মতামত

থাকবে না গৃহহীন কেউ

প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

দিলীপ কুমার আগরওয়ালা

মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে নিজস্ব বাসস্থানপ্রাপ্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। এরপরও দেখা যাচ্ছে, দেশে অসংখ্য গৃহহীন মানুষ রয়েছেন। এসব মানুষের অধিকাংশই ভাসমান শ্যাওলার মতো জীবনযাপন করছেন। বিভিন্ন স্থানে তারা বসবাস করলেও স্বপ্নের নগরী ঢাকায় আসছেন বানের পানির মতো। ঠাঁই নিচ্ছেন ‘অপরাধের প্রজনন কেন্দ্র’ হিসেবে পরিচিত বস্তি, রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, ফুটপাত কিংবা কম ব্যবহৃত, পরিত্যক্ত ভবন বা স্থাপনায়। এমন পরিস্থিতিতে দেশের গৃহহীন মানুষের বসবাসের জন্য স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা জরুরি।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল, দেশের সব মানুষের জন্য মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করা। এ জন্য আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের সেই বার্তায় দেশের জনগণ সাড়া দিয়েছে ভালোভাবেই। তাই টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ এখন কাজ করে চলেছে সেই জনপ্রত্যাশা পূরণে।

টেস্ট রিলিফ তথা ‘টিআর’ ও কাজের বিনিময়ে টাকা তথা ‘কাবিটা’ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল গ্রাম বাংলার গরিব মানুষের কল্যাণে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, যেসব জনপ্রতিনিধির নামে এ দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নের অর্থ বরাদ্দ করা হতো তাদের একাংশের সততার সংকট প্রকল্প দুটির স্বচ্ছতা সম্পর্কে বিড়ম্বনা সৃষ্টি করে। আশার কথা, প্রধানমন্ত্রী আগামী পাঁচ বছরের জন্য টিআর ও কাবিটা প্রকল্পের বিশেষ বরাদ্দ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন। বিশেষ বরাদ্দের এ অর্থ দিয়ে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হবে গ্রামের গৃহহীন দরিদ্র মানুষকে।

এ উদ্দেশ্যে টিআর ও কাবিটার আওতায় গৃহহীনদের জন্য দুর্যোগসহনীয় বাসগৃহ নির্মাণ শীর্ষক একটি প্রকল্প গত বুধবার অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। ফলে টিআর ও কাবিটার যে বিশেষ বরাদ্দ এত বছর ধরে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, চেয়ারম্যানসহ অন্যদের নামে দেওয়া হচ্ছিল তা বন্ধ করে দেওয়া হলো। ওই প্রকল্পের আওতায় বিশেষ বরাদ্দের অর্থ দিয়ে ২ লাখ ৫৮ হাজার টাকায় ৪০০ বর্গফুটের দুটি ঘর নির্মাণ করে দেবে সরকার। ঘরে থাকবে দুটি বারান্দা ও একটি টয়লেট। এ প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে সামগ্রিক দুর্যোগঝুঁকি হ্রাসকল্পে গৃহহীন পরিবারের জন্য টেকসই গৃহনির্মাণ, দারিদ্র্যবিমোচনে ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ তথা গ্রামীণ এলাকায় শহরের সুবিধা প্রদান।

টিআর ও কাবিটার নামে বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থের সিংহভাগ অপচয়ের অভিযোগ থাকায় তার বিপরীতে গৃহহীন দরিদ্র মানুষের জন্য বাসগৃহ তৈরি করে দেওয়ার উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার। তবে নতুন প্রকল্পের আওতায় গৃহহীনদের যে গৃহ দেওয়া হবে তা যেন সিংহভাগ সরকারি নির্মাণকাজের মতো মানহীন না হয় তা নিশ্চিত করাও জরুরি। আমাদের বিশ্বাস, এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাসগৃহগুলো যাতে সত্যিকারভাবে টেকসই হয় তা তদারকিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবেÑ এমনটিও প্রত্যাশিত।

১৯৮৮ সালের বন্যায় যে পর্যন্ত পানি উঠেছিল, তা ভিত্তি ধরে ওই পরিমাণ উঁচু করে ভিটিগুলো তৈরি করা হবে। ঘরের ভিটি হবে পাকা। টিন দেওয়া হবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের রিলিফ ফান্ড থেকে। দেশের আটটি বিভাগে জুনের মধ্যে ৩২ হাজার ঘর নির্মাণ করা হবে। এক বছরে ৬৪ হাজার ঘর তৈরি করা হবে। পাঁচ বছরে ৩ লাখ ২০ হাজার ঘর। গৃহনির্মাণ কার্যক্রম তদারকির জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আটজন অতিরিক্ত সচিবকে আট বিভাগের কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে যাদের ৪০০ বর্গফুট জমি আছে, তারাই এ ঘর পাবেন। জমির সংস্থান সাপেক্ষে হিজড়া, বেদে, বাউল প্রভৃতি সম্প্রদায়কে এ সুবিধার আওতায় আনা হবে। অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা, নদীভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে গৃহহীন, বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত নারী, প্রতিবন্ধী ও পরিবারে উপার্জনক্ষম সদস্য নেই, এমন পরিবার অগ্রাধিকার পাবে।

প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, দেশে একটি পরিবারও গৃহহীন থাকবে না। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী গৃহহীনদের সংকট দূরীকরণে সরকারের পক্ষ থেকে হতদরিদ্রদের জন্য ঘর নির্মাণের কার্যক্রম পরিচালনা নিঃসন্দেহে সাধুবাদ পাওয়ার দাবি রাখে। এক্ষেত্রে লক্ষ রাখতে হবে, গৃহনির্মাণজনিত সহায়তা যেন প্রকৃত হতদরিদ্ররা পান, কোনোভাবেই যেন এর অপপ্রয়োগ না ঘটে। সরকারের সহায়তায় হতদরিদ্রদের সংকট দূর হবে, ঘরহীন প্রতিটি মানুষ ঘর পাবেন এবং নিজস্ব আবাসস্থলে নিশ্চিন্তে বসবাস করতে পারবেন, এটা নিশ্চিত হোক।

লেখক : পরিচালক, এফবিসিসিআই

 

"