মতামত

আর কত নারীকে প্রাণ দিতে হবে?

প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

লাভলী ইয়াসমিন জেবা

জীবনের সব চাওয়া-পাওয়া, স্বপ্ন, অভিলাষ, অধিকার, সম্মানÑ সবকিছুুকে বিসর্জন দিয়ে, ঘুণে ধরা, দায়িত্ববোধহীন এই সমাজকে ধিক্কার জানিয়ে চলে গেল আরেকটি তাজা প্রাণ- বাংলাদেশের সোনাগাজীর সোনার মেয়ে ‘নুসরাত জাহান রাফি’। সে ‘মরিয়া প্রমাণ করিয়া গেল, সে মরে নাই’। কারণ লাখো লাখো কণ্ঠে প্রতিবাদের আজ একটিই শব্দ ‘নুসরাত’। বাংলার আকাশ, বাতাস, নদী, পাহাড়, সমুদ্রের নোনাজলের উত্তাল ঢেউ, সর্বক্ষেত্রে ধ্বনিত হচ্ছে নুসরাতের প্রতিবাদের ভাষা। কিন্তু সেই শব্দ, ভাষা, মিছিলের প্রতিধ্বনি কিছুই আর তার কানে পৌঁছাবে না। সে যে চলে গেছে না ফেরার দেশে। পৃথিবীর ভালো-মন্দ, সুখ-অসুখ, তাপ-উত্তাপ, ঘৃণা-ভালোবাসা কিছুই আর তাকে ছুঁতে পারবে না। অন্তরের ভেতরে পুষে রাখা শতভাগ প্রতিবাদের আগুন আর বাইরে ৮৫ শতাংশ পুড়ে যাওয়া শরীর নিয়ে নুসরাত চলে গেছে ঠিকই। কিন্তু প্রশ্ন রেখে গেছে মানুষ আর মানবতার কাছে, আমরা কি ভালো আছি, আমরা কি ভালো থাকব?

আজকাল নারীদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ স্কুুল, কলেজ, অফিস, আদালতÑ এমনকি কেনাকাটা করতে যাওয়ার সময়ও বোরকা বা হিজাব পরেন এবং এ সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। অনেক স্কুল, কলেজে এমনকি নার্সারি স্কুলের ছাত্রীদের জন্যও এটি বাধ্যতামূলক। চলার পথে আমি অনেকের কাছ থেকে এর কারণ জানতে চেয়েছি। তারা বলেছেন, এতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এবং এটি মেয়েদের জন্য নিরাপদও বটে। একমত না হলেও মেনে নিয়েছি, মানিয়ে নিয়েছি। মনে মনে বলেছিÑ থাক না, যে যেভাবে আনন্দ পায়। অনেকে ধর্মের বাণী শুনিয়ে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টাও করেছেন। সবার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আবার কিছু প্রশ্ন রেখে গেলাম, নুসরাত তো নিয়মিত বোরকা পরত, মাদরাসায় পড়াশোনা করত এবং আলিম পরিক্ষার্থী ছিলÑ তাহলে তাকে কেন তারই শিক্ষক সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজ-উদ-দৌলার হাতে শ্লীলতাহানির শিকার হতে হলো? কেনইবা মাদরাসার প্রশাসনিক ভবনের ছাদে তাকে পুড়িয়ে মারা হলো? সাধারণ নারীর প্রচলিত বিশ্বাস তো তাকে নিরাপত্তা দিতে পারল না। একি তবে নারী বলে, নাকি সে প্রতিবাদ করেছিল বলে?

নুসরাত বলেছিল, ‘শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াই করে যাব’Ñ তিনি কথা রেখেছেন। শরীরের ৮৫ শতাংশ দগ্ধ নিয়েও জানিয়ে গেছেন, কে তাকে কী বলে ডাকতে এসেছিল। পোড়ানোর আগে তারা তার সঙ্গে কী কী কথা বলেছিল। এমনকি দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে চিকিৎসকের কাছে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এও বলেছেন, নেকাব, বোরকা, হাতমোজা পরা হামলাকারীদের চারজনের মধ্যে অন্তত দুজন ছিল নারী, একজনের নাম ‘শম্পা’। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য মনের শক্তি কতদূর হলে একজন মানুষ মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে থেকেও এত স্পষ্ট উচ্চারণে এমন সহিংসতার কথা বলে যেতে পারে। যার প্রতিটি শব্দ আজ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। উঠেছে প্রতিবাদের ঝড়।

তবে কি এবার থামবে নারীর প্রতি সহিংসতা? অপরাধী কি পাবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি? বিশ্বাস করতে ভয় হয়, মনে অনেক দ্বিধা, আইনের প্রতি অনাস্থাÑ শুধু আমার নয়, প্রায় সবার। কিন্তু কেন? কারণ নুসরাতের ঘটনা গণমাধ্যমে এত গুরুত্বসহকারে প্রচারকালীনও আমরা দেখতে পাই মাদারীপুরে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে দুই ছাত্রী ধর্ষণ, নোয়াখালীতে মাত্র ৯ বছরের শিশু ধর্ষণ, চট্টগ্রামে চলন্ত বাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে যৌন হয়রানি ছাড়াও জানা-অজানা কত ঘটনা। প্রতিদিন গৃহাভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া নারীর প্রতি সহিংসতার কথা তো ধর্তব্যেই আসে না। যে ঘটনাগুলো অভিযোগ আকারে আসে, সেখানে অর্থের বিনিময়ে মীমাংসা বা ভয় দেখিয়ে ধামাচাপার জন্য যুক্ত হয় স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা এবং প্রশাসনের হস্তক্ষেপ। একই বিষয় দেখা গেছে, নুসরাতের মামলার ক্ষেত্রেও। শুধু প্রভাবশালী নেতা বা প্রশাসন নয়, মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদের নেতারাও বিভিন্নভাবে নুসরাতের পরিবারকে হুমকি দিয়েছে, মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেছে। এমনকি, সোনাগাজী মাদরাসা শিক্ষার্থীদের একটি অংশ কারাবদ্ধ সিরাজ-উদ-দৌলার মুক্তির জন্য মানববন্ধন করেছে। তাই রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শতভাগ সুষ্ঠু বিচারের যত আশ্বাসই দেওয়া হোক না কেন সাধারণ মানুষ নিশ্চিত হতে পারছে না। আমরা ভুলিনি নূরজাহান, সীমা, ইয়াসমিন, তৃষাসহ অনেকের কথা। যুক্ত হলো নুসরাতের নাম। জানি না, শুধু নিরাপদ জীবন আর সম্মানের সঙ্গে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকা নিশ্চিত করতে গিয়ে এই তালিকা আর কত দীর্ঘ হবে! তবু নারী আশায় ঘর বাঁধে, স্বপ্ন দেখে, বিশ্বাস করে। এই বিশ্বাসের মর্যাদা কবে দেবে এই সমাজ?

লেখক : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

 

"