি স্টেশন থাকবে। স্টেশনগুলো হলোÑ উত্তরা, উত্তর-উত্তরা, সেন্টার-উত্তরা, দক্ষিণ পল্লবী, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ সচিবালয় এবং মতিঝিল।

বিআরটি-৩ গাজীপুরে শুরু হয়ে শেষ হবে ঝিলমিল আবাসন প্রকল্পের কাছে। এটি দুটি ধাপে বাস্তবায়িত হবে। প্রথম ধাপে হবে প্রায় ২১ কিলোমিটার। এ অংশে মোট ২৫টি স্টেশন থাকবে এবং ঘণ্টায় ২৫ হাজার যাত্রী বহন করা যাবে। আর দ্বিতীয় ধাপে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঝিলমিল পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে প্রায় ২২ কিলোমিটার। এ অংশে ১৬টি স্টেশন থাকবে এবং ঘণ্টায় ৩০ হাজার যাত্রী বহন করা যাবে। বিআরটি-৭ হবে পূর্বাচল থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত। এ প্রকল্পেরও প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়নি। ইনার, মিডল ও আউটার নামে তিনটি রিং রোড করবে ডিটিসিএ। প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে।

সহজ যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে আটটি রেডিয়াল সড়ক নির্মাণ করবে ডিটিসিএ। সড়কগুলো হচ্ছেÑ ঢাকা থেকে জয়দেবপুর, ঢাকা-টঙ্গী-ঘোড়াশাল, ঢাকা-পূর্বাচল-ভুলতা, ঢাকা-কাঁচপুর-মেঘনা সেতু, ঢাকা-সাইনবোর্ড-নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা-ঝিলমিল-ইকুরিয়া, ঢাকা-আমিনবাজার-সাভার এবং ঢাকা-আশুলিয়া-ডিইপিজেড। ডিটিসিএ ৬টি এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের সুপারিশ করেছে। এ ছাড়াও আরএসটিপির আওতায় ২১টি ট্রান্সপোর্টেশন হাব নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, মহাখালী বাস টার্মিনাল, যাত্রাবাড়ী বাস টার্মিনাল, গাবতলী সার্কুুলার ওয়াটারওয়ে স্টেশন ও সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল। যানজট নিরসনে ঢাকার চারপাশে জলপথ উন্নয়নের প্রকল্প গ্রহণের সুপারিশ রাখা হয়েছে আরএসটিপিতে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ওয়াটার ট্যাক্সি, ওয়াটার বোর্ড, লঞ্চ নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা সহজতর হবে।

ঢাকাসহ আশপাশের এলাকার পরিকল্পিত, সমন্বিত এবং আধুনিক ও টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ১৯৯৮ সালে ‘গ্রেটার ঢাকা ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানিং অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন বোর্ড’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে তা ‘ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ নামে পুনর্গঠন করা হয়। বর্তমানে এ সংস্থা ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদী জেলার প্রায় ৭ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকার পরিবহন ব্যবস্থাপনা ও যানজট নিরসনে কাজ করছে। আমাদের প্রত্যাশা ঢাকাকে যানজটমুক্ত করতে গৃহীত সব প্রকল্প ও পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন। এজন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সবার যথাযথ উদ্যোগ। তবেই যাতায়াতে বাঁচবে সময়, কমবে অর্থ ও শ্রমের অপচয়।

লেখক : সাংবাদিক, কলাম লেখক

[email protected]

"