বিশ্লেষণ

অপরাধী যেই হোক না কেন...!

প্রকাশ : ১১ মে ২০১৯, ০০:০০

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন আমাদের দেশ ও সমাজ ততটা উন্নত ছিল না। বলা চলে, বেশির ভাগ মানুষই বেশ কষ্টে জীবনযাপন করেছে। কিন্তু তার পরও মানুষের মধ্যে আন্তরিকতা, স্নেহ-ভালোবাসা, ন্যায়ের প্রতি সমর্থন, অন্যায়কে অন্যায় বলা, অন্যায়কারীদের সমালোচনা করা কিংবা পরিহার করার মানসিকতা অনেক বেশি দেখা যেত। স্কুলে যে ছেলেটি নকলে ধরা পড়ত, সে নিজেই বেশ লজ্জায় পড়ত, অন্যরা তাকে কিছুটা পরিহার করত। গ্রামে যারা অন্যদের ওপর খবরদারি বেশি করত কিংবা অন্যের ওপর অন্যায়-অবিচার করত, সবাই চেষ্টা করত তাকে এসব করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিতে। যদি সে কথা না শুনত, তা হলে বেশির ভাগ মানুষই তাকে পরিহার করে চলত। এ বিষয়টি ছোটদের ওপর বেশ ইতিবাচক প্রভাব ফেলত। তারা শিখত কোনটা অন্যায়, কোনটা করতে নেই, করলে মানুষ খারাপ ভাববে, এমনকি পরিহারও করে চলবে। এটি আমরা আমাদের সমাজে একসময় দেখেছি। সেখানে থেকে কিছু না কিছু হলেও শিখেছি।

আমি তরুণ বয়সে মস্কোতে লেখাপড়া করেছি। প্রায় ১০ বছর সেখানে ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী নিয়ম ভঙ্গ করলে তার পক্ষে কাউকেই অবস্থান নিতে দেখিনি। পিএইচডি গবেষণার সময় শিক্ষকদের সঙ্গে সভা-সেমিনারে নিয়মিত বসা হতো। সেখানে কোনো শিক্ষককে দেখিনি নিয়মভঙ্গকারী কোনো শিক্ষকের পক্ষে কখনো অবস্থান নিতে। বরং বলা হতো, নিয়ম ভঙ্গ করলে যে কেউই আইন ও বিধি অনুযায়ী শাস্তি পেতে বাধ্য। তার পক্ষে কেউই একবারের জন্যও কথা বলতে শুনিনি। এটিই উন্নত প্রায় সব দেশেই একটি সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। সবাই তাতে অভ্যস্ত।

দুর্ভাগ্য আমাদের দেশে। দীর্ঘদিন থেকেই আমি লক্ষ করছি, এখানে কেউ একজন অন্যায় করলে কিছু মানুষ তার বিরুদ্ধে হয়তো কথা বলেন। কিন্তু যাদের ক্ষমতা বা প্রভাব রয়েছে তারা অন্যায়কারীর পক্ষে অবস্থান নিতে খুব বেশি দ্বিধা করেন না। অনেক সময় ইনিয়ে-বিনিয়ে অনেক কথা বলেন, মানবিকতার কথাও কেউ কেউ শোনান, অপরাধীর বিচার হলে যদি তিনি চাকরি হারান, তা হলে তার পরিবারের প্রতি তাদের দরদের সীমা থাকে না! গ্রামেও এখন আর আগের মতো ন্যায়-অন্যায়ের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিতে গিয়ে আগের সেই মূল্যবোধ খুব বেশি দেখা যায় না। যে কেউ অপরাধ করলে গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অপরাধীকে বাঁচানোর এক ধরনের দায়িত্ব নিয়ে ফেলেন। বিনিময় টাকা-পয়সার লেনদেনের কথাটি খুব বেশি গোপন রাখা যায় না। টাকা এখন প্রভাবশালীদের সমর্থন পাওয়ার প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরাধীর অপরাধ যত তীব্র হবে, টাকা-পয়সার লেনদেন এবং সমর্থকের সংখ্যা তত বাড়তেই থাকে। এভাবে দেখা যাচ্ছে, গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই প্রভাবশালীদের জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা দিন দিন প্রকট হয়ে উঠেছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরে দুর্নীতিবাজদের অবস্থান বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। দেশের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল, কলেজ, মাদরাসা) অভ্যন্তরে এখন অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে, দুর্নীতিবাজদের উৎসাহী করা হচ্ছে। অন্যদিকে নিষ্ঠাবান, দক্ষ, অভিজ্ঞদের কর্মক্ষেত্র বেশ বৈরী করে ফেলা হচ্ছে। সেখানে শিক্ষকদেরও অংশ যুক্ত হচ্ছে আবার ভালো শিক্ষকদের বিতাড়িত করার নানা ধরনের ফাঁক-ফন্দি আঁটা হচ্ছে। নুসরাত হত্যার পেছনে এখন দেখা যাচ্ছে অধ্যক্ষসহ মাদরাসার শিক্ষকদের একটি অংশ, ছাত্রছাত্রীদের একটি অংশ, স্থানীয় প্রভাবশালীদের একটি অংশ এবং প্রশাসনের একটি অংশ কমবেশি জড়িত ছিল। অথচ কাজটি যে অন্যায় হচ্ছিল, তা কি এরা কেউই বুঝতেন না? অবশ্যই বুঝতেন। কিন্তু অর্থ, বিত্ত, ক্ষমতা ইত্যাদির প্রতি যাদের লোভ-লালসা আগে থেকেই বেড়ে উঠেছে, সে ধরনের কর্মকান্ডের সুবিধা তারা নিয়েছে। তাদের কাছে মনে হয়েছে যত অন্যায়, অবিচার এমনকি হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা তারা ঘটাক না কেন অর্থবিত্ত এবং ক্ষমতার জোরে তারা সবই ধামাচাপা দিতে পারবে। সে কাজটি নুসরাত হত্যার সঙ্গে যুক্ত অনেকেই করেছেন। যখন করেছিলেন তখন তাদের পেছনে যারা শক্তি, সাহস ও অর্থবিত্ত দিয়ে সহযোগিতা করেছিল, তখন তাদের মনে হয়েছিল এটি খুব বেশি সমস্যার কারণ হবে না। গণমাধ্যমকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, সেটিও তারা করছিল। প্রশাসনকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, সেটিও তারা করছিল। নুসরাতের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার যে পরিকল্পনা করেছিল, সেটি করতে তারা সামাজিক গণমাধ্যমকে ব্যবহার করতে শুরু করেছিল। এলাকায় নুসরাতের পক্ষে যারা অবস্থান নিতেন, তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী লেলিয়ে দেওয়া, ধর্ম ও আলেম সমাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র দেখিয়ে স্তব্ধ করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। এটি এখন নির্দ্বিধায় বলা চলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি তাৎক্ষণিকভাবে এমন নৃশংসতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান না নিতেন, সেভাবে নির্দেশ না দিতেন, তা হলে এ হত্যাকান্ডটির পরিণতি দেশবাসী কতটা সঠিকভাবে জানতে পারত, কতটা বিভ্রান্তিতে থাকত, সেটি এক মস্তবড় প্রশ্ন। এ ধরনের ঘটনা দেশে কমবেশি অনেক জায়গাতেই ঘটছে। অপরাধীরা অর্থবিত্ত ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে, সেটি আমরা কমবেশি প্রত্যক্ষ করছি। সর্বত্রই যে বিষয়টি লক্ষ করা যায়, তা হচ্ছে অপরাধীদের পাশে প্রভাবশালীরা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, থানা পুলিশের একটি অংশও এর থেকে সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে, মূল আসামিকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। ফলে যে বিষয়টি এখন দাঁড়িয়ে যাচ্ছে তা হলো, সমাজের তৃণমূল থেকে শহর পর্যন্ত সর্বত্র অন্যায়কে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার মানসিকতা বাড়ছেÑ বিনিময়ে অন্যায়কারীদের কাছ থেকে অর্থ পাচ্ছে।

অন্যদিকে অনেক নিরীহ, সৎ এবং আদর্শবান মানুষকে কোণঠাসা করে ফেলা হচ্ছে। তাদের কাউকে কাউকে কখনো কখনো হেনস্তা করা হচ্ছে, অপরাধী সাজিয়ে চরম বিপর্যয়ের মুখে ফেলা হচ্ছে। অথচ অপরাধীদের পাশে দাঁড়িয়ে অপরাধকেই বাড়তে দেওয়া হচ্ছে। নতুন প্রজন্ম সেসব প্রবণতা দেখে অপরাধকে ঘৃণা করতে শিখছে না কিংবা অপরাধীদের বর্জন করতে শিখছে না। বরং অনেকেই অপরাধীদের পাশে দাঁড়িয়ে লাভবান হওয়ার কৌশল শিখছে। সে কারণে এখন আমরা সমাজের সর্বস্তরে কিছু একটা ঘটলেই দেখি স্বার্থসিদ্ধির জন্য একটি পক্ষ দাঁড়িয়ে যায়। আবার যথার্থ উপকার করার জন্য কারো ইচ্ছা থাকলেও ঝক্কিঝামেলার কথা বিবেচনা করে অনেকেই দূরে থাকার চেষ্টা করেন। ফলে সমাজ দিন দিন অমানবিক হয়ে উঠছে। মানবিকতা লোপ পেতে বসেছে। নীতিনিয়ম, শৃঙ্খলা ইত্যাদি যেন বইপুস্তকের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, মানুষের জীবনে এর চর্চার বিষয়গুলো যেন গুরুত্বপূর্ণ নয়। এমন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি আমরা হয়েছি; যখন আমাদের দেশ ও সমাজ দ্রুত উন্নয়নের দিকে ধাবিত হচ্ছে। যখন আমাদের আগের মতো কষ্ট করে জীবনযাপন করতে হচ্ছে না; তখনো আমরা দেখছি ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম, দখলদারিত্ব, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মিথ্যাচার, প্রতারণা ইত্যাদি খারাপ প্রবণতা সমাজের সর্বত্র জেঁকে বসে আছে। আমাদের এখন এতটাই সতর্ক থাকতে হয় যে, একজন নারী তার সম্ভ্রম নিয়ে চলার কথা ভাবাটি যেখানে খুব স্বাভাবিক ছিল, সেটি এখন কত ঝুঁকিতে আছে, তা প্রতিদিন ধর্ষণের ঘটনার নানা লোমহর্ষক বিবরণ থেকে কমবেশি জানা যাচ্ছে। একজন নারীর পক্ষে কোনো বাসে উঠে রাতের বেলা ঢাকা শহরেই নিরাপদে বাড়ি ফেরা কতটা সম্ভব হবে, সেটি বলা খুব কঠিন। একজন মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নির্বিঘেœ টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন, সেটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজন মানুষ শহরে একখন্ড জমি কিনে মালিক হতে পারবেন কিংবা সেখানে বাসাবাড়ি করতে পারবেন, সেটিও বেশ সন্দেহের মধ্যে থাকে। এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী সেটি ঠেক দিয়ে আটকে রাখবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এসব সন্ত্রাসী কীভাবে এত সব অপরাধ-অপকর্ম করে পার পেয়ে যাচ্ছে? তাদের সাহসের খুঁটিটি কোথায়? উত্তরে বলা যায়, এরা অপরাধ করে পার পেতে অন্যদের সহযোগিতা পাচ্ছে, যারা সমাজ ও রাজনীতিতে প্রভাবশালী, ক্ষমতাধর, প্রশাসনে যাদের রয়েছে লেনদেনের সম্পর্ক; তারাই এদের অপকর্ম-পরবর্তী সময়ে ছায়া দেয়, আশ্রয় দেয়, সমর্থনও দেয়। এটি দেখে সমাজের অনেক তরুণ প্রলুব্ধ হয়, যুক্ত হয় অপকর্মের কাফেলায়। এই কাফেলা এখন গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সর্বত্র বেড়ে উঠছে। এদের নাম অনেকেই জানে, পরিচয়ও জানে, তাদের ভয়ংকর অপরাধ সম্পর্কেও সবাই কমবেশি জানে। তবে কালেভদ্রে এই অপরাধীদের কেউ কেউ ধরা পড়েন, কিন্তু আবার ছাড়াও তারা পেয়ে থাকেন।

অন্যদিকে ফেনীসহ বিভিন্ন জায়গায় নুসরাত হত্যার প্রতিবাদে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাই নয়, অভিভাবক ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ, রাজনীতি ও সমাজ সচেতন মানুষদের অনেকেই রাস্তায় নেমে এসেছেন। এর ফলে যে বিষয়টি সবার কাছে স্পষ্ট হয়েছে তা হলো অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার মতো যারা প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, দুর্নীতি, বিকৃত যৌনাচার ও অপরাধীদের লালন-পালন করছেন, তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার সময় এসেছে এবং অপরাধীদের বিচারের পক্ষে সরকার ও রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান লক্ষ করা যাচ্ছে। এটি আরো প্রসারিত হলে, সর্বত্র অপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আইনানুগ ব্যবস্থা করা হলে অবশ্যই সমাজে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা অপরাধ ও দুর্নীতির প্রবণতাকে টেনে ধরা যাবে। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতি ও সমৃদ্ধিকে টেকসই করতে হলে সমাজে নীতিনৈতিকতার চর্চা বৃদ্ধি করতে হবে। অপরাধীদের আইনের কাছে সোপর্দ করতেই হবে, দেশে সুশাসনও নিশ্চিত করতে হবে। তা হলেই দেশ টেকসই উন্নয়নের নিশ্চয়তা বিধান করতে পারবে।

লেখক : অধ্যাপক (অব.)

ইতিহাসবিদ ও কলামিস্ট

"