পর্যালোচনা

উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে কেন বারবার শোচনীয় পরাজয়?

প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

অধ্যাপক ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ

শিক্ষকতা ও গবেষণাÑএ দুটি বিষয় সব সময়ই আমার আগ্রহের। যেটা অনুভব করি, চিন্তা করি, বুঝি সেটার বাস্তব প্রমাণ অন্যের কাছে তুলে ধরা কতটা আনন্দের, তা শুধু আমিই উপলব্ধি করি। আবার ব্যর্থ হলে কষ্ট অনুভব করি। তা সমাধানে সংশ্লিষ্টদের কাছে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই। আমার পঞ্চাশ বছরের শিক্ষকতা ও গবেষণা কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষার মানোন্নয়নে অতিদ্রুত বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিষয়টির প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টায় এর আগে আমার আরো কয়েকটি লেখা ছাপা হয়েছে। আমি যে কারণে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে এত চিৎকার করছিÑ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে স্বপ্ন ছিল সোনার বাংলাকে নিয়ে, তা আজ বাস্তব, দৃশ্যমান। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে আজ অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। জাতি হিসেবে বিশ্বে আজ গর্বিত আমরা। দেশের প্রতিটি সেক্টরে কল্পনাতীত উন্নয়ন হয়েছে। তবে উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন। বিষয়টি নিয়ে আমি তাড়না, কষ্ট অনুভব করি। অন্যগুলোর মতো উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে আমরা এগোতে পারিনি তেমন। তাই আমার ভাবনা বা আলোচনা আজ উচ্চশিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখব।

বিগত দুই দশকে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্বে যে বিপ্লব ঘটেছে, বিশেষায়িত শিক্ষার ক্ষেত্রে যে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে আমরা তার থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছি। সামগ্রিকভাবে উচ্চশিক্ষাকে ঢেলে সাজাতে হবে, শিক্ষাকে অর্থবহ কর্মমুখী উৎপাদনশীল এবং সৃজনশীল করতে হবে। কাজটি কেমন করে করতে হবে এবং কোথা থেকে শুরু করতে হবে, এ বিষয়ে শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো ধারণা আছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না। প্রথম কথা হলো, আমাদের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যে সমস্যাবলি বিরাজমান, তা চিহ্নিত করতে এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে যথাযথ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে বিগত দুই দশকে আমরা যথাযথ পদক্ষেপ নিতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছি।

আমাদের দেশে এইচএসসি-পরবর্তী পর্যায়ে যারা শিক্ষা গ্রহণ করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা, তাদের সংখ্যা আনুমানিক ৩৬ লাখ। তাদের মধ্যে প্রায় ৫৬ হাজার শিক্ষার্থী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় লেখাপড়া করে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩ লাখের ওপর। এর সঙ্গে যুক্ত হবে কারিগরি, কৃষি, মেডিকেলে ভর্তি করা শিক্ষার্থী, যাদের সংখ্যা সর্বমোট ২ লাখের মতো। বাকি শিক্ষার্থীরা অর্থাৎ ৩০ লাখের কিছু বেশি শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজগুলোতে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবিভুক্ত সাতটি কলেজে লেখাপড়া করছে। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শতকরা ৮৩ ভাগ ছেলেমেয়ে কলেজগুলোতে শিক্ষায় নিয়োজিত।

এখন প্রশ্ন হলো, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান নিয়ে কথা বলছিÑ মানোন্নয়নের চেষ্টায় পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছি। কিন্তু বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ এই কলেজগুলোতে (সংখ্যা দুই হাজারের ওপর) পাঠদান, শিক্ষার মান, শিক্ষক সংখ্যা, শিক্ষকদের যোগ্যতা, অবকাঠামো ইত্যাদি বিষয়ের কী অবস্থা বিরাজ করছে, আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি। যারা বিভিন্ন সূত্রে কলেজগুলোর সঙ্গে জড়িত, তাদের কাছ থেকে জানা যে, সেখানে ভয়াবহ এক নৈরাজ্যের অবস্থা বিরাজ করছে। বেশির ভাগ কলেজে পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষক নেই। অনার্স, মাস্টার্স শ্রেণিতে পড়ার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের প্রকট ঘাটতি। হাতেগোনা অল্প কিছুসংখ্যক ছাড়া বাকি কলেজগুলো এই সংকট নিয়ে ঝুঁকে ঝুঁকে চলছে। একই শিক্ষকরা পরিচালনা করছেন এইচএসসি ও অনার্স মাস্টার্স পর্যায়ের লেখাপড়া। কলেজগুলোতে গবেষণার কোনো ব্যবস্থা নেই। শিক্ষকদের মধ্যে কেউ গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। এসব কলেজ থেকে শিক্ষার্থীরা সনদ নিয়ে শিক্ষিত বেকারে পরিণত হচ্ছেন। এ বিষয় নিয়ে আমরা কী ভেবেছি। আমরা বিগত দিনগুলোতে কি ব্যবস্থা নিয়েছি? আর চোখ-কান বন্ধ করে থাকা আদৌ উচিত হবে না।

উচ্চশিক্ষায় বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। চাকরি স্বল্পতাই এর মূল কারণ বলছেন বিশেষজ্ঞরা। আইনস্টাইনের মতে, যদি কাউকে একদমই আয়-রোজগারের কথা চিন্তা করতে না হয়, তাহলে তার জন্য বিজ্ঞান অবশ্যই আশীর্বাদস্বরূপ। ২০১০ সালে প্রকাশিত ইউজিসির প্রতিবেদনে দেখা যায়, সে সময় ৩১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ১৫ লাখ ৭২ হাজার ৪৭৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে কলা ও মানবিক বিষয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫ লাখ ৩১ হাজার ২০৭, সামাজিক ২ লাখ ৩৭ হাজার ৬৯৮, বিজ্ঞান, কৃষি ও কারিগরি ক্যাটাগরিতে ৩ লাখ ৩ হাজার ৫৪২, বাণিজ্যে ৪ লাখ ৬২ হাজার ৫৫৪, আইনে ৩১ হাজার ৮৫২ এবং ডিপ্লোমা/সার্টিফিকেট কোর্সে ৫ হাজার ৬২১ জন। এসব শিক্ষার্থীর বেশির ভাগ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কলেজ ও ইনস্টিটিউটে অধ্যয়নরত। আবার এ ক্ষেত্রে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ব্যবসায়িক স্বার্থে তারা বাণিজ্যবিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

সরকার অবশ্য উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের অর্থ সহায়তার HEQEP (Higher Education Qualitz Enhancement project) গ্রহণ করেছিল ২০০৯ সালে এবং সেটি ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয়েছে। সেখানে কিছু ভালো ভালো অর্জন আছে। এই প্রকল্পের আওতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কিছু কিছু গবেষণার অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। গবেষকরা সেখানে মানসম্মত গবেষণা করতে পারছেন। HEQEP-এর একটি অঙ্গ হচ্ছে BDREN (Bangladesh Research and Education Network) যার আওতায় দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও বিদেশের সঙ্গে Dedicated উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপিত হয়েছে। বহু অর্থব্যয়ে প্রতিষ্ঠিত এই নেটওয়ার্ক এখনো কার্যকরভাবে ব্যাপক ব্যবহার করা হচ্ছে না। আমাদের গবেষণা ও পঠন-পাঠনের সীমাবদ্ধতার কারণে এটি হচ্ছে। আমার আশঙ্কা BDREN-এর আওতায় স্থাপিত নেটওয়ার্ক আগামীতে তার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে। HEQEP-এর আরেকটি অঙ্গ হলো QAU (Qualitz Assurance Unit)। এই QAU-এর আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক প্রোগ্রামকে আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করে মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণার অবকাঠামোসহ সামগ্রিকভাবে উন্নত করার প্রক্রিয়া প্রচলন করার পথ দেখানো হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় দেশের ৬৯টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ওছঅঈ (Institutional Qualitz Assurance Cell) গড়ে তোলা হয়েছেÑ যে Cell-এর কাজ হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে দিক নির্দেশনা প্রদান করবে ও শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে উদ্বুদ্ধ করবে। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, এটি হচ্ছে HEQEP-প্রকল্পের সবচেয়ে সফল অংশ। এই মানোন্নয়ন প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় Bangladesh Accreditation council (BAC) নামে একটি আইন প্রণয়ন করা হয়েছে ২০১৭ সালে; যদিও এর কার্যক্রম এখনো শুরু করা যায়নি, অনেকটা আন্তরিকতার অভাবে। মানোন্নয়নে ও মানের স্বীকৃতি (Accreditation) প্রদানই হবে এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

দেশের কলেজগুলোতে এখন পর্যন্ত মানোন্নয়নের কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি, যদিও কলেজগুলোতে সিংহভাগ ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করছে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় সরকার College Education Development Program (CEDP) নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এর আসল উদ্দেশ্য হলো, কলেজশিক্ষকদের মালয়েশিয়ার নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকরা দেশে ফিরে অন্য কলেজশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেবেন। যে গতিতে বা যে সংখ্যক শিক্ষক নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে, তাতে শিক্ষার মানোন্নয়ন ১০০ বছরেও হবে না। আমরা যে তিমিরে ছিলাম, সেই তিমিরেই থাকব। অথচ উচ্চশিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করে, মানসম্মত শিক্ষা দিয়ে আমাদের মানবসম্পদ উন্নয়ন করতে পারলে দেশ দ্রুত উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতো। আমরা অদূর ভবিষতে জাপানকে ছাড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব হবে না। এখন আমাদের দরকার মানসম্মত, কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং এ জন্য অবিলম্বে অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলকে পরিপূর্ণভাবে কার্যকর করা।

লেখক : শিক্ষাবিদ, গবেষক

 

"